তিলোত্তমা ঢাকা নগরীতে বনভূমির পরিমাণ কমছে। একের পর এক উন্নয়ন অবকাঠামো গড়ে তুলতে গিয়ে ধ্বংস হচ্ছে অবারিত সবুজ। এরই ধারাবাহিকতায় ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়কের আইল্যান্ডের গাছ কাটা হচ্ছে। অন্যান্য এলাকায়ও উন্নয়নের নামে সবুজ নিধনের আয়োজন চলছে। এভাবে ক্রমাগত বনভূমি ধ্বংস করা আমাদের জন্য ইতিবাচক কোনো বার্তা বয়ে আনছে না। পরিবেশের ওপর যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং নগরবাসীকে এর নেতিবাচক ফল দীর্ঘদিন ভোগ করতে হবে। 

 ক্রমাগত কংক্রিটের বিস্তারে শহরের স্বাভাবিক আবহাওয়া আর বজায় থাকছে না। গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে নগরবাসী। এর কারণ হিসেবে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় না রেখে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক বনভূমির অভাবে শহরের উষ্ণতা বেড়ে গেছে। সুপেয় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর পরও বৃক্ষনিধন থামছে না। প্রকৃতির ওপর এমন অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে নগরবাসীর জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে বলে পরিবেশবাদীরা মত দিচ্ছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্টের অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এজন্য ওইসব এলাকায় থাকা বড় অনেক গাছ কাটা পড়বে। যে সময়ে তাপপ্রবাহে রাজধানীসহ পুরো দেশের মানুষের ত্রাহি অবস্থা ঠিক সে সময়ে গাছ রোপণ না করে একের পর এক পুরনো গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত দুঃখজনক। টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই পরিবেশসম্মত উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন যে পরিবেশকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উন্নয়ন—এ কথা অনেকেই বুঝতে চান না। এ মুহূর্তে এ সত্য না বুঝলে বিপদ আরো বাড়বে। একবার গাছ কেটে ফেললে আবার আগের অবস্থায় যেতে অনেক সময় লাগবে। তাই গাছ কাটার আগে, বন বরাদ্দ দেয়ার আগে সব ক’টি বিকল্প চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষা করেই উন্নয়ন করতে হবে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যত বাড়ছে, পরিবেশ সূচকে ততটাই পিছিয়ে পড়ছে। আগে উন্নয়ন পরে পরিবেশ নাকি পরিবেশ বাঁচিয়ে উন্নয়ন—এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। পরিবেশকে আর্থিক মানদণ্ডে প্রকাশ করা জরুরি। প্রমাণ করা জরুরি, কেন বর্তমান অর্থনীতির ব্যবস্থায় পরিবেশকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব হবে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অন্যতম ভূমিকা রাখে গাছপালা। বৃক্ষনিধন দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়, প্রতিনিয়ত মানুষ গাছ উজাড় করে চলেছে। কেউ সচেতন নয় গাছ কাটার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে। বৃক্ষনিধন করে সভ্য নগর পরিকল্পনার নামে গড়ে উঠছে বড় বড় অবকাঠামো। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশ বার্ষিক গাছ উজাড় হওয়ার হার বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। গত ১৭ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬ বর্গকিলোমিটার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় দেশের এমন খারাপ অবস্থানের কথা চিন্তা করেও সরকারের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক অঞ্চলের গাছ কাটা রোধ করতে করতে অন্য কয়েকটি অঞ্চল মরুভূমির ন্যায় পতিত হচ্ছে। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই তখন উন্নয়নের কথা বলা হয়। আসলে উন্নয়ন হচ্ছে নাকি উন্নয়নের নামে অজুহাত দিয়ে এসব বৃক্ষনিধনের পরিকল্পনা চলছে, তা বোধগম্য নয়। 

