বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের যে দাবি থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত সেই দাবির ব্যাপকতা এত বেশি ছিল যে সমাজের সব শ্রেণী, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে এমনকি রাষ্ট্রের কোনো কোনো নিরাপত্তা সংস্থাও এ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এটাকে বিপ্লবও বলা যেতে পারে। কারণ এটা একটা ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক আদর্শ ও ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। এটা স্পষ্টতই আবার একটা গণ-অভ্যুত্থান, কারণ এর মাধ্যমে একটা অবৈধ সরকারের পতন হয়েছে। তাই শিক্ষার্থী-জনতার এ আন্দোলনকে বিপ্লব ও গণ-অভ্যুত্থান উভয়ই বলা যেতে পারে। কিন্তু এ বিপ্লব ও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, শপথ গঠন, সরকারের চরিত্র এবং সরকারের পুনর্গঠন ও কর্মকাণ্ড বিপ্লবী সরকারের মতো না হওয়ায় অনেকে এ আন্দোলনকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায় না।
যা হোক বিপ্লবী নাগরিকরা এ বিপ্লব-পূর্ববর্তী শাসন ব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদ বলে ডাকছেন। বিজয়ী রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা ও জননন্দিত পণ্ডিত সমাজের অনেকেও এ বিষয়ে একমত পোষণ করছেন যে এটা ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লব। তাহলে প্রশ্ন আসে, এ ফ্যাসিবাদের চরিত্র কী? ফ্যাসিবাদের কখন পতন হয় বা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কেন বিপ্লব হয়? ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের বিকাশ কীভাবে রুদ্ধ করা যায়?
ফ্যাসিবাদের আলোচনার আগে নাগরিক চুক্তির বিষয়টি খানিকটা স্পষ্ট করি। রাজনৈতিক ব্যবস্থার নানা শ্রেণীবিভাগ আছে। অ্যারিস্টোটল থেকে শুরু করে বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজনৈতিক ব্যবস্থার নানা ধরন আলোচনায় এনেছেন। মোটা দাগে আমরা দুটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই চিনি। একটি হলো গণতন্ত্র, যার প্রতি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক সমাজের একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এবং অনেক সমাজে এখনো আছে। তবে অ্যারিস্টোটলের মতে, গণতন্ত্র কিন্তু সরকারের আদর্শ ধরন নয়, বরং বিকৃত ধরন। তিনি রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও মধ্যতন্ত্রকে ভালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যে নাগরিক চুক্তির কথা বলা হচ্ছ এখানে, এ চুক্তির প্রধান সিদ্ধান্তই হবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে মীমাংসা। যথার্থভাবে এ মীমাংসা করতে ব্যর্থ হলে অন্যান্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আর কাজ করবে না। তৃতীয় বিশ্বের কাজ হলো তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজের আকাঙ্ক্ষায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপ নির্ণয়ে মীমাংসা করে, যেখানে রাজনৈতিক চিন্তার আলোকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল। ফলে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয় সেটা সমাজের অন্যান্য উপব্যবস্থাকে তৈরি করে না; বরং অন্যান্য উপব্যবস্থাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র তৈরি করে। তাই এটি গণতান্ত্রিক আকার ধারণ করে না, স্বৈরাচারী আকার নেয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণের এ লড়াইয়ে অসংখ্য অরাজনৈতিক, জনপ্রিয়, জনবুদ্ধিজীবীসহ সব রাজনৈতিক কর্মীর এই যে অংশগ্রহণ তা একসময় অ্যারিস্টোটলের বিকৃত ফরমে অভিজাততন্ত্রের সিন্ডিকেট বা স্বৈরতন্ত্রের আমিত্ব ফিরিয়ে আনে। এই দুই ব্যবস্থা অভিজাততন্ত্রের সিন্ডিকেট বা স্বৈরাচারের আমিত্বে পরিপক্ব হলে অথবা একে অন্যের মধ্যে রূপান্তরিত হলে রাজপথ রক্তাক্ত হয়। আর নাগরিকের রক্তে রাজপথ ভেসে গেলে এ ব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় রক্তাক্ত রাজপথ থেকে নাগরিকরা নতুন সমাজ নির্মাণ করে, আকাঙ্ক্ষা করে গণতান্ত্রিক সমাজের। