মার্ক স্যাক্সার ফ্রেডরিখ এবার্ট স্টিফটাংয়ের (এফইএস) এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক। জার্মানিভিত্তিক এ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটি গণতন্ত্রের প্রসার, আন্তঃদেশীয় সংযোগসহ নানা বিষয়ে কাজ করে চলেছে। ইন্দো-প্যাসিফিককে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ এ বিশ্লেষক সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন 

আপনার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন যে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও সামরিক দিক পরিবর্তিত হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিককেন্দ্রিক মোড় নিয়েছে যা কিনা ‘‌পিভট টু এশিয়া’র অংশ। ওয়াশিংটনের এ নীতিটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব রাখছে? 

এক যুগ আগে ওবামা প্রশাসন ‘‌পিভট টু এশিয়া’ কনসেপ্টটির সঙ্গে পরিচয় করায়। এ কনসেপ্টের সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসিতে রয়েছে শক্তিশালী দ্বিদলীয় ঐকমত্য। তাদের মতে, ‘‌বিশ্বে একমাত্র চীনই পারে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে।’ সেজন্য এ ঘরানার লোকজন মনে করে, কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের দিকে ফোকাস করা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট। সুতরাং এ ‘‌পিভট টু এশিয়া’ বিষয়টা সরল কোনো বিষয় নয়। এটা ওয়াশিংটনের সামগ্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সামরিক সক্ষমতা যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অভিমুখী এর মাধ্যমে তা ফুটে উঠেছে। 

দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে ছোট রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের কতটুকু নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব?

এ অঞ্চল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশই কোনো একটি বিশেষ পক্ষ নেয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে। তারা সবসময়ই চায়, পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে। এমন অবস্থানের পেছনে তাদের যুক্তি, দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক ব্লক তৈরি ও প্রযুক্তিগত দ্বি-বিভাজন সবাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলে দেয়। কিছু দেশ একটি ব্লকে ঢুকে পড়লে আরেকটি ব্লকের সুবিধা হারানোর ভয়ে দুই পক্ষের ভারসাম্য রেখে চলে। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কী টেকসই কোনো অবস্থা? কেননা এখানে কাঠামোগতভাবে রূপান্তর ঘটছে; যা দেশগুলোকে তাদের সর্বোচ্চ স্বার্থের জন্যই পক্ষ নিতে চাপ প্রয়োগ করবে। উপরোল্লিখিত প্রশ্নটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য ছোট দেশের নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব কিনা।

ভূরাজনীতির এ পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বেড়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে। আমরা এটাকে ‘‌দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ’ বলতেই পারি। এটি অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সব জায়গাতেই প্রভাব রাখবে। গত ৩০-৪০ বছর বিশ্বায়নের যে প্রভাব ছিল তার চেয়ে এটা ভিন্নতর। মুক্তবাজার নীতি ও সাশ্রয়ী শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বিশ্বায়নের ভিত। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে আমরা এখন ভূরাজনীতির প্রভাব দেখছি। যেমন ধরুন, কেউ যদি কোনো রফতানি বাজারে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তাহলে তা নির্ভর করবে ওই রাষ্ট্রটি তাকে বন্ধু হিসেবে গণ্য করে কিনা। এ সমীকরণের ভিত্তিতেই হয় সে রফতানির সুযোগ পাবে বা বঞ্চিত হবে। 

দুই পরাশক্তি যদি প্রযুক্তির জগৎকে বিভক্ত (ডি-কাপল) করার সিদ্ধান্ত নেয়; তাহলে তথ্যপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগের মতো অবকাঠামোর বেলায় প্রযুক্তিজগতের যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। সেই সঙ্গে যেসব পণ্য রফতানি করতে চায় প্রযুক্তিগত মানের দিক থেকে সেগুলোও জুতসই হতে হবে। এছাড়া যদি কোনো বিনিয়োগকারীকে অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য আহ্বান করা হয় সেক্ষেত্রেও যেকোনো একটি পক্ষ নিতে হবে। যদি কোনো দেশের সরকারি ঋণ (সভরেন ডেট) থাকে সেক্ষেত্রে তাদের বেইলআউটের প্রয়োজন হয়, এখানেও তাকে চাপ প্রয়োগ করা হবে। দিন শেষে যেকোনো একটি দেশের পক্ষ থেকে বেইলআউট নিতে হবে। সুতরাং এ ধরনের কাঠামোগত দিকগুলো বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন চাপে ফেলে দেবে।

