দেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রসার ঘটাতে চাইছে সরকার। এজন্য ‘বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদন’ এবং ‘নিবন্ধন ও চলাচলের’ জন্য নীতিমালা করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে নির্দেশিকা। রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) মাধ্যমে ১০০ বিদ্যুচ্চালিত বাস আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতকেও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজারে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হচ্ছে। লক্ষ্য ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের সড়ক পরিবহন খাতে ব্যবহৃত অন্তত ৩০ শতাংশ মোটরযান বিদ্যুচ্চালিত হিসেবে রূপান্তর ঘটানো। যদিও এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের প্রস্তুতিতে ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা, শুল্কছাড়সহ কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রগতি নেই। লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে জরুরি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি খাতে ব্যাপক হারে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রণোদনার পদ্ধতি নির্ধারণ এবং প্রণোদনার জন্য দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেনি। এখন পর্যন্ত দেশে ‘ফোর হুইলার’ যানবাহনের জন্য কোনো চার্জিং স্টেশন তৈরি হয়নি। প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। ব্যাটারিসহ গাড়ি ব্যবস্থাপনায়ও নেই কোনো অগ্রগতি। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্য যুগোপযোগী কিন্তু সেটি অর্জনে সরকারের পদক্ষেপ হতাশাজনক। প্রত্যাশা থাকবে, সরকার দ্রুতই নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে।
বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান নিবন্ধন ও চলাচল নীতিমালা ২০২৩-এ ইঞ্জিনচালিত যানবাহন হিসেবে বিদ্যুচ্চালিত মোটরযানকে নিবন্ধন ফির আওতায় আনা হয়েছে। বিদ্যুচ্চালিত মোটরযানের প্রসারের ক্ষেত্রে বিষয়টি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসবের বাইরে বৈদ্যুতিক যান চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি, ব্যবহৃত ব্যাটারির উচ্চমূল্য, তুলনামূলক কম অনুকূল ব্যাটারি প্রযুক্তি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবার অভাব, দক্ষ জনবলের অভারের মতো বিষয়গুলোকে বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন প্রসারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজারে পিওর ইলেকট্রিক বা প্লাগইন ইলেকট্রিক যেসব বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন আছে, সেগুলোর দাম জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং দাম আরো বেশি। ব্যাটারির দাম অনেক বেশি। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি। এ বিষয়গুলো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মানুষকে নিরুৎসাহী করছে। এক্ষেত্রে সরকারের আরো ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশই বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে। গত এক দশকে অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে টেসলা, রিভিয়ান, এনআইওর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রচলিত দ্রুতগতির গাড়ি প্রস্তুতকারক ভলভো, জিএম, নিশান ও ফোর্ডও বাজারে এনেছে বৈদ্যুতিক গাড়ির পসরা। বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির রেকর্ড এখন সর্বোচ্চ। নরওয়ে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোয়ও দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার হার। বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনায় পাঁচ বছর আগের হিসেবে সুবিশাল বাজার রয়েছে বর্তমানে চীনে, যার হার প্রায় ২৮ শতাংশ। ভারত বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন জনপ্রিয় করার জন্য প্রণোদনা দিয়েছিল। এ কারণে তাদের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে যখন প্রথম সিএনজিচালিত যানবাহন আসে, তখন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ওপর প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল। দেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদন এবং আমদানির ক্ষেত্রে ভালো প্রণোদনা ও শুল্কছাড় সুবিধা না দিলে মানুষ এটা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী হবে না। শুধু গাড়ি উৎপাদন ও আমদানিই নয়, প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যও উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা দেশের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি খাতের জন্য প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অনেক সংস্থা ‘ইলেকট্রিক’ মোটরযান নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে। সরকারিভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসির মাধ্যমে ইলেকট্রিক বাস প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাধারণ জনগণকে ইলেকট্রিক মোটরযান ব্যবহারের জন্য সরকার উদ্বুদ্ধ করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য কাজ চলছে। ওয়ালটনসহ একাধিক কোম্পানি দেশে বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান উৎপাদনে কারখানা স্থাপন করছে বলে জানানো হয়েছে।
যানবাহন খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির (ডিজেল, পেট্রল) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, প্রবেশযোগ্য ও সাশ্রয়ী চার্জিং অবকাঠামো স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার্জিং স্টেশন বসানোর মাধ্যমে চার চাকার যান কেনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। খসড়া অনুযায়ী, চার্জিং অবকাঠামো তৈরি ও বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। চার্জিং স্টেশন দিতে হলে পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে। বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ওই এলাকার বিতরণ কোম্পানির কাছে আবেদন করবে। স্রেডা বা বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা তৈরির আগ পর্যন্ত আগামী পাঁচ বছর চার্জিং স্টেশনের কারিগরি পরীক্ষা করবে বিতরণ কোম্পানি। দেশে এরই মধ্যে তিন চাকার বিদ্যুচ্চালিত যানের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। তবে চার চাকার বিদ্যুচ্চালিত যানের ব্যবহার শুরু হয়নি। পর্যায়ক্রমে অকেজো ঘোষিত গাড়ির বিপরীতে এবং নতুন কেনার ক্ষেত্রে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি অগ্রাধিকারে থাকবে। সব বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রস্থল এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চার্জিং অবকাঠামো তৈরি করা হবে। মহাসড়কে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে রাস্তার দুই পাশে স্টেশন করার কথা রয়েছে। সবকিছুই পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললে চলে। ফলে মানুষ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি পরিচালনায় যেহেতু প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, তাই সেই বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন হচ্ছে এটিও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। উন্নত বিশ্বে যেখানে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ নিউক্লিয়ার এনার্জি এবং নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে উৎপাদন হয় সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির কার্যকারিতা অনেক বেশি। কারণ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের কার্বন নিঃসরণ বাড়বে না। অন্যদিকে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোয় কার্বন নিঃসরণ রোধে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। কারণ এসব দেশে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে, যা আগে থেকেই প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। এ অবস্থায় এসব দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে আরো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কার্বন নিঃসরণও আরো বাড়বে। তাই অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির পূর্ণ সুফল ভোগ করতে চাইলে আগেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিউক্লিয়ার এনার্জি এবং নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একমাত্র তবেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে বৈদ্যুতিক গাড়ি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে।
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন বেশকিছু সময় এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও উন্নত ব্যবস্থাপনা। বৈশ্বিকভাবে যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং নয়াবনযোগ্য শক্তির পূর্ণ ব্যবহার করা হয় একমাত্র তবেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈদ্যুতিক গাড়ি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে অ্যাডহক ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে টেকসই প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক পদক্ষেপ নিতে হবে।










