ড. এম এম আকাশ অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড ও নানা প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রবাহ নিয়ে বলুন।
বাংলাদেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দল দুটির মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে মতভেদ চলছে। এ মতভেদকে সাধারণত দুভাবে দেখা হয়। কেউ কেউ একে আদর্শগত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কেউ একে ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতা রক্ষার বিরোধ হিসেবে দেখেন। দুভাবেই দেখা যেতে পারে, দুটির মধ্যেই আংশিক সত্য রয়েছে। কোন অংশটা প্রধান তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে এবং ঐতিহাসিক কারণে তা অস্বাভাবিক নয়। আওয়ামী লীগের আদর্শ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মাত্রা ১৯৭৫-এর আগে-পরে অবশ্যই এক রকম নয়। আবার জিয়া-উত্তর খালেদা-তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং অতীতের জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিও এক রকম নয়। সুতরাং গতির মধ্যেই দল দুটির বিচার করা উচিত। তবে তার পরও আমরা বর্তমান মুহূর্তে এসে দেখব যে তাদের পার্থক্যগুলো ক্রমে কমে এসেছে, কমতে কমতে তা এখন অধিকাংশের চোখে ক্ষমতা রক্ষা ও ক্ষমতা দখলের পার্থক্যে পর্যবসিত হয়েছে।
দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব কি আদর্শগত?
আদর্শ হিসেবে আওয়ামী লীগের ইতিহাস বিএনপির ইতিহাসের চেয়ে আলাদা। আওয়ামী লীগ দীর্ঘকালের পুরনো দল, দলটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। যদিও তখনো আওয়ামী লীগে কনফেডারেশন ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি শক্তির উপস্থিতি ছিল। অন্যদিকে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পর সামরিক চ্যানেলের মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছে এবং তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আদর্শ হিসেবে ধারণ করে। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ বলতে আসলে কোন জাতীয়তাবাদকে বোঝানো হচ্ছে তা অস্পষ্ট।
বঙ্গ নামে একটি বৃহৎ এলাকা আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বিভিন্ন ঐতিহ্যসম্পন্ন নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। এ অঞ্চল ১৯৭১ সালে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর এর নাগরিকরা তাদের পাসপোর্টে সবাই নিজেদের ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সুতরাং ‘বাংলাদেশী’ শব্দটি নাগরিকত্বের সূচক, জাতীয়তার সূচক নয়। তবে এ যুক্তি মেনে নিলে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে বিভিন্ন জাতির পার্থক্যের স্বীকৃতিও দিতে হবে। বাংলাদেশকে বহুজাতিক দেশ হিসেবে মেনে বিভিন্ন জাতিসত্তার ন্যায্য অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে, আবার রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পার্থক্য মেনে নিতে পারে। এজন্য কেউ ভারতের নাগরিক হয়েও বাঙালি হতে পারেন। আবার কেউ বাংলাদেশী নাগরিক হয়েও অবাঙালি হতে পারেন। নাগরিকত্ব রাষ্ট্রীয় আইনের ওপর নির্ভরশীল এবং কোনো কোনো রাষ্ট্রের আইনে একাধিক দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য প্রবাসী বাঙালিদের বাঙালি ও বাংলাদেশী দুটো পরিচয়ই সত্য ধরা হয় এবং বাংলাদেশে তাদের ভোটাধিকার আছে। তবে আলাদাভাবে জাতীয়তা নির্ধারিত হয় ভাষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদি অনেক কিছুর ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সমপাতন দিয়ে। সে হিসেবে ভারতীয় নাগরিক বা মার্কিন নাগরিক জাতিগতভাবে বাঙালি বা অন্য কোনো জাতির সদস্য হতে পারেন। একক নাগরিক পরিচিতি যেমন নানা জাতি দ্বারা গঠিত হতে পারে, তেমনি একক জাতীয় পরিচিতির মধ্যেও নানা দেশের নাগরিক থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির গতিপথ এক বলে অনেকে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে আপনার পর্যবেক্ষণ বলুন।
