সমুদ্র অর্থনীতিকে আমরা নান্দনিকভাবে বলে থাকি ‘সুনীল অর্থনীতি’। সমুদ্রজলের নীল রঙের কারণে এ নামটিই যায়। কিন্তু এ নান্দনিকতার আড়ালে বাস্তবতা বড়ই হতাশাজনক। ২০১২ সালে বাংলাদেশের সামনে সমুদ্রের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচন হয়, যখন আমরা মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে সাকল্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা লাভ করি। তাতে আমাদের মোট সমুদ্রসীমার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার, যা আগে ছিল ২ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার। হিসাব কষলে দেখা যায় এটি বাংলাদেশের প্রায় সমান, অর্থাৎ মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২৬ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটার ছোট। কিন্তু প্রায় এক যুগ অতিক্রান্ত হলেও গভীর সমুদ্র থেকে অর্জিত কোনো আয় আমাদের জাতীয় আয়ে এখনো যুক্ত হয়নি।
এ অচলাবস্থার হেতু তো অনেক। প্রথমত, আমরা জানি না আমাদের সমুদ্রের নিচে কী আছে, অর্থাৎ আমার স্ট্রেংথ বা শক্তি কত। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা—ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক। আর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রয়োজন গবেষণা জাহাজ বা রিসার্চ ভেসেল। সেটি ক্রয়/সংগ্রহ করার জন্য ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে ২০১৭ সালে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি সরকারি অনুমোদন লাভ করেনি। এ বিষয়ে তখন অনেকেই মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভেয়ারদের দিকে আঙুল তুলেছিলেন, অর্থাৎ তারাই ছিল প্রধান বাধা। তখন সরকারকে বোঝানো হয়েছিল এত বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করে কোনো রিটার্ন আসবে না। আমাদের প্রশ্ন, গবেষণার রিটার্ন বা ফলাফল কি একদিনে বা রাতারাতি অথবা এক প্রজন্মে আশা করার বিষয়? নিশ্চয় নয়। গবেষণায় দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের ফলে আমাদের কৃষির অভাবনীয় উন্নয়ন, সেটি কি একদিনে অর্জন হয়েছিল?
কৃষিতে যথোপযুক্ত গবেষণার কারণে এখন আমরা সারা বছর সবজি ও ফল খাই বাহারি, ফুলের ব্যবসায় করছি শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি, এক ফসলি জমিকে করেছি তিন/চার ফসলি, সক্ষম হয়েছি লবণাক্ত জলে ফসল ফলাতে। গবাদি প্রাণী ও মৎস্য বিষয়ে জগৎজোড়া সুনাম অর্জনের প্রসঙ্গটি না-ই টানলাম। এ-যাবৎকালে এসব ক্ষেত্রে গবেষণার সম্মিলিত ব্যয় নিশ্চয় একটি গবেষণা-জাহাজ ক্রয়ের ব্যয়ের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। তবু আমরা এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যয়ের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা দেখিয়েছি এবং ক্রমাগত অবহেলা দেখিয়ে চলেছি গভীর সমুদ্র নামক আমাদের বিশাল আকৃতির তৃতীয় প্রতিবেশীটির প্রতি।
২০১৭ সালে জাতিসংঘের সমুদ্র সম্মেলনে যোগদানের সময় এক মালদ্বীপ প্রতিনিধির মুখে পিলে চমকানো একটি তথ্য পেয়েছিলাম। ছোট্ট একটি দ্বীপ হলেও মালদ্বীপ প্রতিদিন সাগর থেকে ১০০ টন টুনা মাছ ধরছে। এ সক্ষমতার বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছিলাম যে তাদের প্রত্যেক পরিবারেই রয়েছে একটি করে মাছ ধরার নৌকো, সর্বোপরি তাদের রয়েছে লং লাইনার, পার্স সেইনিং, অন্যান্য পদ্ধতিতে মাছ ধরার কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা। আমরা যদি এখনই কাজটি শুরু করতে পারি, তাহলে এ ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারি, কালের গর্ভে ১০টি বছর তো হারিয়েই গেল।
আমাদের আধুনিক সমুদ্র ভাবনা কাজী গুরুর মস্তিষ্ক দিয়ে সেই কবে শুরু হলেও এখন কি আমরা ভাবছি—এত বড় সমুদ্র প্রাপ্তির জন্য আমরা আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না? জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ৯৭ বছর পূর্বে (৩১ জুলাই ১৯২৬) কালজয়ী ‘সিন্ধু’ কবিতাটি লিখেছিলেন চট্টগ্রামে বসে। এতে উদ্ধৃত হয়েছে, ‘মন্থন-মন্দার দিয়া দস্যু সুরাসুর/মথিয়া লুণ্ঠিয়া গেছে তব রত্নপুর (তৃতীয় তরঙ্গ)।’ পঙ্ক্তিটি পুরাণাশ্রয়ী হলেও সমুদ্র যে রত্নভাণ্ডারের আধার এটি তার ইঙ্গিত দেয়। এ রত্নভাণ্ডার হচ্ছে সমুদ্র তলদেশের খনিজ সম্পদ (যেমন- জিরকন, রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট ইত্যাদি)। নজরুলের কবিতাটি আমাদের ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে থাকারই ইঙ্গিত দিয়ে যায়। এতে তিনি যে ‘সাবমেরিন’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন সে সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ ‘নবযাত্রা’, ‘জয়যাত্রা’ অর্জন করেছি এ কবিতা রচনার ৯১ বছর পর। তবে কবিতাটি একদিক দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। আর তিন বছর পরই আমরা উদযাপন করতে পারব এটি রচনার শতবর্ষ। আমরা বর্ষ, জয়ন্তী এসব উদযাপনেই তো আগ্রহী ও সিদ্ধহস্ত।
ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির জন্য সরকার এখন পর্যন্ত কোনো বাজেট বরাদ্দ রাখেনি। এ খাতে কেউ বিনিয়োগ করতেও আগ্রহী হয়নি। এসব কারণে এবং উচ্চতর কারিগরি জ্ঞানের অভাবে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশী সংস্থাগুলোর ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয়। এ পদ্ধতিকে বলা হয় পিএসসি বা প্রফিট শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট। বড় আশা করে আমরা কোরিয়ার পসকো-দাইওর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম ২০১৭ সালে। কয়েক বছর এ জরিপ অনুসন্ধান চলছিল, লব্ধ উপাত্তের ধরন দেখে আমরা আশান্বিতও হয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে তারা চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করতে চায়, পেট্রোবাংলা তথা সরকার সম্মত না হওয়ায় তারা চলে যায়, পুনরায় আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হই। বিদেশীদের সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত যে তারা চায় না আমরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠি।
একদিকে আমাদের শস্য ও ফলফলাদির বহুমুখীকরণ হয়েছে, আবার অন্যদিকে কমে গেছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। তাই আমাদের খাদ্যভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে আসছে বলে বিকল্প খাদ্যের অনুসন্ধান করা ছাড়া কোনো উপায়ই নেই। এ অনুসন্ধানে সমুদ্রই অকৃপণ হস্তে তার ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে। সংস্কারবশত আমরা যে এতদিন সিফুড ব্যবহার করিনি, সে মানসিক অবস্থান থেকে এখন সরে আসতেই হবে। ফিল্ডওয়ার্কের একটি অভিজ্ঞতার উল্লেখ না করে পারছি না। সিউইড বা সামুদ্রিক শৈবাল নামে ঔষধি গুণসম্পন্ন যে সমুদ্রসম্পদটি পরিচিত, সেটি কাঁচাই খাওয়ার যোগ্য (ওয়েস্টারও তারা কাঁচা খেয়ে দেখিয়েছিলেন)। এরপর কুতুবদিয়া সদরে নিয়ে সিউইড রান্না করে খেয়ে দেখেছি এর স্বাদের কোনো তুলনাই নেই। কিন্তু এটির প্রসারতার জন্য সব উদ্যোগই ব্যক্তিগত। তবে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট এ সম্পদের ওপর বর্তমানে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু সামুদ্রিক শৈবালের ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন। সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণাকর্ম চালালেও তাদের কাছে সমুদ্র দূষণের কোনো ডাটা বা উপাত্ত নেই। এটি থাকা জরুরি, কারণ সমুদ্র মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হয়ে গেলে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদসম্পদ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
সমুদ্র জয়ের সময় সরকারকে ইন্সট্রুমেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের পাশাপাশি বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর। পরবর্তী সময়ে (২০১৭) অর্থনৈতিক বিষয়াদির সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে সরকার সৃষ্টি করেছিল ব্লু-ইকোনমি সেল। কিন্তু সেই সেল ও মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের মধ্যে কতটা সমন্বয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা ভেবে দেখা দরকার।
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির এ করুণ দশায় নিম্নোক্ত উদ্যোগগুলো জাতীয় স্বার্থে গ্রহণ করা জরুরি:
১. আমাদের কী পরিমাণ সামুদ্রিক সম্পদ আছে তা অনতিবিলম্বে নিরূপণ করা; ২. রাখাইন বেসিনের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করে মিয়ানমার যদি তার সুনীল অর্থনীতির ফল ভোগ করতে পারে, তবে এর প্রতিবেশী বেঙ্গল বেসিন থেকে বাংলাদেশও সম্পদ আহরণ করতে সক্ষম হবে, এ হাইপোথিসিসকে সামনে রেখে এগিয়ে চলা; ৩. বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক দূষণের বিষয়ে ব্যাপক হাহাকার লক্ষ করা যাচ্ছে বিধায় এ-সংক্রান্ত, বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ রোধে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা; ৪. ব্লু-ইকোনমি একটি হলিস্টিক ও মাল্টি সেক্টরাল অ্যাপ্রোচ বলে সব সেক্টর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে ঐক্যতান ও সমন্বয় বিধান; ৫. দেশী/বিদেশী সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা; ৬. স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়ে এ-সংক্রান্ত পৃথক মন্ত্রণালয় বা বিভাগ প্রতিষ্ঠা; ৭. জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্লু-ইকোনমি সেলকে একটি রেগুলেটরি বডিতে উন্নীত করা।
বাংলাদেশে সুনীল অর্থনীতির উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমরা যথেষ্ট সময় ব্যয় করে ফেলেছি। এ ক্ষতি পোষানোর জন্য আমাদের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি অবলম্বন করার কথা সক্রিয়ভাবেই ভাবতে হবে। তুলনীয় না হলেও ‘সম্মুখগামী মহালম্ফ’ নীতিটা আপাতত মাথায় থাক।
ড. গোলাম শফিক, এনডিসি: লেখক-গবেষক
সাবেক প্রধান (অতিরিক্ত সচিব), ব্লু-ইকোনমি সেল