পাশাপাশি এটি বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উন্নয়ন মডেলকে প্রভাবিত করবে। এশিয়ার উন্নয়ন মডেল মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে—সস্তা শ্রম, রফতানিনির্ভর উন্নয়ন ও শিল্পায়ন। করোনা মহামারীর ফলে আমরা অধিকতর সহনশীলতার দিকে ধাবিত হয়েছি। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দুর্বলতা কমানোর জন্যও রয়েছে পদক্ষেপ। এ দুই প্রভাবকই ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয়তা (অটোমেশন), রোবট-নির্ভরতা (রোবোটাইজেশন) গাণিতিক পরিভাষা (অ্যালগরিদম) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বৃদ্ধি করবে। যা কিনা আমাদের শ্রমের যে কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ ছিল সেটিতে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলবে। কারণ পুরনো শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের দেশের অভ্যন্তরে কিংবা কাছের দেশগুলোয় একই দামে পণ্য উৎপাদন করবে। ফলে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অন্য দেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার প্রয়োজন নেই। 

দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির জন্য যদি রফতানির প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে রফতানি বাজারে প্রবেশের জন্য লাগবে ‘‌রাজনৈতিক প্রবেশ-টিকেট’। সেক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পায়ন বাজারে প্রবেশ করা যাবে না।

সর্বশেষ, শিল্পায়ন করার অর্থ কোনো একটি দেশে প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া। কিন্তু দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের এ সময়টায় এসব বিষয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। সুতরাং, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এখন আর বাজার যুক্তিতে অনুকরণ করে না। বড় সংখ্যক মানুষ এখন চলমান ভূরাজনীতিতে অর্থনৈতিক অভিঘাতের সঙ্গে উন্নয়ন মডেলের খাপ খাওয়ানো নিয়ে ভাবছে। আরো সাধারণভাবে বললে নতুন এ ভূরাজনৈতিক বিশ্বের কৌশল কী হবে তা নিয়েই ভাবছে। 

ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সিদ্ধান্তগুলো ক্রমান্বয়ে ভূরাজনৈতিক বিবেচনার অংশ হবে। আপনার একটি লেখায় এমন মন্তব্য করেছেন। আপনার মতে এ ধরনের পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

এ অঞ্চলের উন্নয়ন মডেলের যথার্থতায় এটি প্রভাব ফেলবে। উন্নয়ন মডেল মূলত একটি দৃষ্টান্ত যা কোনো একটি দেশের দশকের পর দশক ধরে চলা উন্নয়নের পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ মূলত সস্তা শ্রমের তুলনামূলক সুবিধাকে ব্যবহার করেছে। ফলে তারা রফতানিকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হয়েছে। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের জন্য এটি ভালো কাজ করেছে, যার ফলে ওই দেশগুলো এলডিসি থেকে জি২০-এর অর্থনীতিতে পা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডসহ আরো কিছু দেশ। বাংলাদেশ কমবেশি এটিকেই অনুসরণ করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাইরের পরিস্থিতি যে পরিবেশে কোনো একটি দেশ কাজ করে সেটি খুব নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার পথটিও এখন সরে গেছে। এটিই এখন দুশ্চিন্তার বিষয়। 

ইন্দো-প্যাসিফিককেন্দ্রিক রাজনৈতিক জটিলতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে বলে কি আপনি মনে করেন? 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো একটি দেশের গণতন্ত্রায়ণ সে দেশের স্থানীয় জনগণের উপর নির্ভর করে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিঃশক্তির প্রভাবগুলোকে একটু বেশি করেই দেখানো হচ্ছে বলে আমার ধারণা। তবে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকবে যদি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ঐকমত্য থাকে। সেই জায়গাটি অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হলে পরাশক্তিগুলো সেই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করবে। সেজন্যই সব পক্ষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এগুলোয় সর্বব্যাপী আলোচনার প্রয়োজন।