একটি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে পাঁচ কোটিরও বেশি নাগরিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দেশের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার বেহাল দশার আকস্মিক প্রকাশে হতবাক নাগরিক সমাজ। খোদ সরকারের তরফে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করার পর দেশের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর অদক্ষতা ও অপরিণামদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, গুগলে সার্চ করলেই যে কেউ ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করে নাগরিকের নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দেখতে পারছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাম্প্রতিককালের অন্যতম বৃহৎ তথ্য ফাঁসের ঘটনা। এত বড় আকারের তথ্য ফাঁসের ফলে আমাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ল। এ অবস্থায় ডাটা সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি যাদের গাফিলতিতে এ ঘটনা ঘটল তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে আমাদের ডাটা সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশ, স্বয়ং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক সরকারি ওয়েবসাইটির কারিগরি ত্রুটির কারণে তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেন। এটি কোনো হ্যাকিংয়ের ঘটনা নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি, কারিগরি ত্রুটি ছিল। এ কারণেই তথ্যগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।’
সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ে এ দায় স্বীকার অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা। এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে দায় স্বীকারের পাশাপাশি নাগরিকদের সংবেদনশীল ডাটার সুরক্ষায় যথাবিহিত পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি।
অনেক ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা নিতেও জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্মনিবন্ধন নম্বর লাগে। অথচ তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটগুলোয় যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। প্রযুক্তিবিদরা আশঙ্কা করছেন, তথ্য ফাঁসের এ ঘটনার পর সাইবার অপরাধী কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র এসব তথ্য অপব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন করতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হতে পারে। ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) রেজিস্ট্রেশন, মেডিকেল রেজিস্ট্রেশন ও এফডিআর খোলা হতে পারে। এছাড়া সিম রেজিস্ট্রেশন করে সেগুলো দিয়ে অপরাধ করা হতে পারে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে গেলে ওই নিরীহ সাধারণ নাগরিক ফেঁসে যেতে পারেন। আরএনএ ও ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো ডাটা ফাঁস হলে তা উদ্বেগের ব্যাপার। নাগরিকদের ডিজিটাল আইডেন্টিটিগুলো ফাঁস হলে অবৈধ লেনদেনেরও আশঙ্কা থাকে। এখন নাগরিকরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন সেজন্য এনআইডি নম্বর পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের বরাতে গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভার সুরক্ষিত রয়েছে। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে এনআইডি ডাটাবেজের সিকিউরিটি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এনআইডি মহাপরিচালক একেএম হুমায়ূন কবীর দাবি করেন, ইসির সার্ভারের তথ্যাবলির ওপর কোনো হুমকি আসেনি। আমাদের সার্ভার থেকে কোনো তথ্য যায়নি। তার পরও এ বিষয়ে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি পেলে, চুক্তিপত্র বরখেলাপ হলে তা বাতিল করব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর দেশের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা এটা। তবে দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশের কোনো সংশ্লিষ্ট সংস্থা এটা ধরতে পারেনি; এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রযুক্তিবিদ বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের নাগাল পাননি। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি উন্মুক্ত অবস্থায় থাকার এ খবর প্রথম দিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক মার্কিন পোর্টাল টেকক্রাঞ্চ। টেকক্রাঞ্চ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশীদের সম্পূর্ণ নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য এখন উন্মুক্ত হয়ে আছে ইন্টারনেটে। সংবাদমাধ্যমে আরো প্রকাশ, আনুমানিক প্রায় পাঁচ কোটি বাংলাদেশী নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত অবস্থায় রক্ষিত ছিল সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটটিতে।
দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটক্র্যাক সাইবার সিকিউরিটির গবেষক ভিক্টর মার্কোপোলোস গত ২৭ জুন সরকারি ‘ডটগভডটবিডি’ ডোমেইনের এক ওয়েবসাইটে প্রথম বাংলাদেশী নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় পান। মার্কোপোলোস গুগলে এসকিউএল ত্রুটি নিয়ে তথ্য খুঁজছিলেন; সে সময় ফলাফল হিসেবে তার সামনে আসে বাংলাদেশীদের এসব তথ্য।
আগারগাঁওয়ে ‘বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি অ্যাওয়ারনেস অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘যে ওয়েবসাইটের তথ্যগুলো পাবলিক হয়ে গেছে, সেখানে ন্যূনতম যে সিকিউরিটি সার্টিফিকেট নেয়ার কথা ছিল সেটাও ছিল না এবং যে এপিআই ক্রিয়েট করা হয়েছে সেখান থেকে ইচ্ছা করলেই কেউ তথ্যগুলো দেখতে পারছে।’
অর্থাৎ ডাটাগুলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে উন্মুক্ত ছিল, যা চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। উন্নত বিশ্বে ডাটা প্রাইভেসি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ফেসবুক কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার স্ক্যান্ডালের পর। অথচ আমাদের দেশে সরকারি ওয়েবসাইটগুলোয় প্রাইভেসি এখনো দুষ্প্রাপ্য। ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে এ নিদারুণ অবহেলা অতি দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয়। কিছুদিন আগেও Hypertext Transfer Protocol Secure (HTTPS) ব্যবহার করা হতো না। এমনকি অনেক সরকারি ওয়েবসাইটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, বাবা-মার নাম ইত্যাদি একান্ত ব্যক্তিগত তথ্যাদিও উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বড় আকারের এ তথ্য ফাঁস তদন্তে বিশেষ কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে আইসিটি ডিভিশন। তাদের কাছে ঘটনার বৃত্তান্ত জানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানোর সুপারিশও থাকবে বলে আশা করি। অগ্রসর ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি এ ধরনের হুমকি মোকাবেলায় দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করতে হবে। সরকারি ওয়েবসাইট ও সার্ভারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত অডিট বা নিরীক্ষা চালাতে হবে। ডাটা ফাঁসের ঘটনা সরকারের সব বিভাগের জন্য সতর্কবাণী হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।