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় এ আকাঙ্ক্ষাই লোভে রূপান্তরিত হয়। কারণ আন্দোলনকারীদের কারো কারো মধ্যে পরিবর্তনের মানসে রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণে ‘সবার স্বার্থে সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের পরিবর্তে’ বিপ্লব-পরবর্তী পরিবেশ থেকে ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীস্বার্থ ও ধান্দা চরিতার্থ করার লক্ষ্য চলে আসে। ফলে বিপ্লব হয়, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র আগের মতোই বৈষম্যপূর্ণ থেকে যায়। এতে বারবার রাজপথ রক্তাক্ত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মূল মালিক তথা নাগরিকদের মুক্তি মেলে না।
ব্যক্তিক ‘আমিত্ব’ ও ক্ষুদ্র স্বার্থ গোষ্ঠীর ‘আমরাত্ব’ যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় কেন্দ্র থেকে সব স্তরে তৈরি হয় তখনই ফ্যাসিবাদ দেখা যায়। সব রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হতে পারে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে ক্ষমতায় আসা দলটি প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে, সব সাংবিধানিক পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোয় নিজের আজ্ঞাবহ অনেক লোক দ্বারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে একটি অনির্বাচিত সরকার তৈরি করে ২০১৪ সালে। পরবর্তী নির্বাচনে কোনো কোনো নিরাপত্তা সংস্থার সহযোগিতায় এবং ভুঁইফোঁড় মিডিয়াগুলোর অপেশাদারত্ব ও সুবিধাবাদী চরিত্রকে কাজে লাগিয়ে আগের রাতের নির্বাচনী প্রহসন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী রাজনীতির স্বাদ থেকে বাইরে রাখে এবং নাগরিকদের ভোট প্রদানের মাধ্যমে তার নিজের রাষ্ট্রীয় মালিকানার দাবি ও নাগরিক পরিচয়ের দাবি থেকে বঞ্চিত করে এমন ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’-এর রাষ্ট্র তৈরি করে, যা চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদে রূপান্তরিত হয়। ২০১৮ সালের পর আমিত্ব ও আমরাত্ব রূপান্তরিত হয়ে বিলীন হয়ে যায় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে এবং ২০২৪-এর নির্বাচনের আগেই ফ্যাসিবাদ এবং ২০২৪-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়।
রাষ্ট্র নির্মাণের তিনটি রাজনৈতিক চুক্তি বহুল আলোচিত, যেগুলো নির্মাণ করেছেন যথাক্রমে হবস, লক ও রুশো। হবসের চুক্তিতে রাজা চূড়ান্ত সার্বভৌম এবং তার কথাই আইন। লক দুটি চুক্তির কথা বলেছেন। একটি চুক্তি রাজার সঙ্গে নাগরিকের রাষ্ট্র গঠনবিষয়ক। অন্য চুক্তিতে রাজার ক্ষমতায় থাকা নির্ভর করছে নাগরিকের সম্মতির ওপর। রুশো নাগরিক সমাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন চুক্তিতে। এ চুক্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সাধারণ ইচ্ছায় তথা সব নাগরিকের কল্যাণে। এ কল্যাণ করতে ব্যর্থ হলেই চুক্তি ভেঙে যাবে। এ তিনটি চুক্তি মধ্য-সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মধ্য-অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিকাশ লাভ করলেও রাষ্ট্র নির্মাণের এবং রাজার সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নির্দেশনায় এগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অনেক বিকাশ হয়েছে। নাগরিকদের দমিয়ে রাখার জন্য শাসকের অন্যায্য চুক্তি নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে যেমন কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র নির্মাণের এক উৎসব চলছে; একইভাবে ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা, পশ্চিম ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রক্রিয়াও মজবুত