অর্থনীতির বিদ্যমান সংকটগুলোকে আরো ঘনীভূত করেছে জ্বালানি সংস্থানে অনিশ্চয়তা। বিগত সরকারের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ঘটেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে; দেউলিয়া হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে লাখ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্টও দেয়া হয়েছে। আবার আর্থিক লোকসান ও সংকটের কথা বলে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। যার চাপ পড়েছে ভোক্তা পর্যায়ে।
ক্ষমতাঘনিষ্ঠদের অনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে নেয়া একের পর এক অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত ভঙ্গুরপ্রায় করে তুলেছে খাতটিকে।
চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহে ভাটা পড়া শুরু হলে বড় ধাক্কা খায় শিল্প উৎপাদন। বিপর্যয়ে পড়ে আবাসন খাতও। শিল্প ও আবাসন খাতের এ ভোগান্তি এখনো বিরাজমান। উপরন্তু বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোয় (পবিস) আন্দোলন ঘিরে বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে উঠেছে।
বিআরইবি ও পবিসের মধ্যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কয়েক মাস ধরে সমিতি ও বোর্ড একীভূতকরণ, অভিন্ন চাকরিবিধি এবং অনিয়মিত কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। পবিসের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একসময় নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করে বিদ্যুৎ বিভাগ। সেই কমিটির কয়েকটি সভাও এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পবিসের অভিযোগ, দফায় দফায় সভা অনুষ্ঠিত হলেও কমিটি বিআরইবির অসহযোগিতার কারণে চূড়ান্ত সুপারিশ করতে পারেনি। এজন্য গত মে ও জুলাইয়ে মোট ১৫ দিন কর্মবিরতি, আগস্টে লং মার্চ টু আরইবি, ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটামে গণছুটি ঘোষণা, সারা দেশে একযোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ অক্টোবর পবিসের ২০ জন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত এবং ১০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদেই সেদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন শুরু করে সমিতিগুলো।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা সেদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার ফলে দেশের ৮০টির মধ্যে ৬০টি সমিতির বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এ সময় বিপুলসংখ্যক গ্রাহক কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিলেন। এরই মধ্যে আবার আন্দোলনকারী কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া নতুন করে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে বিদ্যুতের উৎপাদন কোম্পানি নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিদ্যুৎ খাতের দুই বিতরণ কোম্পানির বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর এ আন্দোলনে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা বেড়ে গেছে।
আশঙ্কা রয়েছে শিগগিরই এর সমাধান না হলে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো আরো তীব্র হয়ে উঠবে। সরকারের সঙ্গে বসে তাদের দাবি-দাওয়া শুনে সমঝোতায় পৌঁছা জরুরি।
দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কারো কারো ভাষ্যমতে, পবিসের আন্দোলনটি যৌক্তিক। তারা মাঠ পর্যায়ে যেভাবে কাজ করে সে তুলনায় তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা না গেলেও যৌক্তিক পর্যায়ে সমাধান করা উচিত।
ব্ল্যাকআউটের দিন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করেন আন্দোলনকারীরা। তিনি জানিয়েছেন, ন্যায্যতার ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের পক্ষ থেকে এটা সমাধান করা হবে। আগামী সপ্তাহে তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। আমরাও আশ্বস্ত হতে চাই শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।
আন্দোলনকারীরা তাদের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, মামলা, হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদে এক সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। সে সময় তাদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো পল্লী বিদ্যুৎ খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে মামলা প্রত্যাহার করে ২৪ জনের চাকরি ফিরিয়ে দেয়া ও স্ট্যান্ড রিলিজ করা দুই কর্মকর্তাকে পুনরায় পদায়ন করা, গ্রাহকের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য পবিস ও বিআরইবি সংস্কার ও একীভূত করে একক একটি প্রতিষ্ঠান গঠন এবং স্থায়ী পদের বিপরীতে চুক্তিভিত্তিকদের নিয়মিত করা, সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র সমন্বয়কসহ স্বাধীন কমিশন গঠন করে পল্লী বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিআরইবির দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা।
দাবিগুলো রাষ্ট্রীয় আইনের আলোকে যাচাই করতে হবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। পল্লী বিদ্যুতের এ আন্দোলনে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় এক ধরনের হুমকি রয়েছে। তাদের এ বিরোধের কারণে এরই মধ্যে গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হয়েছে। আগামীতেও ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাংলাদেশ বিআরইবি ও পবিসের বিরোধের কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদিও সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা জানিয়েছেন যে দেশে আপাতত ব্ল্যাকআউট হওয়ার মতো কোনো ঝুঁকি নেই। কিন্তু এ ধরনের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তা নিকট ভবিষ্যতে কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে প্রতীয়মান হয় না।
একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শিল্প খাত। আর দেশের শিল্প খাত মূলত গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর। গ্যাস সংকট বর্তমানে এতটাই ভয়াবহ যে বন্ধ রাখতে হয়েছে কিছু কারখানাও। আবার অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রও গ্যাসের অভাবে অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছে। এ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া আবশ্যক। যেখানে পুরনো সমস্যাগুলোরই এখনো পরিপূর্ণ সমাধান আসেনি, সেখানে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের তাই এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ খাতকে যত দ্রুত সম্ভব স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।










