দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এজন্য খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হলেও এর সমাধান মিলছে না। যে কারণে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংসদের চলতি অধিবেশনে ব্যাংকের পরিচালক বা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনিয়মের কারণে আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য দায়ী পরিচালক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে ব্যাংক। এ বিধান যুক্ত করে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আধুনিক ও সময়োপযোগী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিছু সংশোধন আনা হচ্ছে। তারই পদক্ষেপ হিসেবে এ বিলটি সংসদে তোলা হয়। বর্তমানে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩১ বছরে ব্যাংক কোম্পানি আইন মোট সাতবার সংশোধন হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংস্কার, পরিবর্তন, সংযোজনের মাধ্যমে ব্যাংক খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বর্তমানে কিছুটা ভিন্নতা দৃশ্যমান হচ্ছে। ব্যাংক খাতের আগের অর্জনগুলোর ওপর ভিত্তি করে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি এক্ষেত্রে অনুপস্থিত। দেখা যাচ্ছে ব্যাংক খাত অনেক বেশি সমস্যাসংকুল হয়েছে এবং এতে আরো অনিয়ম যোগ হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
দেশের ব্যাংকগুলোয় প্রথম সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। দ্বিতীয়ত খেলাপি ঋণ ও ঋণ সম্পর্কিত বিষয়গুলো, যা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে উৎসাহিত করে। খেলাপি ঋণের সঙ্গে অনিয়মও জড়িত। তৃতীয় হচ্ছে তদারকির অভাব। আর এসবের সঙ্গে যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত তারা জবাবদিহির আওতায় না আসায় ব্যাংক খাতে অনিয়ম বেড়েই যাচ্ছে। অনেক দিন ধরেই বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়গুলো উঠে আসছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চেষ্টা করলেও এর সমাধান বের করা সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে বর্তমানে ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। বিশেষ করে আইনি সংস্কারের দিকটিই প্রাধান্য পাচ্ছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে। কেননা শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আইন ছাড়াও কিছু নিয়ম-নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়ন দরকার।
সংসদে আলোচ্য বিলটি তোলার সময় বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য আপত্তি উত্থাপন করে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেয়া শর্ত অনুযায়ী সরকার ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৩ নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কণ্ঠভোটে তার আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। এর আগে অর্থমন্ত্রী জানান, কারো পরামর্শে এ সংশোধনী আনা হচ্ছে না।
বস্তুত বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতির জন্যই ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা উত্তরণের জন্য অবশ্যই আইনি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। ব্যাংকিং আইন সংশোধনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ। এজন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তথ্য যাচাই-বাছাই না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে। যে কারণে অনিয়মে জড়িত নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধন জরুরি ছিল। এছাড়া ব্যাংকের পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতাকেও ব্যাংকে সুশাসনের অন্তরায় বলে গণ্য করা হয়। যে কারণে প্রস্তাবিত বিলে আরো বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি একক পরিবারের সদস্যের বাইরে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক থাকতে পারবে। তবে কোনো ব্যাংকের পর্ষদে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে একজনের বেশি ব্যক্তি প্রতিনিধি পরিচালক নিযুক্ত হতে পারবে না।
সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের পর্ষদে প্রাকৃতিক ব্যক্তিসত্তা বিশিষ্ট ব্যক্তি শেয়ারহোল্ডারের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারবে না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের শেয়ারের মালিক হলে তার প্রতিনিধি হিসেবে অন্য কোনো ব্যক্তিকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না।
এভাবে ব্যাংকের পরিচালকদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার পাশাপাশি আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ব্যাংক খাত যেন গ্রাহকদের আস্থা না হারিয়ে ফেলে সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এজন্য খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কিন্তু ব্যাংকের পরিচালকরা যদি অনিয়ন্ত্রিত ভূমিকা পালন করেন, তাহলে এটি কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় সময়োপযোগী ব্যাংকিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যে কারণে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এটি বলা যায়, আইন সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এজন্য বিভিন্ন সময়েই আইন সংশোধন করা হয়েছে। স্বচ্ছ ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে এর বিকল্প নেই। তবে আইন শুধু লিপিবদ্ধ থাকলেই চলবে না, আইনের প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশের ব্যাংক খাতকে আধুনিক ধারায় পরিচালনা করা যাবে। ব্যাংক খাতের ওপর আমাদের অর্থনীতি অনেকাংশে জড়িত। যে কারণে জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ব্যাংকগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। ব্যাংক ইতিবাচক ভূমিকায় থাকলে বিনিয়োগ সচল থাকবে এবং আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। এজন্য প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইন এ খাতে সুশাসন নিশ্চিতে ভূমিকা রাখুক আমরা সে প্রত্যাশাই করছি। সংশোধিত আইন পাস হলে সেটির যথাযথ প্রয়োগ হবে, এটিই আমাদের কাম্য।










