দীর্ঘকাল ধরেই দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। চলতি অর্থবছরেও অর্থনীতি চাপে থাকবে বলে সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক খাতের চাপ। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রবৃদ্ধি হলেও তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে খুব একটা ভূমিকা রাখেনি। এছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। এসব কারণে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমে চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশে নামবে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস আমলে নিয়ে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন।

দেশে দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে সফল হলেও বাংলাদেশ তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারেনি। যেখানে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলংকাও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পেরেছে। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপালও এ তালিকায় রয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে কখনো কখনো মূল্যস্ফীতি বাড়লেও বাংলাদেশে তা খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। এক বছর বাড়লেও পরের বছরই তা কমে গেছে। কিন্তু বর্তমানে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এর অন্যতম কারণ অর্থ পাচার, সড়কে চাঁদাবাজি ও শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা নিত্যপণ্যের বাজারে। বাজারদর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ছোট হয়ে এসেছে মানুষের খাদ্যগ্রহণের তালিকা। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৪-এ অনুযায়ী, ক্ষুধা মেটানোর সক্ষমতার দিক থেকে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এ অবস্থা আরো অবনতি হবে যদি এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়। সার্বিক মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো স্ফীত হবে।

বাজারে শৃঙ্খলা না থাকলে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর, যা পক্ষান্তরে বাজার ব্যবস্থায় আরো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সরকারকে শক্ত হাতে বাজার সিন্ডিকেট দমন করে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। নয়তো মানুষের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়তে থাকবে, যার প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতে। যেখানে সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা এমনিতেই ভঙ্গুর।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংক ও আর্থিক খাত। যদিও অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন, পরিবার বা গোষ্ঠীর প্রভাবে বিগত সাড়ে ১৫ বছরে খাতটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খাতটিকে দুর্বল করার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকও দায়ী। কেননা বিগত বছরগুলোয় অনেক ঘটনা চিহ্নিত হওয়ার পরও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংককে। ফলে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গ্রাহকের আস্থা কমেছে এ খাতে। বিগত বছরগুলোয় এ খাত সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এ খাতে এখন দরকার শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ আরো সুদৃঢ় করা। ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমানে তা ভালো দিক। সরকারের আহ্বানে উন্নয়ন সহযোগীরাও এগিয়ে আসছে। এ খাত সংস্কারের জন্য যে সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা তা পেলে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

আবার ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ওপর মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে তা দূর করা প্রয়োজন। সংস্কার ও সুশাসন ছাড়া ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার, আর্থিক সংস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে না। অর্থনৈতিক সংকটের সময় জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা পেতে তাদের আস্থা থাকাটা জরুরি। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মনোযোগ দিতে হবে। তাছাড়া অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এবং সংকট থেকে উত্তরণে ব্যাংক খাত বড় ভূমিকা পালন করে।

তবে বেসরকারি খাতের ওপর নজর দেয়া বিশেষ প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান তৈরি করা। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসেও এ কথা উল্লেখ করা হয়। সংস্থাটির মতে, এখনো ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ হারে। মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদহার বাড়ানোয় বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণ কমেছে। এতে বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমেছে। এ অবস্থায় আরো বেশি নতুন ও শোভন চাকরির সুযোগ তৈরি করতে বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেসরকারি খাতের ওপর চাপ কমাতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে।

কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। প্রবৃদ্ধির সুবিধার যদি ন্যায্য বণ্টন না হয় তা বৈষম্য প্রকট করে তোলে। আর দেশে বৈষম্য এখনই চরম পর্যায়ে রয়েছে। তাই বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ দরকার। বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।

দেশে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। এরপর রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে আইনের দ্রুত প্রয়োগের অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব ও ক্রয়ে জটিলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংকের ঋণ জোগানে সক্ষমতার অভাব এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যোগসূত্র ও সমন্বয়ের অভাব। উপরন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের অভাবও রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এখন থেকেই সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। আর্থিক ও ব্যাংক খাতের সংস্কার সাধন করে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।

বহিঃস্থ খাতেও চাপ রয়েছে। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার প্রভাবও দেশে ব্যাপক হারে পড়তে পারে। রফতানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে পারে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। এতে রিজার্ভ ক্ষয় আরো ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার জ্বালানি আমদানি বাধাপ্রাপ্ত হলে জ্বালানি নিরাপত্তায় টান পড়বে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদনে। এসব বিবেচনায় নিয়েই অগ্রসর হতে হবে, প্রস্তুত হতে হবে শক্তভাবে সংকট মোকাবেলার জন্য। বর্তমানে নিজেদের সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায় সেটাকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি।

কোনো সংকটই একদিনে সৃষ্ট নয়। যেসব কারণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর সৃষ্টি হয়েছে সেসব কারণ ধরেই সমাধানের পথে এগোতে হবে। তাহলে দেশে একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংকের জানানো পূর্বাভাস মূলত দেশের জন্য সতর্কবার্তা। তাদের পূর্বাভাসে এও বলা হয়েছে যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে এবং চলতি অর্থবছর শেষে দেশে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু এগুলো তখনই সম্ভব হবে যদি সতর্ক হয়ে এখন থেকেই কার্যক্রম শুরু করা যায়।