সাম্প্রতিক রাজধানীর সাত মসজিদ রোডে নগর উন্নয়নের নামে ডিভাইডার সংস্কার প্রকল্পে নির্বিচারে গাছ নিধনের ব্যাপারটি জাতীয় আলোচনায় এসেছে, যা প্রশাসনের অপরিণামদর্শিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আরো উন্নত শ্রেণীর গাছ লাগানোর আশ্বাস দেয়। তবে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃক্ষনিধন। গাছপালায় ঘেরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যানজট শহরে এক ধরনের প্রাণস্বরূপ। কিন্তু সেখানে গাছ কেটে উন্নয়নের নামে প্রাণহীন করে দেয়া হচ্ছে এ উদ্যানকে। এ উদ্যানে অবসর সময় কাটাতে আসে হাজার হাজার মানুষ। সেই সবুজের সমারোহ নষ্ট করতে ব্যস্ত সুযোগসন্ধানী কিছু মানুষ। উদ্যানটিতে প্রবেশ করলেই আগে চোখে পড়ত গাছগুলোর সৌন্দর্য আর এখন উদ্যানটিতে ঢুকলেই দেখা মেলে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা কাটা গাছের গুঁড়ি আর কাটার জন্য চিহ্নিত করা গগনচুম্বী সব গাছ। রেস্টুরেন্টের স্থাপনার পাশাপাশি ওয়াকওয়ে তৈরির জন্যও চলছে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি। এটি করতেও কাটা পড়ছে শতাধিক গাছ। উদ্যানের বিভিন্ন স্পটে পড়ে থাকা বড় বড় গাছের গুঁড়ি জানান দেয় কিছু সুবিধাভোগী মানুষের কথা, যারা উন্নয়নের নামে এমন বৃক্ষনিধন বহুকাল ধরে করে আসছে। এমন ঘটনা যে শুধু ধানমন্ডি বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই ঘটছে তা নয় পুরো দেশেই গাছ কেটে চলছে নির্মাণকাজ। আর এ কাজের জন্য সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত অজুহাত দেয়া হচ্ছে উন্নয়নের কথা বলে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের জীবন। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সবকিছুর ওপর পড়বে। কিন্তু এ কথা বিবেচনা না করে বন উজাড় করে নিত্যনতুনভাবে তৈরি করা হচ্ছে অবকাঠামো। এ নিয়ে সরকারের নানা নির্দেশনা আছে, আছে পরিবেশ আইন। কিন্তু তার পরও থেমে নেই কিছু, বৃক্ষনিধন চলছেই। নতুন করে বৃক্ষরোপণের চিন্তা না থাকলেও প্রতিনিয়ত গাছ কেটে ব্যবসায়িক কাজে লাভবান হওয়ার চিন্তা সবার মাথায় আছে। উন্নয়নের নামে এ বৃক্ষনিধন মেনে নিলে ভবিষ্যতে বিপর্যয় নেমে আসবে। আগে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন তারপর অবকাঠামো নির্মাণ। পরিবেশ সুরক্ষিত না করে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কাম্য নয়। 

উন্নত দেশগুলো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণে তারা গাড়ি চলাচলের সড়ক কমিয়ে হাঁটাচলার জন্য বৃক্ষশোভিত অঞ্চল তৈরি করছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানির সরকার সড়কের পাশাপাশি ব্রিজ-কালভার্টও ভেঙে ফেলছে। ওই স্থানে পানিপ্রবাহ ও বৃক্ষ দিয়ে শোভিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় তারা এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি তারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসছে। সেখানে বাংলাদেশ উন্নয়নের নামে পরিবেশবিধ্বংসী একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম নদী দখল-ভরাট ও বৃক্ষনিধন। এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। 

নগর উন্নয়ন মোটেও অসমীচীন কিছু নয়, তবে গাছ কেটে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা যৌক্তিক নয়।৷ সাম্প্রতিক জরিপে এসেছে যে বিগত দশকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। যার পেছনে পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা অপরিকল্পিতভাবে গাছ নিধনকে দায়ী করেছেন। একটি সুস্থ নগরীতে যেখানে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা জরুরি সেখানে ঢাকা নগরীতে রয়েছে ৮ শতাংশেরও কম। যার পেছনে বিভিন্ন ধরনের অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন প্রকল্প দায়ী। এর আগে, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় পার্ক, ফুটপাত, বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের জন্য অসংখ্য গাছ নিধন করা হয়েছে। নগর উন্নয়নের লক্ষ্যে গাছ কাটা হলেও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবশ্যই আরো বেশি বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। সে অনুযায়ী প্রশাসনের উদ্যোগ দেখা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী ফল প্রকাশ পায় না।

উন্নয়নের কথা বলে রাজধানীর গাছ কাটা অযৌক্তিক। যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক গাছও নেই সেখানে ছোট ছোট প্রকল্পের নামে গাছ কাটা একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা দুঃখজনক। এ ধরনের ভুল চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঢাকা শহরের যে অবস্থা সেখানে নতুন করে গাছ লাগানোর কথা। কিন্তু সেটা না করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন উল্টো গাছ কাটছে। বড় বড় গাছ কেটে ছোট ছোট গাছ লাগাচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর কী বিরূপ প্রভাব পড়বে তা যাচাই করা হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। জনগণের টাকায় গাছ কেটে জনগণকেই তাপপ্রবাহ ও দুর্যোগের সঙ্গে বসবাসে বাধ্য করা হবে, এটা সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। গাছ রেখেও কীভাবে উন্নয়ন করা যায় সিটি করপোরেশনকে সে উদাহরণ দেখাতে হবে। 

প্রশাসনকে রাজধানীর এ বৃক্ষনিধন রোধ করে উন্নয়নের চর্চা বন্ধ করতে হবে। মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির বেঁচে থাকা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমরা সুস্থ প্রকৃতি চাই, সুন্দর প্রকৃতি চাই। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন চাই না। উন্নয়ন একটি উপায়, উন্নয়ন কখনো লক্ষ্য হতে পারে না। উন্নয়ন করা হয় মানুষের ভালোর জন্য, মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য, নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী একাধিক সভা, আলোচনা, এমনকি মন্ত্রিসভার বৈঠকে পরিবেশ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের কথা বলেছেন। প্রত্যাশা থাকবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং উন্নয়নের নামে গাছ কাটা থেকে বিরত থাকবে।