কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিদেশী বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। একসময় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ভালো অবস্থানে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নানা সংকটে পড়ে, বিশেষ করে রিজার্ভ ক্ষয় ও মার্কিন স্যাংশনের কারণে এফডিআই প্রবাহ ক্রমেই কমছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শতাংশ হিসাবে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের দিক থেকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। বাংলাদেশের এফডিআই জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে যেসব অর্থনৈতিক সংকট চলমান, সেগুলো থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কেবল অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা নয়, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশকে বার্ষিক জিডিপির ১ দশমিক ৬৬ শতাংশের সমপরিমাণ সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ লাভ করতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ এফডিআই আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রভৃতি উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যর্থ হয়েছে। বলা বাহুল্য, এখন বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও বিশ্ব পরিমণ্ডলে আস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ করা সময়ের দাবি। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ।
দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা বেড়েছে। ২০১৪ সালে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে ১৩টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এছাড়া ট্যাক্স, শুল্কছাড় ও মুনাফার প্রত্যাবাসনও অন্যতম। দুঃখজনকভাবে এসব ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তন এখনো পরিলক্ষিত হয় না। এসব কারণের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন ও মার্কিন বিধিনিষেধ। যে কারণে এফডিআই ক্রমহ্রাসমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এক্সটার্নাল ডেট, জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৩’ প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে ২০২২ ও ২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের মজুদ (পুঞ্জীভূত বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টক) হ্রাস পেয়েছে।
দেশে বিদেশী বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে একটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এর কয়েক কর্মকর্তার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। এতে দুই দেশের সম্পর্কে দেখা দেয় টানাপড়েন। এ টানাপড়েন প্রকট রূপ নেয় বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার অভিযোগের মাধ্যমে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে দেশের এক সাবেক সেনাপ্রধান ও তার পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিধিনিষেধ-নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এ টানাপড়েনের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পতনও ধারাবাহিকভাবে হতে থাকে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) স্বীকৃত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাবায়নের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ২০২২ সালের জুন শেষেও ছিল ৩ হাজার ৩৩৮ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের জুন শেষে তা আরো কমে ২ হাজার ৪৭৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ডিসেম্বর শেষে তা আরো কমে নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ১৮৭ কোটি ডলারে। এ নিম্নমুখিতা অব্যাহত আছে এখনো। সর্বশেষ ২১ মে পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৬১ কোটি ডলারে। তবে দেশের ব্যবহারযোগ্য নিট রিজার্ভের পরিমাণ আরো কম। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক কখনই সে তথ্য প্রকাশ করে না।
মুনাফা প্রত্যাবাসনে জটিলতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধ এবং ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভের পতন বাংলাদেশে বিনিয়োগে বিমুখতা তৈরি করেছে। এরই মধ্যে ফিচ রেটিং বাংলাদেশের রেটিং অবনমন করে ‘বি প্লাস’-এ নামিয়ে এনেছে। এ পরিস্থিতিতে রিজার্ভ পরিস্থিতি ও মার্কিনদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।
রিজার্ভ সংকটের কারণে দেশে পরিচালনাধীন বিদেশী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এছাড়া রয়্যালটি ফি পরিশোধসহ সংশ্লিষ্ট বিদেশী পক্ষগুলোর সঙ্গে লেনদেন করতে গিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নতুন বিনিয়োগ তো কমেছেই, পুনর্বিনিয়োগ যা হয়েছে সেটিও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনের জটিলতার মুখে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফডিআই স্টক এখন ধারাবাহিকভাবে কমছে। যেখানে বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন বা শতকোটি ডলারের বেশি এফডিআই স্টকের উৎস দেশের তালিকায় প্রথমে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর পর্যায়ক্রমে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, নেদারল্যান্ডস ও হংকং।
বিদেশী বিনিয়োগ কেবল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো বিষয় নয়। অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, বিদেশী নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ এবং সংযোগ (কানেক্টিভিটি) ঘটানো ও রক্ষার ক্ষমতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ইত্যাদি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অবকাঠামোগত সুবিধা, উন্নত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, সহায়ক শিল্পের বিকাশ, দক্ষ ও প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, বাজার সুবিধা ইত্যাদি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা প্রয়োজন। যেকোনো বহির্বিশ্বে দেশের কারণে ভাবমূর্তি নষ্ট হলে তা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে এবং বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। আর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো একটি বিষয় অনেকটা আগুনে ঘিয়ের মতো কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশের অনেক বন্ধু জোট আছে। ফলে এ দেশ থেকে বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা অন্য বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করবে সেটিই স্বাভাবিক। আবার দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটও বিদ্যমান। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কাজ করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অন্যান্য সংকটও দূরীকরণে কাজ করতে হবে। সরকার ও কূটনৈতিক মিশনগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত বছরের শেষে বিদেশী বিনিয়োগ কমার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। নির্বাচন ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হয়। সুতরাং বিনিয়োগ আকর্ষণে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে আস্থা পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুই বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বিনিয়োগকারীদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সহজেই অনুমেয়, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা না হলে বিদেশী বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। যদি বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, তবে নিঃসন্দেহে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।










