বর্তমান বিশ্ব হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক। মানসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত ও কার্যকর জ্ঞান অর্জন করতে হয়। যারা যত বেশি প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তারাই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে। প্রযুক্তির বিকাশ ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গবেষণার বিকল্প নেই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য অংশই এ খাতে ব্যয় করে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা হতাশাজনক। গবেষণায় বরাদ্দ দেয়া হয় সামান্য, যতটুকু বরাদ্দ দেয়া হয় সেটিও যথাযথ ব্যবহার হয় না। গতকাল প্রকাশিত বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের গবেষণা খাতে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশ ব্যয় করছে মাত্র দশমিক ৩০ শতাংশ। টেকসই ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্যথায় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। বাধাগ্রস্ত হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে বেকার রয়েছেন ২৫ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৩ সাল শেষে গড় বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৭০ হাজার। এর মানে, গত বছরের তুলনায় এখন দেশে বেকারের সংখ্যা বেশি। যদিও দেশের বাস্তবতায় বেকারের সংখ্যা আরো বেশি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কাঙ্ক্ষিত মানের গবেষণা কার্যক্রম না থাকায় দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠছে না। ফলে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি ও মানসম্পন্ন গবেষণা নিশ্চিতে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।
খাতভিত্তিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কৃষি গবেষণায় তুলনামূলক অর্থ মিললেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নেই। অথচ বিশ্বে উন্নত দেশগুলো গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এত তারা এক্ষেত্রে আশানুরূপ ফলও পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে গবেষণা খাতের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে গবেষণা খাতকে অগ্রাধিকার কম দেয়া হয়। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, কয়েক বছর ধরে কৃষিতে গবেষণায় যেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তেমনি এ খাতে উন্নয়নও ঘটছে। তাই কৃষির মতো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানের আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি। যার কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা নিতে বিদেশে যেতে হচ্ছে। এ খাতে যদি প্রকৃত উন্নতি ঘটাতে হয় তাহলে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আর গবেষণার মাধ্যমেই স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাকে চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। একইভাবে শিক্ষাসহ অন্য খাতের উন্নয়নে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
উচ্চ শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণা ছাড়া এমন পরিবেশ সম্ভব নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কাঙ্ক্ষিত মানের গবেষণার জন্য সরকারকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাধ্য করতে হবে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করতে, যাতে মেধাবীরা গবেষণার জন্য বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা শেষে ফের দেশে এসে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী হন। এজন্য প্রয়োজন তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে রাখার উদ্যোগ নেয়া। সরকারকে গবেষণার বিষয়ে কঠোর নজরদারি করতে হবে, যাতে কেউ গবেষণা কার্যক্রমে উদাসীন থাকার অবকাশ না পায়। তাহলেই দেশের উচ্চ শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো গবেষণা। কিন্তু দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় খুব একটা মন নেই। অথচ উচ্চ শিক্ষার মান বাড়াতে গবেষণা অন্যতম পূর্বশর্ত। উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণার মতো অত্যাবশ্যকীয় খাতে এমন অর্থ ব্যয় করা হয়, যা উল্লেখ করার মতো নয়। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকাওয়াস্তে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে। এগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই নামকাওয়াস্তে গবেষণা খাতে খরচ দেখায়। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান গবেষণা নিয়ে চিন্তা করে না। ফলে দেশের উচ্চ শিক্ষার মান এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
হতাশাজনক বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা, অথচ অন্তত ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে ১ টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকাওয়াস্তে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল। এছাড়া নতুন কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ওই বছর গবেষণায় বরাদ্দ ছিল না। এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে।
গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া না হলে ভালো ও উঁচু মানের গবেষণা করা সম্ভব নয়। এখান-ওখান থেকে নিয়ে গবেষণা করা যায়। কিন্তু সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘অ্যাপ্লাইড রিসার্চ’ (ব্যবহারিক গবেষণা) হয়। মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বরাদ্দ হওয়া দরকার। পাশাপাশি শিক্ষকরা যাতে গবেষণায় উৎসাহী ও নিয়োজিত হন সে ধরনের প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা যেতে পারে।
যে দেশে যত বেশি গবেষণার জন্য আর্থিক প্রণোদনাসহ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, সে দেশ তত বেশি সমৃদ্ধ। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ইত্যাদি দেশে পুনঃপুন গবেষণা ছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোট বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে যেসব দেশে বার্ষিক ৫০ মিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থ ব্যয় করা হয়, সে রকম ৯০টি দেশের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান থাকলেও বাংলাদেশ বরাবরের মতোই অনুপস্থিত। বাংলাদেশে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষার বাজেট মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ ও জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে অন্তত বাজেটের ২৫ শতাংশ ও জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। সুতরাং গবেষণার প্রণোদনা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থিক প্রণোদনা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন বা জাপানের মতো বরাদ্দ দেয়া সম্ভব না হলেও যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়, সেটিও যদি সঠিক পথে এবং উপযুক্ত গবেষকদের দ্বারা সম্পন্ন করা হতো তাহলে গবেষণায় বাংলাদেশ এতটা পিছিয়ে পড়ত না। তাই আর্থিক প্রণোদনা অপেক্ষা সঠিক ব্যক্তির কাছে গবেষণার ভার যাচ্ছে কিনা সেটাই বড় সমস্যা। এ দিকটির ওপর অধিক মনোযোগ অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো অধ্যাপক-গবেষক রয়েছেন, যারা আর্থিক প্রণোদনা, মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা বা স্বাধীনতার অভাবে গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
বর্তমানে সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেট করছে বাংলাদেশ। দেশ যে সমৃদ্ধ হয়েছে এটা তার বড় প্রমাণ। এমন অর্থনীতির দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাজেটের বাইরে কেবল গবেষণায় বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা সম্ভব। টেকসই ও স্থায়ী (ভায়াবল) গবেষণার জন্য বাংলাদেশ অবশ্যই আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখতে সক্ষম। অর্থনীতির পাশাপাশি মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টিতেও বাংলাদেশকে সমৃদ্ধিশালী হতে হবে। গবেষণায় আলাদা বাজেট দেয়া হলে এর ‘রিটার্ন’ (ইতিবাচক ফল) দেশ অবশ্যই পাবে। তাছাড়া বৈশ্বিকভাবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (এসডিজি) নিয়ে এগোচ্ছে দেশ। টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত দেশের আসনে উন্নীত হতে গবেষণায় বরাদ্দের বিকল্প নেই।
গবেষণা হলো জ্ঞান সৃজনের প্রধান উপায়। তাছাড়া যেকোনো দেশের সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক জনজীবনের চাকা সচল রাখতে হলে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও গবেষণার বিকল্প নেই। এ কাজে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই নিতে হয়। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ শুধু একটা উন্নয়নশীল দেশ নয়, এর অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতিগুলোর একটি; স্বল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন করে ২০৪১ সালের মধ্যে একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া তার লক্ষ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে যে উন্নত জ্ঞান, প্রযুক্তি, সর্বোপরি জনবল প্রয়োজন তার জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় প্রচুর নিজস্ব গবেষণা দরকার। বলাবাহুল্য, বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই জ্ঞান-প্রযুক্তি ও জনবল সৃষ্টি করতে না পারলে বাংলাদেশকে অন্য অনেক দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ফাঁদে আটকে থাকতে হবে। এখনই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তৎপর হতে হবে। তাদের একদিকে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর জনদাবির প্রতি দ্রুত সাড়া দিতে হবে, আরেকদিকে এ অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।










