বাংলাদেশ ইতিহাস দিয়ে রচিত। আন্দোলন-সংগ্রাম এ দেশের জনগণের শিরায় শিরায় বহমান। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীন দেশে যতবার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের আবির্ভাব হয়েছে, ততবারই সেই সরকারের পতন নিশ্চিত করেছে জনতা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে। ইতিহাস প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের জয়গাথা লিখে রেখেছে। ব্যতিক্রম হলো না এবারো। গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচি ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনে কারফিউ ভঙ্গ করে সর্বস্তরের মানুষ ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। এর মধ্যে গতকাল দেশের ক্ষমতাসীন সরকার তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে। এ নিয়ে দেশব্যাপী মানুষের আনন্দ-উল্লাস। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর চারদিক থেকে লাখো মানুষ গণভবনে যায়।

সরকার পদত্যাগের এ আন্দোলনের শুরু সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে। এ দাবি ঘোষণা করেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। দাবি আদায়ে ৩ আগস্ট থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। লাখো মানুষ রাস্তায় মিছিল করে। তাদের মুখে একটাই স্লোগান ছিল—সরকারের পদত্যাগ। অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে দেশে সংঘাত-সহিংসতায় নিহত হয় শতাধিক মানুষ। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরুর পর ১৬ জুলাই সংঘাত-সংঘর্ষে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এরপর আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ ও সংঘাতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ২১৭ জন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। 

সরকার যত আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়, রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের মাধ্যমে সহিংসতা ছড়ায়, কোটা সংস্কার আন্দোলন আকারে তত বড় হতে থাকে। সরকারের দমন-পীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের হত্যার বিচারসহ মোট নয় দফা দাবি উত্থাপন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দাবির বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। উল্টো সহিংসতা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়করা এবং তারা সফল হয়েছেন। 

বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই সরকারের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি সব হত্যা ও অন্যায়ের বিচারের অঙ্গীকার করে সেনাবাহিনীর প্রতি সবাইকে আস্থা রাখার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান সফল হওয়ায় বর্তমানে দেশজুড়ে যতটা উল্লাস, অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে ততটা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সম্মুখেও দাঁড়িয়ে আছে দেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আসনে কে বসবেন এবং আগামীতে দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, আর্থসামাজিক অবস্থাসহ সবক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা। 

যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা জানিয়েছেন অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-নাগরিকের প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এর বাইরে কোনো সরকার মেনে নেয়া হবে না। ৫ আগস্টের এক বিবৃতিতে তারা এ কথা জানান। সেখানে আরো বলা হয়, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ করে নতুন বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণ করা হবে।

আশঙ্কা রয়েছে একটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে নানা স্থাপনায় ভাংচুর করা হয়েছে। আগুন দেয়া হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী নেতা ও পরিবারের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে নানা জায়গায়। তবে এসব দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি শোচনীয় অবস্থা হবে দেশের অর্থনীতির। শিগগিরই তাই স্থিতিশীলতা আসা প্রয়োজন। এখন মনোনিবেশ করতে হবে নতুন দেশ গড়ায়। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন বেগবান হলে এর প্রভাবে নিত্য দিন যাপন থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুতে নেমে এসেছে বেহাল দশা। টানা কয়েক দিন ইন্টারনেট সেবা ও ব্যাংক বন্ধ থাকায় আর্থিক লেনদেন, আমদানি-রফতানি, রেমিট্যান্স প্রবাহে মন্থর গতি নেমে আসে। এছাড়া আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভ, সংঘাত-সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় উৎপাদন ব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে। পরবর্তী সময়ে কারফিউ ধীরে ধীরে শিথিল ও ইন্টারনেট সংযোগ চালু হলে কিছুটা গতি ফিরে পায় অর্থনীতির চাকা। কিন্তু এরই মধ্যে আবারো দেশে চলমান অসহযোগ আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংসতার মধ্যে বন্ধ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া শিল্প-কারখানাও। ব্যাংক বন্ধ থাকায় দেশের বন্ধ রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি-রফতানিসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। 

জুলাইয়ের সংঘাত-সহিংসতার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশী প্রবাসীদের ভেতরও। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রবাসীদের অনেকাংশ রেমিট্যান্স শাটডাউনের ঘোষণা দেয়। ব্যাংক ও অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন বন্ধ থাকায় দেশে ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছে জুলাইয়ে, যার প্রভাব পড়েছে রিজার্ভে। জুনের তুলনায় গত মাসে ৬৩ কোটি ডলার বা প্রায় ২৫ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে। আর জুলাইয়ে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১৩০ কোটি বা ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুসারে দেশের রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। ৩১ জুলাই তা ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহারযোগ্য নিট রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম। এ অবস্থায় আবারো ব্যাংক বন্ধ থাকার অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ লেনদেনের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের সব কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে, আমদানি ও রফতানির ঋণপত্রও (এলসি) খোলা সম্ভব হবে না। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। 

এর আগে ব্যাংক বন্ধের পাশাপাশি ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশে অর্থ লেনদেনের স্বীকৃত মাধ্যমগুলোর মধ্যে কেবল এটিএম বুথ সচল ছিল। যদিও ওই সময় দেশের বেশির ভাগ এটিএম বুথই টাকার সংকটে বন্ধ হয়ে যায়। বুথে নগদ টাকার সংকট এখনো চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার এটিএম বুথে গতকালও চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ক্রমাগত লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায়। চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে থাকলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো আরো কঠিন হয়ে উঠবে, বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকটগুলো আরো প্রকট হবে।

এ পরিস্থিতিতে বর্তমানে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যত শিগগির সম্ভব অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সামলাতে হবে।