ঢাকা নগরীর ব্যস্ত জীবনযাত্রায় ভয়াবহ জ্যাম এড়াতে মেট্রোরেল গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়। ২০১২ সালে প্রকল্প গ্রহণের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে গত বছরের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা হলেও এখন পর্যন্ত মেট্রোরেলের সুফল পুরোপুরি মেলেনি। এরই মধ্যে মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর পরিকল্পনা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ ফুটপাতের সঙ্গে সমন্বয় করে স্টেশনগুলো নির্মাণ হয়নি এমন অভিযোগ উঠেছে। এতে মেট্রোরেলের কার্যক্রম পুরোমাত্রায় শুরু হওয়ার পর মানুষের ভোগান্তির ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের স্টেশন রয়েছে ১৬টি। সব স্টেশনই তৈরি হয়েছে বিদ্যমান সড়কের ওপর। মেট্রোর মূল উড়ালপথ একটি পিয়ার বা খুঁটির ওপর তৈরি হলেও স্টেশনগুলোয় তিনটি করে পিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পড়েছে রাস্তার মাঝখানে। আবার রাস্তার দুই প্রান্তে ফুটপাত ঘেঁষে রাখা হয়েছে আরো দুটি পিয়ার। স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার সিঁড়িগুলো ফুটপাতে পড়ায় বেশির ভাগ মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত সংকুচিত হয়ে গেছে। স্টেশনের নিচে তৈরি হয়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। এমনকি মেট্রো স্টেশনগুলো কেন্দ্র করে কোনো ফিডার রোডের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আদর্শ মেট্রো স্টেশনে যেসব অনুষঙ্গ থাকা আবশ্যক, উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৬) বেশির ভাগ স্টেশনে তা অনুপস্থিত। স্টেশনগুলো যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে এ স্টেশনগুলো যানজট, ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দিতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ স্টেশন। যেসব দেশে মেট্রো রয়েছে, সব জায়গায় আগে স্টেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় স্টেশনের সব অনুষঙ্গই পূরণ করা হয়। ফুটপাত যেন নষ্ট না হয়, এজন্য জমি অধিগ্রহণের দরকার হলে সেটা আগেই করে নেয়া হয়। কিন্তু ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলের স্টেশনের পরিকল্পনায় বড় ধরনের ভুল করা হয়েছে। আর এ ভুলের প্রভাব পুরো মেট্রোর ওপর পড়বে। চীনের সাংহাই মেট্রো, বেইজিং সাবওয়ে, গুয়াংজু মেট্রো, ইউহান মেট্রো, যুক্তরাজ্যের লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি সাবওয়ে, রাশিয়ার মস্কো মেট্রো, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল মেট্রো, স্পেনের মাদ্রিদ মেট্রো, জাপানের সাবওয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের আগে সুপরিকল্পিত স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে এর ব্যত্যয় ঘটেছে।
মেট্রোরেলের উত্তরার তিনটি আর আগারগাঁও বাদে বাকি স্টেশনগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এসে ফুটপাতে পড়েছে। কোথাও ফুটপাতজুড়ে, আবার কোথাও ফুটপাতের একাংশে এসে পড়েছে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি। এছাড়া কোথাও জায়গার অভাবে শুধু স্টেশনের এক পাশেই সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। যদিও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আপত্তি করায় এ মেট্রোর উত্তরা-আগারগাঁও অংশের একাধিক স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ফুটপাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কিন্তু আগারগাঁও-মতিঝিল অংশের স্টেশনগুলোর জন্য এমন কোনো পদক্ষেপ রাখা হয়নি।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন স্টেশনটির এক পাশে সিঁড়ি রেখেছে ডিএমটিসিএল। এ স্টেশনের যাত্রীদের ওঠানামার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে সিঁড়ি নির্মাণাধীন রয়েছে। অন্যদিকে টিএসসি ও পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের ভবন থাকায় সিঁড়ির জন্য জায়গা বের করা সম্ভব হয়নি। কারওয়ান বাজার স্টেশনের সিঁড়িগুলো পড়েছে ফুটপাতের ওপর। প্রেস ক্লাবের সামনের অংশের ফুটপাত দখল করে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এ পাশের আরেকটি সিঁড়ি তৈরির জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে সচিবালয়ের সীমানা দেয়াল। সড়কের অন্য পাশের ফুটপাতেরও অনেকটাই চলে গেছে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ির দখলে। মতিঝিল স্টেশনের ফুটপাতেও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে। ফুটপাতে মেট্রোর স্টেশনের সিঁড়ি নির্মাণের জন্য পরিকল্পনায় ভুল হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এক্ষেত্রে ঢাকা শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। বস্তুত ঢাকা শহরে মেট্রোরেলের অবকাঠামো তৈরির মতো জায়গার সংকুলান করা অনেক কঠিন। এক্ষেত্রে আইডিয়াল বা আদর্শ মেট্রো স্টেশন করার মতো জায়গা মেট্রোরেলের গতিপথে খুব কমই রয়েছে। এ বিষয়ই বর্তমানে স্টেশনের অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এজন্য যেসব দেশে মেট্রো রয়েছে, সে দেশগুলোর উদাহরণ অনুসরণ করা দরকার ছিল। কিন্তু এমনটি না করায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
আমরা মেট্রোরেলের সুফল পুরোপুরি পেতে চাই। এজন্য স্টেশনগুলো যেভাবে নির্মাণ করার কথা ছিল, সেটি যখন হয়নি। সেক্ষেত্রে ভুল পরিকল্পনার ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হবে। যদিও ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে ফুটপাতের ওপর যেসব জায়গায় মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি পড়েছে, সেসব জায়গায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করে ফুটপাতের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এজন্য পরবর্তী সময়ে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকা শহরকে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, এমন প্রেক্ষাপটে মেট্রোরেল পরিকল্পনাহীনতার নতুন সংযোজন হিসেবেই গণ্য হবে।