সাবেক চীনপন্থী ও মুসলিম লীগপন্থী রাজনীতিবিদদের অনেকেই স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। স্বাধীনতার পর বিএনপি যখন গঠিত হলো তখন তাদের অনেকেই বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন। একসময় পাকিস্তানের মিত্র চীনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। চীনের সঙ্গে তখন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। বিএনপির সঙ্গে এখন চীনের আগের সেই ঘনিষ্ঠতা নেই। কারণ চীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পদ্মা ব্রিজসহ অনেক বড় বড় মেগা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। তবে সাবেক চীনপন্থীরা এখন নানা দলে বিভক্ত হয়ে কেউ আওয়ামী সমর্থক, কেউ-বা বিএনপি সমর্থক, কেউ-বা পৃথক দল তৈরি করে আওয়ামী সমর্থক হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো দলই বর্তমানে সরাসরি চীনের বিরোধিতা করছে না।
অন্যদিকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শক্তিশালী একটি অংশ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পক্ষে রাখতে চাইছে। কিন্তু শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাকে ক্ষমতায় রাখতে চায় না। সুতরাং মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব এ মুহূর্তে সম্প্রসারমাণ। এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের বন্ধু ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে কিনা তেমন একটি প্রশ্নও উঠে আসে। এটা ঠিক যে বিএনপি যখন প্রথম ক্ষমতায় ছিল তখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব বেড়েছিল। বিশেষ করে সীমান্ত ইস্যু নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব ছিল। ভারত একসময় মনে করত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘সাত বোন’ এলাকায় ভারতের যেসব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে তাদের জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে এনে আশ্রয় দেবেন। একই সঙ্গে আমরা পরবর্তী সময়ে ১০ ট্রাক অস্ত্রের কথাও জানি। নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করলে ভারত হয়তো এখনো বাংলাদেশে বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে না, বরং আওয়ামী লীগকেই হয়তো ক্ষমতায় দেখতে চাইবে। বিএনপি অবশ্য ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ভারতকে এখন শত্রু না বলে নিরপেক্ষ ভূমিকায় দেখতে চায়। ভারত সম্পর্কে বিএনপির শেষ বিবৃতিতে এটি দৃশ্যমান হয়।
তার মানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে?
শুধু ইতিহাস ও বৈদেশিক নীতি নয়, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থান অভ্যন্তরীণ জাতীয় প্রশ্নেও পৃথক। এসব কারণেই অনেকেই এটাকে আদর্শগত মৌলিক বিরোধ বলেন। কিন্তু আমি এটাকে মৌলিক শ্রেণীবিরোধ হিসেবে দেখি না। কারণ যে মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে একটি সরকারের শ্রেণীচরিত্র নির্ধারণ হয় সেটি উভয়েরই এক। তারা উভয়েই বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে এবং বর্তমানে দুটি দল যারা পরিচালনা করছেন তাদের বেশির ভাগই বড় ব্যবসায়ী। ধনিক শ্রেণীর সদস্য। মধ্যবিত্ত জনগণ এদের দলে প্রচুর পরিমাণে থাকলেও তারা তাদের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন না অথবা একে অনিবার্য বলে মেনে নিয়েছেন। ‘মিশ্র অর্থনীতি’, ‘কল্যাণ পুঁজিবাদ’ বা ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ এসব কথা আওয়ামী মহলে আগে অনেক উচ্চারিত হলেও এখন তা উচ্চারিত হচ্ছে না। এখন প্রবৃদ্ধি ও অবাধ বাজারই আওয়ামী লীগের মূল ভাবাদর্শ, সেটা বিএনপিরও বটে। দুই দলের মূল পরিচালক শক্তিও হচ্ছে সেই বড় ধনী পরিবাররা, যারা রাষ্ট্রীয় ধনতন্ত্রের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে এবং এখনো রাষ্ট্রক্ষমতাকে আশ্রয় করেই টিকে আছে ও বিকশিত হতে চাচ্ছে। তাই রাষ্ট্রক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তাদের রয়েছে এক ধরনের নিরন্তর প্রতিযোগিতা।
