ফলে এটি কোনো একক সংস্থার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা আরো কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছার আগের কোনো না কোনো স্তরে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে এমন সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল হওয়ার বিকল্প নেই। যেমন কৃষি মন্ত্রণালয় জমিতে যেন কোনো বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবহার করা না হয়, যা খাদ্যপণ্যে স্থানান্তরিত হতে পারে সেটি নিশ্চিতে তৎপর থাকতে পারে। এভাবে খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এক্ষেত্রে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নাম এক্ষেত্রে সবার আগে নিতে হয়। এর বাইরেও শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরও অনিরাপদ খাবার বাজারজাত হওয়ার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
আবার ব্যবসায়ী মহলেরও বড় দায় রয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের বাড়তি মুনাফার লোভ ও অনৈতিক চর্চার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁুিকতে পড়ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন বাজার ব্যবস্থাপনায় কমিিটও করা হয়, যাদের প্রাথমিক দায়িত্ব থাকে পণ্য তদারকির। সেখানেও ঘাটতি রয়ে গেছে। অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধের জন্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পেশাদার আচরণ দরকার ছিল সেখানেও বড় ঘাটতি লক্ষণীয়। ফলে দেশের রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপ—সবখানে ভেজাল, অনিরাপদ পণ্যের ছড়াছড়ি। জেলিযুক্ত চিংড়ি, রাসায়নিক রঞ্জক মেশানো মাছ, রঙ মেশানো ডাল, পচা মাংস, অসুস্থ পশুর কলিজা কিংবা কালো হয়ে যাওয়া নষ্ট গরুর মগজ ইত্যাদি অনিরাপদ খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত মনিটরিং ও মোবাইল কোর্টের ২০২২-২৬ সাল পর্যন্ত ৩০টি অভিযানের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ সংখ্যা ও তথ্য বরং খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। মাত্র ৩০টি অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও প্রতিষ্ঠানে যদি এত অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে যেসব বাজার, দোকান, খাদ্যপ্রতিষ্ঠান বা উৎপাদন কেন্দ্র এ পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে, সেখানে পরিস্থিতি কেমন? ঢাকার বাইরের জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ বাজারগুলো পরিস্থিতি কেমন? আবার যেসব স্থানে অনিয়ম পাওয়া গেছে সেগুলো যে বর্তমানে সব নিয়ম মেনে চলছে সেই নিশ্চয়তা কী রয়েছে?
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো স্পষ্ট ও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ার পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কীভাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আর সংশোধনের সময়সীমা বেঁধে দেয়ায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ রেখেছে, যেখানে আইনে স্পষ্টভাবে শাস্তির বিধান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩৪ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, রোগাক্রান্ত বা পচা মাছ-মাংস কিংবা রোগাক্রান্ত বা মৃত পশু-পাখির মাংস, দুধ বা ডিম দিয়ে কোনো খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ বা বিক্রয় করা যাবে না। ধারা ৬০-এ বলা হয়েছে, ৩৪ ধারাসহ (এবং বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, নিম্নমানের খাদ্য বিক্রি-সংক্রান্ত ২৩ থেকে ৩১, ৩৩, ৩৫ ও ৩৭ ধারা) অপরাধগুলো আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য। আরো গুরুত্বপূর্ণ, ৭৮ ধারার উপধারা (৬)-এ সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, একই তালিকাভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক জরিমানার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে পারবে না। অর্থাৎ আইন নিজেই এ ধরনের অনিয়মকে এতটা গুরুতর মনে করে যে এখানে সংশোধনের সুযোগ দেয়া বা প্রশাসনিক পর্যায়ে ইতি টানার পথ রাখেনি; বরং সরাসরি ফৌজদারি প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলার মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অথচ কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, অসুস্থ পশুর প্রায় দুই কেজি কলিজা কিংবা কালো হয়ে যাওয়া নষ্ট মগজ পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানকে কেবল ৩০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে, পরে সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখিয়ে কোনো মামলাই হয়নি, এমনকি সন্তোষজনক ব্যাখ্যার কারণে একটি সুপারশপকে মামলা দেয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়, সন্তোষজনক ব্যাখ্যার মানদণ্ড কী? বা আইন যেখানে আপসের সুযোগ রাখেনি, কর্তৃপক্ষ সেখানে কোন ক্ষমতাবলে বারবার শুধু মৌখিক সতর্কতা বা প্রশিক্ষণেই সন্তুষ্ট থাকছে? নিরাপদ খাদ্য আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্বই হলো বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে খাদ্য উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ করা; কেবল অনিয়ম চিহ্নিত করে সংশোধনের অনুরোধ জানানো নয়। বাজারে অনিরাপদ খাদ্য পৌঁছার আগেই তা ঠেকানো উচিত; বাজার থেকে সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশের পর সময় দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেয়ার অর্থ হলো জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা, যা কোনোভাবেই কাম্য না। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর, বিশেষত বিএফএসএর কার্যক্রম এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ বেশি। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ের দায়িত্বও বিএফএসএর।
বিগত কয়েক বছরে ৩০টি অভিযান কোনোভাবেই দেশব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র হতে পারে না, বরং সীমিত পর্যবেক্ষণে পাওয়া অনিয়ম প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত ও নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনকে সামনে আনে। পাশাপাশি নিয়োজিত কর্তপক্ষগুলোর দায়িত্বশীলতার ঘাটতিকেও সামনে এনেছে। সুতরাং অনিরাপদ খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণে সর্বাগ্রে সংস্থাগুলোর পেশাদার আচরণ অপরিহার্য। তারা পেশাদার হলে নিরাপদ খাদ্য আইনও বাস্তবায়ন হবে আশা করা যায়।
কেবল খাদ্য নয়, নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, যা নিশ্চিতে দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা যদি আইন মেনে উদ্যোগ না নেয়, তবে সেই ব্যক্তিকেও আইনের আওতায় আনার নজির স্থাপন করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। যেকোনো মূল্যে দেশের জনগণকে খাদ্যনিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে সরকারকে।