হচ্ছে এবং আরো এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি লাতিন আমেরিকায় পিনোশের চিলির মতো দেশে এবং আফ্রিকায় মরিশাসের মতো দেশ এখন নাগরিক অধিকারকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং চুক্তিতে আজকাল শাসককেই নাগরিকের অধিকার রক্ষায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। চিলি ও মরিশাস গণতন্ত্র ইনডেক্স ২০২৩-এর তালিকায় পূর্ণ গণতন্ত্রের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চুক্তিতে বর্ণিত নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হলে রাজা আবার নাগরিক হয়ে যান, এমনকি কখনো কখনো রাজার কঠিন বিচার হয়।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কোয়ার্টারে বৈশ্বিকভাবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট ও কর্তৃত্ববাদী সমাজ বিকাশের এ সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষার্থী-জনতার যে রক্তাক্ত বিপ্লব হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে যে রাষ্ট্র নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সে রাষ্ট্রে নাগরিক চুক্তি হবে অত্যাধুনিক। এ চুক্তিতে নাগরিক ও শাসনকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে রাষ্ট্র গঠন ও এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার, নৃতাত্ত্বিক ও জেন্ডার বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ হবে। আজকে শিক্ষার্থী-জনতার বিপ্লবের সুবিধা হলো বৈষম্যবিরোধী সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় পাঠ তারা আগের বিপ্লবগুলো তথা রুশ, ফ্রেঞ্চ, আমেরিকান বিপ্লবগুলো থেকে নিতে পারবে। বিশেষ করে ফ্রেঞ্চ বিপ্লব থেকে তারা নিজেদের পরিবেশের উপযোগী (আর্থসামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিষয়কে মাথায় রেখে) মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।
শত শত মানুষের শহীদী রক্ত এবং হাজার হাজার ক্ষত-বিক্ষত আহত মানুষের আহাজারির ওপর যে রক্তাক্ত রাজপথে আছি সেই রাজপথ থেকে একটা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য সব বাংলাদেশী নাগরিকের মধ্যে বোঝাপড়ার প্রমাণস্বরূপ একটা নাগরিক চুক্তি চাই। এ চুক্তির স্বরূপ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশীদের মনন থেকে, কিন্তু স্থানীয় ও বৈশ্বিক পূর্ববর্তী নাগরিক চুক্তিগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে এ চুক্তিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যেহেতু রাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত করে রাজনৈতিক দল, সেহেতু রাজনৈতিক দল হলো এর অন্যতম ক্যাটালিস্ট। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যেহেতু বিপ্লব ২০২৪ হয়েছে সেহেতু এ বোঝাপড়ায় শিক্ষার্থীরা অন্যতম নির্ধারক। তাছাড়া অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক কুশীলব এ বোঝাপড়ার খসড়া উপস্থাপন করবে। সরকার এ তিন পক্ষকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করে ব্যাপক ও বৃহত্তর বোঝাপড়া তৈরি করবে এবং এ বৃহত্তর বোঝাপড়ার চূড়ান্ত অবস্থায় তৈরি হবে নাগরিক চুক্তি। মনে রাখতে হবে ফ্যাসিবাদ মনস্তত্ত্বে রয়ে যায়। ন্যূনতম স্তরে নাগরিক চুক্তি না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে (মিসর ও তিউনিসিয়া) অথবা মারাত্মক রাজনৈতিক ও সামাজিক নৈরাজ্য দেখা দেয় যেমন লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলায় দেখা গেছে। ভিয়েতনাম ও কিউবায় এক ধরনের ন্যূনতম নাগরিক চুক্তি হওয়ায় জাতি ও রাষ্ট্র নিরাপদ হয়েছে এবং আমেরিকা, ফ্রান্স বা ব্রিটেনের মতো উঁচু মাত্রার নাগরিক চুক্তি হলে রাষ্ট্র টেকসই হয়। তাই এখন বাংলাদেশের শাসকদের সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসতে পারে।
কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