সম্প্রতি আয়োজিত ব্যবসায়ীদের সম্মেলনে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। সেখানে বড় ব্যবসায়ীরা বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার কথাই জোরের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। এটা পরিষ্কার যে ব্যবসায়ীরা সব সময় চান সরকার তাদের অনুকূলে থাকুক। কারণ আমাদের এখানে মূলত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজিবাদ (State sponsored Capitalism) গড়ে উঠেছে। এর বৈশিষ্ট্য হলো ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো। ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো হলো সুযোগসন্ধানী ‘অসৎ ব্যবসায়ী’, ‘অসৎ রাজনীতিবিদ’ ও ‘অসৎ আমলাদের’ একটি যোগসূত্র (Nexus)। সত্যিকারার্থে তারাই দেশ চালায়। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে-ই সরকারে থাকুক না কেন এ ক্ষমতা কাঠামো একই থাকবে। কারণ তারাই অর্থ সরবরাহ বা বিনিয়োগ করে দলগুলোকে চালায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্বটা তাই বহুলাংশে ক্ষমতা রক্ষা করার এবং ক্ষমতা দখল করার দ্বন্দ্ব। এটা নতুন কিছু নয়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এজন্যই ধনকুবের হেনরি ফোর্ড বলেছিলেন, নির্বাচনে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যে-ই জিতুক না কেন আমি কখনো হারি না।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতেও কি এভাবে চলতে থাকবে?
ভবিষ্যতে আদর্শভিত্তিক দলগুলো ছোট হয়ে গেলেও টিকে থাকবে। যেমন জামায়াতের আদর্শে যারা বিশ্বাস করেন, তারা তাদের রাজনীতি গোপনে হলেও করবেন। তারা হয়তো বিভিন্ন সময় নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করতে পারেন। যেমন কখনো তারা বিএনপি আবার কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে অ্যালায়েন্স করতে পারেন। কখনো তাদের ভেতরে, কখনো বাইরে নতুন দলের ছদ্মবেশে এগিয়ে আসতে পারেন। উল্টো দিক থেকে আদর্শবাদী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বামপন্থীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম। তারা সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চান। সুতরাং তাদের যতই মারা হোক বা নির্যাতন করা হোক তারা ধনিক শ্রেণীর সঙ্গে থাকবেন না। পৃথক অস্তিত্ব নানাভাবে বজায় রাখবেন।
এ দুই বিপরীত আদর্শগত দল বাদ দিলে অবশিষ্ট যে দলগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে নানা ধরনের ক্ষমতার সমীকরণ (Equation of Power) ঘটছে। এই ইকুয়েশন অব পাওয়ারের ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনীতি মসৃণভাবে চলবে নাকি চলবে না। তবে এখন পর্যন্ত শাসক শ্রেণীর প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির ইকুয়েশনটা ঠিকমতো মিলছে না। তার জন্যই সভ্য পুঁজিবাদী দেশগুলোর মতো ‘দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ এখানে ঠিকমতো গড়ে উঠছে না।
অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ তুলছে। তাদের অভিযোগ কীভাবে দেখেন?
বিএনপি দাবি তুলেছে, সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। বিএনপি মনে করছে, যদি শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দেন, তাহলে তারা জিতবে। আর শেখ হাসিনা বলছেন, সংবিধানে নিরপেক্ষ সরকারের বিধান নেই, সুতরাং তারা তা করবেন না।
বর্তমান সময়ে শেখ হাসিনাকে এখন আশ্বস্ত করতে হবে যে তিনি ক্ষমতায় থাকলেও সরকার নিরপেক্ষ থাকতে পারে এবং নির্বাচন কমিশন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করার মতো যথেষ্ট শক্তি রাখে। কিন্তু গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের পর এটা আজকাল অনেকেই বিশ্বাস করেন না। যদিও সর্বশেষ ঘটনার পর বিদেশী মুরুব্বিরা এখনো দুই দলের মধ্যে নিঃশর্ত সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে এ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
২০১৮ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছিল বিএনপির। তখন সে দাবি পূরণ না হলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছিল। অনেকে বলেন, বিএনপিকে যে ৮০টি সংসদীয় আসন দেয়ার চুক্তি হয়েছিল সেটা রক্ষা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। সুতরাং সেবার বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই নির্বাচনে গেলেও এবার তারা সেটা ছাড়া নির্বাচনে যাবে না এবং সেটার লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ন্যাড়া দুইবার বেল তলায় যায় না।
দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির বর্তমান চিত্রটি কেমন?
