দেশের পরিবহন খাতে বিদ্যমান নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অনুমোদনহীন যানবাহন অবাধ চলাচল এখন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে দিন দিন অননুমোদিত পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অননুমোদিত পরিবহনের কারণে ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশের সড়ক ও মহাসড়কে ২০ ধরনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি দিয়ে থাকে। তবে বিআরটিএর অনুমোদনের বাইরে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চলে আরো কয়েক ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। বর্তমানে ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি, ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক রিকশা, স্কুলভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকৃত বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার কিংবা ট্রলি-ট্রাক্টর প্রভৃতি যানবাহন অনুমোদন ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছে। এছাড়া কিছু কিছু যানবাহনের অনুমোদন থাকলেও সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলাচল করছে। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসকাপ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই এমন যানবাহন (ইনফরমাল ট্রান্সপোর্ট) চলাচলে এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের দুই শহর খুলনা ও ঢাকা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় অননুমোদিত পরিবহনের পরিমাণ ৫৪ শতাংশ আর খুলনায় তা ৫৮ শতাংশ।

এদিকে দেশের সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মিছিল থামছে না। বরং দিনের পর দিন তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা বিধানে সরকার জনস্বার্থে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা, অটো, টেম্পো এবং সব শ্রেণীর অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। এরপর পেরিয়ে গেছে সাড়ে সাতটি বছর। মহাসড়কে তিন চাকাসহ স্বল্প গতির যানবাহন চলাচল বন্ধে উচ্চ আদালতেরও রয়েছে কঠোর নির্দেশনা। অথচ কিছুই মানা হচ্ছে না। ফলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। মহাসড়কে অবৈধভাবে এসব অনুমোদনহীন যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এবং অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে এসব যানবাহন চলাচল করছে, যেসব কারণে কন্ট্রোল না থাকায় প্রায় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময় অদক্ষ চালক, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চালানো, অতিরিক্ত গতিসহ নানা বিষয় উঠে আসে। তবে সড়ক দুর্ঘটনার যতগুলো কারণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে প্রায়ই দেখা যায়, অননুমোদিত যানবাহনের বিষয়টি। মূলত বিশেষজ্ঞদের মতে, অননুমোদিত ইনফরমাল ট্রান্সপোর্ট বলতে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াও যে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে সেগুলোকে বোঝায়। এ ধরনের যানবাহন চলাচলে যেহেতু কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকে না, সেহেতু এসব যানবাহনে কাঠামোগত ত্রুটি ও দুর্বলতা, নিরাপত্তার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো থেকেই যায়। বণিক বার্তার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বর্তমানে ২০ ধরনের যানবাহনকে রাস্তায় চলাচলের অনুমোদন দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, অটোরিকশা, অটো টেম্পো, বাস, কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যান, হিউম্যান হলার, জিপ, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, মোটরসাইকেল, পিকআপ, প্রাইভেট কার, স্পেশাল পারপাজ ভেহিকল, ট্যাংকার, ট্যাক্সিক্যাব, ট্রাক্টর, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। বিআরটিএ তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই ২০ ক্যাটাগরিতে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৫৭ লাখের বেশি। দেশের সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী, এসব ক্যাটাগরির যানবাহন ছাড়া সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করা সব ধরনের যানবাহন অবৈধ। আর অবৈধভাবেই এ ধরনের যানবাহন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে, যার কারণে সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। 

এসব যানবাহন কর্তৃপক্ষের সামনেই চলাচল করছে। আবার ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের অননুমোদিত যানবাহন ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া উৎপাদন বা আমদানি করা মানা থাকলেও সেটা করা হচ্ছে কোনো প্রকার কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে। এসবকে কেন্দ্র করে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়েছে। তাই বলা যায়, অবৈধ অননুমোদিত যানবাহন ঠেকানোর উদ্যোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার পরিচয় মিলেছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের মতো বিভিন্ন যানবাহনের সমস্যা আমাদের সড়কে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, দেশে চলাচলরত ৩৩ শতাংশ যাত্রীবাহী বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। সে হিসেবে সারা দেশে ফিটনেস নবায়ন ছাড়াই সাড়ে পাঁচ লাখ যানবাহন সড়কে চলাচল করছে। এছাড়া ৫৬ শতাংশ বাসের গতি নিয়ন্ত্রক সার্টিফিকেটও নেই। তার সঙ্গে দেশে গত এক বছরে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। দফায় দফায় কর মওকুফের পরও মালিকরা গাড়ির ফিটনেস হালনাগাদ করছেন না। যে কারণে গত প্রায় এক বছরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বেড়েছে প্রায় ৬০ হাজারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর অন্যান্য কারণের মধ্যে ছিল ৬৬ হাজার ৬৬১টি ফিটনেসবিহীন যানবাহন। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সরকারি সংস্থাই যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়াই সনদ দিয়ে দিচ্ছে। অথচ বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের পরিদর্শন ও পরীক্ষা ছাড়া কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদ দেয়া হচ্ছে কিনা, তা তদারকির জন্য কমিটি রয়েছে। কিন্তু এই কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

গত জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, বর্তমানে বিআরটিএর অনুমোদিত গাড়ির সংখ্যা ৫৫ লাখ ৮২ হাজার ৩১০। বর্তমানে ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ যেসব যানবাহন অনুমোদন ছাড়া রাস্তায় চলাচল করছে; এ ধরনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তাই আশা করা যাচ্ছে সামনে সরকার এই ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত ত্রুটিসহ নানান অসংগতির কারণে অননুমোদিত যানবাহনগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে, এটা বোঝা গেলেও মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত প্রয়োজন এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবিকার স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব যানবাহনকে রাস্তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে এসব যানবাহনকে শহরের মূল সড়ক ও মহাসড়কে আসা বন্ধ করে দিতে হবে। এ ধরনের যানবাহন কেবল শহরের ফিডার রোড ও সরু সড়কগুলোতেই চলাচলের অনুমতির ব্যবস্থা করে দেয়া যেতে পারে। আর অননুমোদিত যানবাহনকে কাঠামোগত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানোন্নয়ন, সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং এমন যানবাহনের চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধিত করে এগুলোকে অনুমোদনের ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। আর সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত হবে দ্রুততার সঙ্গে অননুমোদিত যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার বিকল্প দ্রুততার সঙ্গে খুঁজে বের করা।