কর্ণাটকের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যে ভালো ফল করতে যাচ্ছে বেশির ভাগ বুথ ফেরত জরিপ থেকেই এমন আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস আশাতীত রকম ভালো করেছে। সরকার গঠনের জন্য বিধান সভার ১১৩টি আসন দরকার হয়, কংগ্রেস একাই ১৩৫টি আসন পেয়ে গেছে। কাল দুপুর থেকেই কংগ্রেস শিবিরে লাড্ডু খাওয়া ও খাওয়ানো চলছে।
আর্যাবর্তের তুলনায় দাক্ষিণাত্যে বিজেপির দাপট এমনিতেই কম। একমাত্র কর্ণাটকেই তাদের সরকার ছিল। এবার এটাও গেল। কর্ণাটকে বিজেপির এ হারকে কেউ কেউ বিজেপির জন্য বিরাট বিপর্যয় মনে করছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তো এ হারকে বিজেপির ‘শেষের শুরু’ বলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে বিজেপিবিরোধীদের মধ্যে বেশ একটা চাঙ্গা ভাবও দেখা যাচ্ছে।
২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার কংগ্রেস ৫৫টি আসন বেশি পেয়েছে আর বিজেপি পেয়েছে ৩৮টি আসন কম। আর জনতা দল (সেকুলার) হারিয়েছে ১৮টি আসন। আসন এত কমলেও মোট প্রদত্ত ভোটের অংশ হিসেবে বিজেপি গতবারের (৩৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ) প্রায় সমান অংশ (৩৬ শতাংশ) ভোট পেয়েছে এবার। তবে কংগ্রেসের ভোটের অংশ ৩৮ দশমিক ১৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪২ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা গত ৩৪ বছরে কর্ণাটকে কোনো দলের পাওয়া সর্বোচ্চ। এছাড়া এবার কর্ণাটকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৭৩ দশমিক ১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। এবার জনতা দলের (সেকুলার) ভোট গতবারের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে এবার ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে। বলা বাহুল্য, জনতা দলের ভোট এবার কংগ্রেসের বাক্সে গেছে।
বিজেপি এবার নির্বাচনে কেন হারল এবং এ হারের প্রভাব আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনে কেমন হবে তা নিয়ে এরই মধ্যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ কর্ণাটকের এ পরাজয় নরেন্দ্র মোদির পরাজয় হিসেবে দেখছেন। যদিও কর্ণাটকের পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই তা নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলছেন এ হার আমাদের ব্যক্তিগত। মোদিজির বা আমাদের নীতির পরাজয় নয়। তবে জিতলে হয়তো তো এরাই একে বলতেন ‘দেখেছ মোদি ম্যাজিক!’
এবারের নির্বাচনে একটি মেরুকরণ হয়েছে এবং ভোট হয়েছে মূলত সরাসরি বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের। কারণ কংগ্রেস নিজেদের বিজেপির একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে এবং বিজেপিবিরোধী জনতা দলের (সেকুলার) ভোট তাদের দিকে টেনে নিয়েছে। এটি কংগ্রেসের একটি সাফল্য। এর জন্য রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো পদযাত্রার হয়তো ভূমিকা আছে, ভূমিকা আছে তাদের নির্বাচনী কৌশলের। কর্ণাটকের বর্ষীয়ান নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার কোনো প্রভাবও ছিল কি?
কংগ্রেস এ নির্বাচনে জিতলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিবারপিছু বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ, দরিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারী প্রতিটি পরিবারের জন্য বিনামূল্যে ১০ কেজি চাল, নারী পরিবারপ্রধান হলে তাকে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা, গ্র্যাজুয়েট তরুণ-তরুণীদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ডিপ্লোমাধারীদের মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিম্ন আয়ের লোকদের কংগ্রেসের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। নরেন্দ্র মোদির প্রবৃদ্ধিনির্ভর নয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে এসবকে সহযোগিতা নিরুৎসাহিত করা হয়।
এবারের নির্বাচনে বিজেপি রাজ্য সরকারের দুর্নীতি একটি বড় ইস্যু ছিল। কংগ্রেস কর্ণাটক সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ করে গেছে, সরকারকে ‘৪০ শতাংশের সরকার’ হিসেবে তুলে ধরেছে। রাজ্য সরকারের অনেক বড় নেতা দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। বিজেপি এসবের বিরুদ্ধে কোনো সন্তোষজনক জবাব ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।
ভারতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার বিষয়ে সচেতন অনেক
সম্প্রদায়ই ভোটের সময় একজোট হয়ে এক হাত দেখিয়ে দেয়। গত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা
নির্বাচনে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট টানার জন্য নির্বাচনের পূর্বে বাংলাদেশ সফরকালে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখানকার মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দিরে হাজির হয়েছিলেন!