আওয়ামী লীগের উন্নয়নের মধ্যে অনেক ধরনের নেতিবাচক বিষয় রয়েছে। আমরা খুব সংক্ষেপে যদি কয়েকটি বিষয় বলি, যেমন ব্যাপকভাবে বৈষম্য বেড়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় ধনী ও গরিবের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল সেটি অনেক বেড়ে গেছে। সার্বিকভাবে দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা হয়তো কমেছে। এর পরও দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ ধরলেও ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটির বেশি মানুষ দরিদ্র। তিন কোটি মানুষের অসন্তুষ্টি কম বড় বিষয় নয়। এ তিন কোটি মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি থাকত না যদি তারা দেখতেন তারা কম পাচ্ছেন, কারণ তারা কম পরিশ্রম করছেন। কিন্তু বিষয়টা ঠিক তার উল্টো। গার্মেন্টস মালিকদের একটি কারখানা থেকে তিনটি কারখানা হয়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের সংসার চালানো এখনো কষ্টকর রয়ে গেছে। শ্রমজীবী জনগণ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন—যারা চুরি করছে, বাটপারি করছে, যারা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সেটা শোধ করছে না, যারা অবৈধভাবে টাকা বানাচ্ছে এবং তা পাচার করছে, যারা সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে, শাসক দলের আনুকূল্যপ্রাপ্তরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও সেটা প্রতিফলিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে যখন আয়বৈষম্য পরিমাপ করা হয় তখনো দেখা গেছে ধনী ও গরিবের মধ্যে আয়বৈষম্য দশমিক ৫০-এর কাছাকাছি। বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আয়বৈষম্য দশমিক ৫০-এর ঘরে যাওয়া মানে সেটা বিপৎসীমা অতিক্রম করা। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আয়বৈষম্যের সেই এজেন্ডা দিয়ে বাংলাদেশে বৃহৎ কোনো লড়াই হচ্ছে না। শাসক দলের ধারণা গড় প্রবৃদ্ধিই উন্নয়ন, উন্নয়নের ধরন বা বৈষম্য নিয়ে ভাবনার সময় আসেনি। কিন্তু সর্বশেষ একটি জরিপে জানা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন ‘অর্থনীতি ভুল পথে চলছে’। এ কথা ঠিক বাংলাদেশে এসব এজেন্ডায় লড়াই হলে লড়াইটা জনগণের প্রিয় ইস্যুতে হতো। বিএনপি মুখে সেই এজেন্ডার কথা বললেও তারা শেষ বিচারে ধনিক শ্রেণীর একাংশ দিয়েই নিয়ন্ত্রিত এবং সেজন্য মূলত তারা উৎখাত বা এক দফাতেই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।
সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনার মতামত কী?
এটুকু বলতে পারি, এমন কোনো শক্তিশালী ইতিবাচক অভ্যন্তরীণ শক্তি এখনো দেখা যাচ্ছে না যেটা শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু বহিঃশক্তির দিক থেকে একটি চাপ রয়েছে। আগামী নির্বাচন ‘ভালোভাবে’ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে। এটি একটি শক্তিশালী ফ্যাক্টর বটে। কারণ আমাদের উদীয়মান পোশাক শিল্প, সেনাসদস্যদের বৈদেশিক মিশনে যোগদান এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ থেকে ডলার প্রাপ্তি—সিভিল সোসাইটির সমর্থন এসব কিছুতেই আমেরিকার লিভারেজ বা প্রভাব রয়েছে। ফলে সেটা ব্যবহার করে ‘ভালো নির্বাচনের’ জন্য তারা যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে নির্বাচন ভালোভাবে করার অর্থ কী?
