আজকের শিশু-কিশোররাই গড়বে আগামীর দুনিয়া। নতুন দুনিয়ার নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সঠিক শিক্ষা জরুরি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শিশু-কিশোরের ভবিষ্যতের ভিত তৈরি করে দেয়। এক্ষেত্রে ভিত যদি দুর্বল কিংবা নড়বড়ে হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যৎও সেদিকে যাবে। গত কয়েক দশকে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে আমাদের শিক্ষাক্রম। পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে দ্রুত বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষা খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈকি।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সৃজনশীলের পর এবার আরেকটি নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে আগামী জানুয়ারিতে। নতুন এ শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক অথবা বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নেয়ার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। সেক্ষেত্রে সব শিক্ষার্থীকেই বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ ১০টি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। এত দিন মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের বিভাগভিত্তিক বিষয়ে অন্তত ৪০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি উচ্চতর গণিত, জীববিজ্ঞান, কৃষি শিক্ষা ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বাধ্যতামূলক ও একটিকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তবে বর্তমান শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোকে একীভূত করে ১০০ নম্বরের ‘বিজ্ঞান’ হিসেবে পড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিশেষায়িতের পরিবর্তে ‘একমুখী’ হিসেবে অভিহিত নতুন এ শিক্ষাক্রম প্রচলনের বিষয়টিতে আপত্তি তুলছেন শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের বড় একটি অংশ। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, নতুন এ শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞানের মতো বিশেষায়িত শিক্ষা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ‘একমুখী’ এ শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমুখী করে তোলার কথা বলা হলেও এর বিপরীত ঘটে যাওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। সমন্বিতভাবে সব পড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা সবকিছু সঠিকভাবে শেখার সময় পাবে না। বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষায় আরো অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারে তারা।
নতুন শিক্ষাক্রমে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ১০টি বিষয় থাকছে। সেগুলো হচ্ছে—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ধর্মশিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এছাড়া এত দিন মাধ্যমিকে পরীক্ষা হয়েছে নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যক্রম মিলিয়ে। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে শুধু দশম শ্রেণীর পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে। নতুন এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে উচ্চতর পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাসের আশঙ্কা করছেন অনেক শিক্ষাবিদ। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এতদিন ধরে নবম-দশম শ্রেণীতে পৃথকভাবে তুলনামূলক বড় পরিসরে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের মতো বিষয়গুলোয় পড়াশোনা করে আসছে। মাধ্যমিকের পর যত ওপরের স্তরে যাচ্ছে, বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হারও তত কমছে। এ অবস্থায় মাধ্যমিক পর্যায়েই বিজ্ঞান শিক্ষার পরিসর সংকুচিত করে আনলে পরে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো কমে আসবে।
স্কুল পর্যায়ে তিনটি শাখায় পাঠের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এতে মানবিক ও বাণিজ্য শাখার ছেলেমেয়েদের বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া। ১৩-১৪ বছর বয়সেই একজন মানুষের বাকি জীবনে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ালেখা বা ক্যারিয়ার করার সুযোগ চিরদিনের মতো বন্ধ করে দেয়া অনেক দিক দিয়েই মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। সেখানে যদিও বিভাগ ‘বেছে নেয়ার’ কথা বলা হতো, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে বেশির ভাগ স্কুলে একটা নির্দিষ্ট নম্বর বা সিজিপিএ পেলেই শুধু শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পায়। উল্টোদিকে তথাকথিত সবচেয়ে কম মেধাবীদের বাধ্য করা হয় মানবিক বিভাগে পড়তে। এ বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সংকট তৈরি করে তা বলার বাইরে।
নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, বিজ্ঞান নিয়ে যারা উচ্চতর পড়াশোনা করবে বা ক্যারিয়ার গড়বে তাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি হবে কি? নবম-দশম শ্রেণীতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান আলাদা তিনটি বিষয় ছিল, এখন তা যেহেতু থাকছে না; উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে যারা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়বে তারা ধাক্কা খাবে কিনা! বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্ব কমিয়ে দেয়ার যে গুরুতর অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে এ রূপরেখার বিরুদ্ধে, তার ভিত্তি এ প্রশ্নেই। অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না, কারণ মোটা দাগে দেখলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা আগে তিনটি বিষয় পড়ত, এখন সমন্বিত একটা বিজ্ঞান বিষয়ে ওই একই পরিমাণ বিষয়বস্তু কভার করবে কিনা সে প্রশ্ন তোলাই যায়। আবার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে প্রচলিত সিলেবাসেই যেখানে সবার খাবি খেতে হয়, নতুন শিক্ষাক্রমে এ ধাক্কা সামলানোর ব্যবস্থা কী হবে তা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নয়া শিক্ষাক্রম কার্যক্রমে প্রধান ভূমিকা থাকবে শিক্ষকদের। কিন্তু তাদের যথাযথভাবে তৈরি না করে শিক্ষাক্রম চালু হলে হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুসারে দ্রুত যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই অনুসারে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক রয়েছে কিনা তা দ্রুত যাচাই করা এবং সে অনুসারে শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন। নিয়োগের পাশাপাশি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণও দিতে হবে। না হলে নতুন শিক্ষাক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম থাকা সিঙ্গাপুরে গড়ে ১২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। মালয়েশিয়ায়ও একই চিত্র। থাইল্যান্ডে গড়ে ২৪ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন। এদিকে বাংলাদেশে মাধ্যমিকে এখন গড়ে ৩৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ অনুপাত আরো বেশি। সেখানে গড়ে ৫২ শিক্ষার্থীকে পড়ান একজন শিক্ষক। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একেকটি শ্রেণীকক্ষে ৬০-৭০ শিক্ষার্থী নিয়েও শিক্ষকদের ক্লাস করতে হয়। অথচ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে মাধ্যমিকে গড়ে প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষকের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। প্রাথমিকেও গড়ে ৩৮ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রাথমিকে এখনো শিক্ষকের ৩৮ হাজার পদ শূন্য।
যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল। তবে এ পরিবর্তনের আগে যথেষ্ট গবেষণা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষায় বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। দক্ষ শিক্ষক তৈরি ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন-ভাতায় ব্যয় বাড়ানো দরকার। শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ভুল ও সুখপাঠ্য পাঠ্যপুস্তকও তুলে দিতে হবে। আমাদের প্রথাগত পাঠদান প্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। পাঠদানের সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তি থেকে পলায়ন নয়, কীভাবে তাকে টুলস হিসেবে ব্যবহার করা যায় সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ তারাই হতে পারে আমাদের বিল গেটস, স্টিভ জবস, ইলোন মাস্ক কিংবা মার্ক জাকারবার্গ। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সুষ্ঠু বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত করার যে ব্যবস্থা ছিল তার প্রকোপ কিছুটা কমে আসা নতুন শিক্ষাক্রমের একটি প্রশংসনীয় দিক। তবে বিজ্ঞান শিক্ষা যথেষ্ট হচ্ছে কিনা তা দু-এক বছর পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। বর্তমান সময় বিবেচনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন জরুরি। এজন্য উচ্চতর পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে বর্তমান শিক্ষাক্রম ভূমিকা রাখে কিনা, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ করে তুলে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে। যুগের চাহিদা পূরণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে আমাদের।