কর্ণাটকের এবারের নির্বাচনে শিবভক্ত লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের ভোট বিজেপি থেকে
কংগ্রেসে গেছে। লিঙ্গায়েতরা কর্ণাটকের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ। বলা হয় যে মোট ৮০টি
আসনের ফলাফল লিঙ্গায়েতরা প্রভাবিত করতে পারে। এবার সেই ৮০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস
জিতেছে ৫৩টিতে আর বিজেপি জিতেছে ২০টিতে। গতবার ফলাফল ছিল অনেকটা বিপরীত। এ
লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় কোনো নীতিগত কারণে বিজেপি থেকে মুখ ফেরায়নি। তাদের সম্প্রদায়ের কোনো নেতা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জগদীশ শেট্টার এবং সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী সাভাদিকে
মনোনয়ন না দেয়া কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে তার চতুর্থ
মেয়াদে পদত্যাগে বাধ্য করানোর মতো ঘটনার জন্যই নাকি
তারা বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়েছে। একইভাবে একসময় রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস ছেড়ে তারা বিজেপির
দিকে ঝুঁকেছিল। তারা আবার বিজেপির দিকে ঝুঁকলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
আসলে ভোটের রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু থাকে না, থাকতে নেই। তাই দেখি আজ বিজেপির যে নেতা রামরাজ্যের স্বপ্নে বিভোর কাল তিনি ‘সেকুলার’ কংগ্রেসের মঞ্চে জোড় হাত করে ভোট মাগছেন। আজ যিনি তৃণমূল কাল তিনি দিব্যি গেরুয়াধারী, পরশু আবার হয়তো ঘরের ছেলে ঘরে ফিরছেন। ভোটের রাজনীতিতে ভোটে জেতাই মুখ্য। নীতিগত অবস্থান বলে কিছু এতে নেই। এ রাজনীতির মন্ত্র হলো ‘যখন যাহার তখন তাহার’। কর্ণাটকের এ নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ বিজেপির কয়েকজন নেতা দলত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং কংগ্রেস মহানন্দে এ হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কাছে টেনে নেয়! এদের অনেকেই এ নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিট নিয়ে জিতেছেন। এসব ঘটনা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দলগুলোর নীতিগত দেউলিয়াত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা যা-ই হোক, নির্বাচন ব্যবস্থা অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে জেতা-হারার বিষয়টা এখনো কাজ করছে বলে নির্বাচনের ব্যাপারে ভোটারদের আগ্রহও আছে। ভারতের ভোটের রাজনীতি চলে তার নিজস্ব নিয়মে। কালো টাকা, সন্ত্রাস, প্রতারণা, কেন্দ্র দখল, কেনা-বেচা এসব নিয়েই ভারতের ভোটের রাজনীতি। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর এখন কংগ্রেসের চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের বিধায়ককে আগলে রাখা। বিজেপি টোপ দিয়ে ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে বিজয়ী বিধায়কদের একত্রে রাজ্যের বাইরে, হয়তো তামিলনাড়ুতে রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। বিজেপি কী কৌশলে কর্ণাটকে ২০১৮ সালের গড়া কংগ্রেস-জেডিএস সরকারের পতন ঘটিয়েছিল সেটি কি কংগ্রেস এত দ্রুত ভুলতে পারে? আর কংগ্রেস নিজেও এসব কম করেনি।
ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে নানা কারণে আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হয়।
কারণ এ বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কৌশলগত অবস্থান আমাদের জীবনযাত্রা,
রাজনীতি ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করে। ভারতে প্রকৃত গণতন্ত্রের অবস্থা যা-ই হোক,
ভোটের রাজনীতির অবস্থা যেমন হোক, নির্বাচনে হারার পর
মোদি যখন কংগ্রেসকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান,
কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী যখন পুরো ফলাফল আসার আগেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে পরাজয়
বরণ করেন, তখন তা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পরিচয় দেয়। তবে এ সংস্কৃতি কতদিন টেকে সেটাই
দেখার কথা। আর আমাদের দেশে তো এরকম কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি
গড়ে ওঠার সুযোগই দেয়া হলো না।
কর্ণাটকের এ নির্বাচনের ফলাফল নানা কারণে
তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এ ফলাফলকে পদ্মফুল ম্লান হয়ে পড়ার আলামত মনে করলে ভুল হবে। কারণ
দেশ হিসেবে ভারত যেমন বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ তেমনি ভারতের ভোটের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও
বিচিত্র। নানা অঞ্চলে, জাত-পাতে, জাতি-সম্প্রদায়ে, নানা ধর্মবিশ্বাসে
বিভক্ত ভারতে ভোটের রাজনীতিও নানা জটিল সমীকরণ ধরে চলে। দক্ষিণের কর্ণাটকের ফলাফল
উত্তর বা উত্তর-পূর্ব ভারতের ভোটারদের কীভাবে নাড়া দেবে বা আদৌ নাড়া
দেবে কিনা সেটি সময় এলে দেখা যাবে। আপাতত উত্তর প্রদেশের পুরসভা নির্বাচনে যোগী
আদিত্যনাথের বিজেপির বিশাল জয়ের খবরই আসছে। অবশ্য কর্ণাটকের এবং কিছুদিন পূর্বের হিমাচল প্রদেশে জয়ের কারণে এখন কংগ্রেসকে নিয়ে
নতুন আশাবাদ তৈরি হবে এবং নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হবে। তবে আগামী বছরের লোকসভা
নির্বাচনে কার পালে কতটুকু হাওয়া লাগে তার আলামত স্পষ্ট হতে এখনো অনেক দেরি।
চৌধুরী মুফাদ আহমদ: প্রাবন্ধিক ও গবেষক