বিএনপি নির্বাচন ভালোভাবে করার অর্থ করেছে যদি শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেন। বামপন্থীরাও আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাচ্ছে না। তারাও মনে করছে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সরকার তার প্রশাসন, অর্থ ও পেশি শক্তি ব্যবহার করে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে দেবে না। বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচনসহ যত ধরনের নির্বাচন হয়েছে সেখানে ভোট দেয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহের তারতম্য দেখা যাচ্ছে। ভোট কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি সাধারণভাবে কমছে। ভোটারের উপস্থিতি কম হলে আওয়ামী লীগ হস্তক্ষেপশূন্য নির্বাচন দিয়েও জিততে পারবে। আওয়ামী লীগ চাইতে পারে বিএনপি এবার ভোট বয়কট করুক, কিন্তু তাদের নিজস্ব লোক ও দল ভোটে আসুক। এ ধরনের এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি ভোট বয়কট করলেও সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করতে পারে। নিরপেক্ষ নির্বাচন এ অর্থে যে কোনো বল প্রয়োগ করা হবে না, প্রতিটি আসনে যে দাঁড়াতে চায় দাঁড়াবে। এমনকি আওয়ামী লীগের নিজ দল থেকে একটি আসনে যদি তিনজনও দাঁড়ায় তাতেও আওয়ামী লীগ আপত্তি করবে না। কারণ এ তিনজনের মধ্যে যে-ই জিতুক সে তো আওয়ামী লীগের পক্ষেই থাকবে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বয়কটের নির্বাচন কি নির্বাচন বলে আদৌ গণ্য হবে? মনে হয় না তা হবে।
এক্ষেত্রে সরকার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে বলে মনে করেন?
সরকার এক্ষেত্রে আরেকটা জিনিস করতে পারে। সেটা হলো, তৃণমূল বিএনপি নামের দলটিকে সামনে এনে প্রতিটি আসনে তাদের একজন করে প্রার্থী দাঁড় করাতে পারে। ধরা যাক, এভাবে একটি কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করল। এখন প্রশ্ন হলো, এ ধরনের কৃত্রিম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তখন কোনো ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা দেখা দেবে কিনা। অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো তৃতীয় শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের প্রশাসনিক শক্তিকে নড়বড়ে করে দেবে কিনা। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এসব বহিঃশক্তি আমাদের ওপর এক্ষেত্রে অনেক ক্ষমতা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র স্যাংশন আরোপ করলে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জনগণের রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকলে বা সে রকম পরিস্থিতি ঘটলে হয়তো ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে। তবে সে ধরনের কোনো কিছু করার আগে যুক্তরাষ্ট্র আগে চিন্তা করবে এখানে তাদের লাভ কী। যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন বা গণতন্ত্র নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ আছে বলে আমার মনে হয় না। পৃথিবীর অনেক জায়গায় এ রকম গণতন্ত্রহীনতা চলছে, যেটাকে আলী রিয়াজ বলেন ‘কর্তৃত্বপরায়ণ গণতন্ত্র’। তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভালো সম্পর্কও রেখে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারলে বাংলাদেশের জনগণ বা গণতন্ত্র নিয়ে তাদের খুব বেশি মাথাব্যথা থাকবে বলে মনে হয় না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে পর চীন ও ভারত সর্বপ্রথম সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তেমনি এবারো যদি সে রকম নির্বাচন হয়, যদি অন্য দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হলে ভারত, চীন ও রাশিয়া সরকারকে পুনরায় স্বীকৃতি দিতে পারে বলে মনে হয়। তবে সেই ধরনের নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাধারণভাবে প্রহসন বলেই হয়তো বিবেচিত হবে।










