বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ মুহূর্তে এমন একটি সন্ধিক্ষণে এসেছে, সবাই মনে করছেন যে ব্যাপক সংস্কার সাধনের এটাই উপযুক্ত সময় এবং এই দুর্লভ সুযোগটি কোনোভাবেই হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে এমন কিছু পরিবর্তন আনতে হবে, যেগুলো কিনা ইএসজি বাস্তবায়ন, ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি, জনগণের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হবে একটি স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং সব ধরনের দুর্নীতি দমন করবে।
এ কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই আমাদের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হবে এবং কোনোভাবেই বিশেষ করে আর্থিক খাতের দুর্বলতাগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাবে পুঞ্জীভূত বিপুল খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অপর্যাপ্ত জবাবদিহিতার নজির তৈরি হয়েছে। এই ত্রুটিগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং ব্যাপকভাবে এর মাশুল দিয়ে চলেছে জাতি।
আমাদের আর্থিক খাতের কাঠামোটা অনেকটাই ত্রুটিপূর্ণ, যার কারণে তরুণ উদ্যোক্তারা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো (এসএমই) ব্যবসায় বেশি দূর এগোতে পারেন না, যদিও এই কাঠামোটা ঋণদাতাদের স্বার্থ ঠিকই রক্ষা করে। আবার ব্যবসা থেকে প্রস্থান করার একটি উপযুক্ত প্রস্থান নীতি ও এক্সিট পলিসি না থাকার কারণে ঋণগ্রহীতারাও অনিশ্চয়তার পড়েন, তারা যে পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াবেন, এমন কোনো সুযোগই পান না। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে আমাদের অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে অনধিকার হস্তক্ষেপ থাকবে না এবং সর্বত্র জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতা বিরাজ করবে; দেশের আইন বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করবে এবং এ ব্যবস্থায় নেতারা অর্থনীতির অগ্রগতির সহায়ক শক্তি হিসেবে এবং বৈষম্য মোকাবেলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন।
নিঃসন্দেহে যেকোনো নতুন শাসন/গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কার সাধন করা—যা প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেয়। এই ব্যবস্থা স্বার্থান্বেষী মহলগুলোকে অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দেয় এবং প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণকে প্রতিহত করে, যা অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।
এই সংকটময় সময়ে ব্যবসা যেন কোনোভাবেই রাজনীতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে; সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং সরবরাহ চেইনকে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো উৎপাদনকে ব্যাহত করেছে। রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং শিল্প নিরাপত্তাকে আবশ্যিকভাবে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে সর্বজনসম্মত একটি ঐকমত্য থাকতে হবে।
এ ব্যবস্থায় একটি গভর্ন্যান্স কাঠামো থাকবে, যা সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলোয় অন্তর্ভুক্তিমূলকতা নিশ্চিত করবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং অধিকতর জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো ব্যবসার ক্ষতি করে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য সরকারি দপ্তর/বিভাগগুলোয় কাজের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরজুড়ে পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা সরকারের কার্যক্রমগুলোকে ব্যাহত করে, স্বচ্ছতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা শিল্পের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব রাখে। বিশেষ করে শিল্পে কাস্টমস, বন্দর বা কর সম্পর্কিত কার্যক্রমগুলোর প্রভাব অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে।
এলডিসি থেকে মসৃণভাবে উত্তরণ আমাদের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্ব বহন করে; তবে এই গ্র্যাজুয়েশন আমাদের সম্পদ, সময়, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং গভর্ন্যান্স সম্পর্কিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে কী ধরনের প্রভাব রাখবে সেগুলোও দেখার বিষয়।
সংস্কার এজেন্ডায় অবকাঠামো, লজিস্টিকস, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া উচিত হবে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোয় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, দেশগুলোয় শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে এবং জটিল প্রকল্পগুলোয় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগও হয়েছে।
যা হোক, বাংলাদেশ এখনো গ্লোবাল লজিস্টিক পারফরম্যান্স সূচকে অনেক প্রতিযোগীর পেছনে রয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক বন্যার সময়ও আমরা দেখেছি, চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। এ পরিস্থিতি অবকাঠামো এবং টেকসই জ্বালানি খাতে আরো বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে আমাদের নীতিগুলোকে সারিবদ্ধ করার জন্য আমাদের অবশ্যই বাণিজ্য এবং বৈদেশিক নীতিগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে তারা কেবল বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগী খেলোয়াড় হিসেবে অবস্থান নিতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করবে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানো এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তির অভাব রয়েছে—এমন ক্ষেত্রগুলোয় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দেয়ার সময় আমাদের অবশ্যই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর (এসএমই) স্বার্থ রক্ষা, ইএসজি এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয়া এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতার প্রসার প্রভৃতি বিষয়গুলোয় সতর্কতার সঙ্গে মনোযোগ দিতে হবে। নতুন নতুন ধারণার আলোকে নীতিকাঠামো প্রণয়ন করে এসব ক্ষেত্রে কাজ করা যেতে পারে, আরো অর্থবহ প্রভাব সৃষ্টি করা যেতে পারে।
সংস্কারমূলক এ নতুন অধ্যায় একটি সর্বজনগ্রাহ্য রূপকল্প গ্রহণ করবে, যা আমাদের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতীতের সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে মুক্ত হয়ে প্রবৃদ্ধি ও সুযোগের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। পরিবর্তনের পালাবদলের সময় এখনই।
মো. মহিউদ্দিন রুবেল: ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রাক্তন পরিচালক, বিজিএমইএ










