শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। আগামীর বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে আজকের শিশুর মাঝে। শিশুদের যদি আনন্দময় পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া যায়, তাহলে শিশুরা যথাযথভাবে বিকশিত হতে পারবে। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থিক পরিস্থিতিতে এটি সম্ভব হয় না। যে কারণে স্কুলে যাওয়ার বয়সে অনেক শিশুকেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়। এভাবে দারিদ্র্যের কবলে পড়ে শিশুদের আনন্দময় শৈশব হারিয়ে যায়। বেড়ে যায় স্বাস্থ্যহীনতা ও ক্রনিক রোগের ঝুঁকি। এমন বৈষম্যের মাঝেই আমাদের দেশের শিশুরা বেড়ে উঠছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫২ হাজার বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করছে। সেবামূলক কাজে যুক্ত আছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার শিশু। এছাড়া কৃষি খাতে নিয়োজিত আছে ৩৫ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, দেশে মোট শিশু শ্রমিকের ২ দশমিক ৭ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িত। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ ছেলে এবং শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ মেয়ে। ২০১৩ সালে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত ছিল ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে ঝুঁকিহীন পেশায় যুক্ত ছিল ৪ লাখ ১৮ হাজার শিশু। তবে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজারে। অর্থাৎ এক দশকে বৃদ্ধির হার ৬৯ শতাংশ। দেশে এখন মোট শিশু শ্রমিক রয়েছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার, যা ২০১৩ সালে ছিল ১৭ লাখ। অর্থাৎ এক দশকে শিশু শ্রমিক বেড়েছে ৮০ হাজার।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সংজ্ঞায় ৫-১৭ বছর বয়সীদের শিশু ধরা হয়। এর মধ্যে ৫-১১ বছরের শিশুরা সপ্তাহে ১ ঘণ্টা, ১১-১৩ বছর বয়সী শিশু সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা এবং ১৪-১৭ বছর বয়সী শিশুদের সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করালে তাকে শিশুশ্রম বলা হয়।

মূলত অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দারিদ্র্যের কারণেই শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হতে হয়। খোদ পরিকল্পনামন্ত্রী এ বৈষম্যের কথা স্বীকার করেছেন। এজন্য স্কুলগুলোয় মিড ডে মিল চালু করলে শিশুদের কাজ থেকে স্কুলে ফেরানো যাবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে খাবার জোগাড় করতে অর্থ উপার্জনের জন্য শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজের সংখ্যা কমতে পারে। না হলে শুধু বিনা বেতনে স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা খুব একটা কাজে আসে না, এমনটি অতীতে দেখা গেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩ বছরে ১ লাখ ৯০ হাজার শিশুকে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। এজন্য আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়, যার মাধ্যমে ১২ লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। সূত্রমতে, এরই মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় পাঠানো হবে।

৩৮টি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে গেজেট প্রকাশ করে। গত বছর আরো পাঁচটি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে (যদিও গেজেট হয়নি)। এ ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলে শিশুদের নিউমোনিয়া, কাশি, আঙুলে দাদ, দুর্ঘটনাজনিত দৈহিক ক্ষত, ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, হাঁপানি, যকৃতের দুরারোগ্য ব্যাধি, মূত্রাশয় ক্যান্সারের মতো রোগ হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, শিশুদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের পাশাপাশি তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও করতে হয়। না হলে অভিভাবকরা দ্রুত শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। দরিদ্র পরিবারগুলো মনে করে যে স্কুলে যাওয়া লাভজনক নয় এবং আগে থেকে কাজ শুরু করলে উপার্জনের অভিজ্ঞতা দ্রুত হয়ে যায়। যা পরে বেশি উপার্জনের ক্ষেত্রে কাজে লাগে। এজন্য নিম্ন আয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে তৎপরতা বাড়াতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এসব শিশুকে দরিদ্র বলে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি মোটেও মঙ্গলজনক হবে না। মূলধারায় বিকশিত না হলে এদের বিপথে যাওয়ারও সমূহ আশঙ্কা থাকে। তাই নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই শিশুরা যেন স্কুলে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। আমরা এ সদিচ্ছাকে স্বাগত জানাই। সেই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, স্কুল হবে ধনী-গরিব সবার। ধনী পরিবারের শিশুরা যেভাবে স্কুলে যেতে পারে, দরিদ্র পরিবারের শিশুর জন্যও যেন স্কুলে পড়ার সুযোগ থাকে, আমরা এমন ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার প্রত্যাশা করি। আজকের শিশু আগামী দিনে তার মেধা-মনন দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করবে। দারিদ্র্যের কারণে স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমবে। রাষ্ট্রের সব সুনাগরিক ভবিষ্যতে এমন সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেন। তাই শিশুদের বেড়ে ওঠার নির্মল পরিবেশ ও ‍শিক্ষার সুযোগ একান্তভাবে কাম্য।