পেঁয়াজ ও চিনির বাজার হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠেছে। চিনির দাম বেঁধে দেয়া সত্ত্বেও তা কার্যকর হচ্ছে না। উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্যের সঙ্গে পেঁয়াজের বাজারের সামঞ্জস্য নেই। সরকারের তথ্যমতে পর্যাপ্ত জোগান থাকা সত্ত্বেও কেন দুটি পণ্যের বাজার অস্থির হয়ে উঠল, তার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রীও তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সরকার চিনির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।’ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তব পরিকল্পনা এবং পণ্যসামগ্রীর চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করা। এজন্য দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ করে কৃষিপণ্যের সরবরাহে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি হতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এর বাইরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে। কেন্দ্র থেকে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষেত্র পর্যন্ত ব্যবস্থাপনাও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানীকৃত ও দেশজ উৎপাদিত এ দুই ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
চিনির মিল মালিকদের কারসাজিতে বাজারে দাম বাড়ছে। দেশে মাত্র পাঁচটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চিনি আমদানি করে থাকে। দেশে ডলারের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে তারা চিনির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে এতে সরকার বাধা দেয়। ফলে তারা বাজারে চিনির সংকট সৃষ্টি করে। এতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় চিনির দাম অব্যাহতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দেশে চিনি উৎপাদনে সরকারের মনোযোগ প্রদান এবং আমদানি অবাধ ও উন্মুক্ত করা গেলে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। এছাড়া সরবরাহ সংকট না থাকলেও প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম মাসের ব্যবধানে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। এদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার পণ্য মূল্য তালিকায় দাম বাড়ার চিত্র লক্ষ করা গেছে। টিসিবি বলছে, মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১১ শতাংশ বেশি দামে। একইভাবে বেড়েছে রসুন ও আদার দামও। তেলের দামও ক্রমান্বয়ে বাড়তির দিকে। পাশাপাশি মাছ, মাংস, সব ধরনের সবজির দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে রীতিমতো দিশাহারা ভোক্তা। রোজার আগে পেঁয়াজ ছাড়া সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতি ছিল। প্রশাসনের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে বাজার দামে কিছুটা উত্তাপ কমলেও এখন প্রতিটি পণ্যের বাজার আবারো বেড়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
গত সাত মাসে সরকার ছয়বার চিনির দাম বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু কোনোবারই নির্ধারিত সেই দামে চিনি বিক্রি হচ্ছে না। নিত্যপণ্যের প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। আমরা দেখেছি অতীতে, ঘোষিত দর কখনই বাজারে প্রতিফলিত হয় না, বরং বেঁধে দেয়া দরের চেয়ে বেশি দামে পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। দুঃখজনক হলো এসব তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ক্রেতাদের জিম্মি করে অধিক মুনাফা হাসিলের সুযোগ পাচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজে আসছে না। সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে গিয়েছিল। জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের কারণে তা আরো বেড়েছে। আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় পেঁয়াজের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের পেছনে। চাহিদার সঙ্গে দাম যাতে না বাড়ে, সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো দৃশ্যত কিছু বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়ে থাকে। তবে আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, এসব ব্যবস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না।
বর্তমানে পেঁয়াজের যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা তা সনাতন এবং একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। অসহায় কৃষক ব্যাপক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে পেঁয়াজকে হয় ঘরের চিলেকোঠায়, না হয় মেঝেতে বিছিয়ে অথবা পাটের বস্তায় চার-ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের চেষ্টা করে, যার বেশির ভাগ অংশই পচে নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে জুন ও জুলাইয়ে যখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজ করে, তখন পেঁয়াজ ব্যাপক হারে নষ্ট হয়। তাই পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এর সংরক্ষণেরও উপযুক্ত বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য অন্তত ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ীর মতো যেসব এলাকায় পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হয় সেসব এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত হিমাগার গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী বা কম মেয়াদি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। বাজারে পেঁয়াজের জোগান যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তার জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। দাম কিছুটা বাড়লেই খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা যেন হুজুগে বেশি মাত্রায় কিনে মজুদ না করে, তার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখাসহ উৎপাদন মৌসুমে কৃষক যেন তার উৎপাদিত পেঁয়াজের উপযুক্ত দাম পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু অনামৌসুমে ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেই আমদানির ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বাজার তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতাই ওই সময় পেঁয়াজের মূল্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে। পেঁয়াজ যেহেতু বাংলাদেশের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তাই আগামী দিনে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে পেঁয়াজ বাজারের অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। দেশের পাঁচটি কোম্পানি চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ আছে। আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কথাবার্তা উঠলে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পরস্পরের ওপর দোষারোপ করে থাকেন। এভাবে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করলেও এটি যে মূলত ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে ব্যবসায়ীরা তাদের লাভ ছাড়া সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন না, সেই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সরকার দেখলেও ক্রেতাসাধারণের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা আমাদের চোখে পড়ে না। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। কেউ ইচ্ছা করে বাজারে সংকট তৈরি করলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মুনাফালোভীদের ছাড় দেয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে আমরা সব পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করছি। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এবার মিল ও করপোরেট পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেখানে অনিয়ম পাব সেখানেই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারদর সবসময় স্থিতি থাকবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে দাম বাড়ার একটি সীমারাখা থাকা বাঞ্ছনীয়। দেশের চাহিদা, উৎপাদন এবং আমদানি সম্ভাব্যতা বিচার করে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে বাজারদর নির্ধারণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে একটি বাজার নীতিমালা বা কমিশন করা যায় কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রথমত সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের দাম কমে গেলে সরকার আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা করে থাকে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি শুল্ক কমিয়ে বাজার সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কম দামে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার টিসিবির মাধ্যমে সেটি করেও থাকে। বর্তমানে যেভাবে চালসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে, তাতে টিসিবির বিক্রয় কার্যক্রম শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত করতে হবে। পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হয়। দ্রব্যমূল্যের এ অযৌক্তিক বৃদ্ধির পেছনে কাজ করে বাজার সিন্ডিকেট বা চক্র। তারা যোগসাজশের মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো তারা পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। নানা অজুহাত তুলেও বাড়ানো হয় পণ্যের দাম। এ অবস্থায় বেশি দামে পণ্য ক্রয় করা ছাড়া ভোক্তাদের কোনো উপায় থাকে না। এভাবে দ্রব্যমূল্য, বিশেষত নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো অপরাধ বটে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের শাস্তি হওয়া উচিত; কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা বিরল। ফলে কারসাজি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এ প্রবণতা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সরকারের।










