বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক সংকটের ফলে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যগুলোর বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রয়াদেশও মিলছে না। বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পণ্য রফতানি হয়েছে ৫ হাজার ৫২ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের। যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৫৮ বিলিয়ন (৫ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারের চেয়ে ৭৪৭ কোটি কম। বিগত অর্থবছরের বাকি এক মাসে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অসম্ভব বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চলমান এ মন্দা সত্ত্বেও নতুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানির লক্ষ্য ৬০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলার নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। প্রস্তাবিত এ লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের ৫৮ বিলিয়ন (৫ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারের তুলনায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার বেশি।

এমতাবস্থায় খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকে ইপিবির প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের অনেকে সরকারের তরফ থেকে নীতিসহায়তা চেয়েছেন। রফতানির লক্ষ্যমাত্রা স্বল্পমেয়াদে নির্ধারণে সরকারকে অবশ্যই বৈশ্বিক বাজারের মন্দা অবস্থা তথা বাজার ব্যবস্থার অন্যান্য অনুঘটক বিবেচনায় নিতে হবে। মহামারী কভিডের রেখে যাওয়া প্রভাবে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্রান্তিকালের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

দেশের রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশ এখনো আসে পোশাক শিল্প থেকে, যা কোনোভাবেই স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। পোশাক শিল্পেও অদূরভবিষ্যতে অটোমেশনের প্রভাব পড়বে, যেহেতু বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। অথচ আমাদের রফতানি পণ্যগুলোর প্রায় সবগুলোই এখনো আসছে প্রাথমিক শিল্প খাত ও মাধ্যমিক শিল্প খাত থেকে। এমতাবস্থায় রফতানি পণ্যগুলোর বৈচিত্র্যায়ণ তথা নতুন বাজার অনুসন্ধান অতিজরুরি।

বাংলাদেশী পণ্যের শীর্ষ রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বছরব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশী পণ্যের আরেক বৃহৎ গন্তব্য ইউরো অঞ্চলের দেশ জার্মানি। এ দেশেও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি জার্মানিতেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু গন্তব্য দেশগুলোর ভোক্তা খাতে ব্যাপক চাহিদা মন্দা দেখা দিয়েছে। এ কারণে এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রয়াদেশ পাচ্ছেন না রফতানিকারকরা।

বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া শীর্ষ পাঁচ পণ্য হলো পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্য। কভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাত কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ক্রমেই বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের সব দেশকেই গত অর্থবছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। এ সময় খাদ্য ও জ্বালানির মতো অতিজরুরি পণ্যের চাহিদা মেটানোয় ভোক্তাদের মনোযোগ ছিল বেশি। তাদের কেনাকাটায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্য এখন অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে সরে গেছে। ভোক্তাদের এ প্রবণতার কারণে পোশাক খাতের প্রধান রফতানি গন্তব্যগুলোর ব্র্যান্ড রিটেইলার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ক্রয়কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। এজন্য মানসম্মত পণ্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। না হলে চলতি অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। এটি শুধু এ অর্থবছরের জন্যই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া রফতানি পণ্যের তালিকায় সম্ভাবনাময় অন্যান্য পণ্যও যুক্ত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে হালকা প্রকৌশল খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে। এ খাতের বাজার সম্প্রসারণ হলে সেটি মেড ইন বাংলাদেশ পণ্য তৈরি ও প্রসারে সহায়তা করবে। প্রসঙ্গত, ধাতব ও অধাতব বস্তু ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারি, যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশ উৎপাদন, উন্নয়ন বা ডিজাইন করে প্রকৌশল বা প্রযুক্তির সমন্বয়ে ম্যানুয়াল, সেমি অটোমেটিক বা অটোমেটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে হালকা প্রকৌশল পণ্য উৎপাদন করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশের লেদার ও ইলেকট্রনিক শিল্প দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখন রফতানিও করছে। বিভিন্ন কুটির শিল্প, জাহাজ, স্টিল, বাইসাইকেল, ফার্নিচার ইত্যাদি রফতানি করে যেমন প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে তেমনি একই সঙ্গে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের সুনাম বাড়ছে।

এখন এ সুনাম ধরে রাখার প্রতি মনোযোগী হতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অনুযায়ী নতুন বাজার খুঁজতে হবে। সেই সঙ্গে মানহীন পণ্য যেন রফতানি না হয়, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। এটা সত্য যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংকট বিরাজ করলে আমাদের রফতানির ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় ইপিবির রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত কিনা সেটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ রফতানি কমলে এটি রফতানিকারক সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। এমনকি আমাদের চেয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানিও অনেক কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় রফতানির প্রধান বাজারগুলোর সাম্প্রতিক পরিপ্রেক্ষিতে প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার পরিস্থিতিও নেই। ইপিবির নতুন অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্যমাত্রার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। গত অর্থবছরে রফতানির প্রধান গন্তব্যগুলোয় রফতানি নিম্নমুখী থাকায় এ সময়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা করা উচিত। যদিও এক্ষেত্রে বিতর্ক চলছে, রফতানিসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন রফতানি গন্তব্যের প্রধান দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরায় চাঙ্গা হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকলে রফতানি লক্ষ্য অর্জন নিয়ে খুব সমস্যা হবে না বলা হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ডিসেম্বরের পর বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এমন পূর্বাভাসও দেয়া হচ্ছে। আমাদের প্রধান রফতানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাড়বে এমন আভাস মিলেছে বলে ইপিবির মত। এমন পরিস্থিতিতে খুবই সতর্ক পদক্ষেপে এগোতে হবে। এছাড়া পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকলেও যেন রফতানি লক্ষ্যমাত্রায় ছেদ না পড়ে সেজন্য বিকল্প বাজার অনুসন্ধান জরুরি। আমরা প্রত্যাশা করব সরকার এক্ষেত্রে যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে এবং অন্যান্য যেসব পণ্যে রফতানি সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলো রফতানির ক্ষেত্রে মনোযোগী হবে।