আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চিকিৎসা পর্যটন থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় অংশ আসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া চিকিৎসাপ্রার্থীদের কাছ থেকে। দেশ থেকে বহির্গামী চিকিৎসা পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ দেশীয় চিকিৎসকদের ওপর জনগণের অনাস্থা। কিছুদিন আগে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সুচিকিৎসার্থে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নৈতিকতার শক্ত অবস্থানে থেকে চিকিৎসকরা পেশা চর্চা করলে দেশে চিকিৎসা ব্যয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে আসবে। কিন্তু দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে নৈতিকতার শিক্ষা পোক্ত নয়। 

তবে নৈতিকতা প্রসঙ্গে বণিক বার্তায় প্রকাশিত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. লিয়াকত আলীর মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, শুধু নৈতিকতার শিক্ষা সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ নৈতিকতা মান্য করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেছেন, ‘আইন, বিধি ও তার বাস্তবায়ন প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় হতে হবে। চিকিৎসকদের নৈতিক করে গড়ে তুলতে আদর্শিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। সেবাগ্রহীতা এবং সেবাদাতার অধিকার কী হবে তা আইন বলে দেবে। তবে যথাযথ বাস্তবসম্মত আইন না থাকা এবং আইনের দুর্বলতা অনৈতিকতাকে প্রভাবিত করে। আইন দায়িত্ব সম্পর্কে বলে দেয়।’

কিন্তু অতি আক্ষেপের বিষয় যে আইনবিদদের মতে, দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো রোগীর স্বার্থ রক্ষার্থে প্রস্তুত নয়। স্বাস্থ্যসেবার ওপর ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনামলে প্রণীত দি মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৪ নং ধারা অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অভিযোগ ছাড়া কোনো অপরাধ দেশের কোনো আদালত ধর্তব্যে নিতে পারবেন না।

রোগীর স্বার্থ রক্ষার্থে আছে সবেধন নীলমণি ২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন। সে আইনের ৫৩ নং ধারা অনুযায়ী, ‘কোন সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটাইলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

এছাড়া ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জারীকৃত পেনাল কোডের ৩০৪ক ধারা কিংবা ৩৩৬ ধারায়ও চিকিৎসায় অবহেলা নিয়ে বিধান আছে, তবে সেগুলোও পর্যাপ্ত নয়।

আইনবিদ ও অপরাধশাস্ত্রবিদদের অভিমত, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে এমন লঘু দণ্ড রোগীদের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট নয়। তবে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকবার বিল বা খসড়া আইন প্রস্তাব করা হয়েছিল।

কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ-প্রতিরোধে কিংবা সরকারের আমলাদের অবহেলায় সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। যেমন ২০১৪ সালের খসড়া ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ প্রস্তাব করা হলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন তার বিরোধিতা করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে প্রস্তাবিত খসড়া আইন পরিবর্তন করে ‘রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন ২০১৬’ প্রস্তাব করা হয়। যাকে অনেকে চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এরপর ২০১৯ সালে খসড়া ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন’ প্রস্তাবিত হলে তাতে চিকিৎসকদের অবহেলা ঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত হয় বলে মত দিয়েছেন অনেকে।

তাই দেশের জনআলাপে ও সংবাদমাধ্যমে ভুল চিকিৎসা নিয়ে আলাপ হলেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভুল চিকিৎসা উদ্ভূত রোগ বা স্বাস্থ্যগত ক্ষতি (যাকে ইংরেজিতে iatrogenesis বলে) নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। সারা বিশ্বে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক বলে খ্যাত হিপোক্রেটাস প্রণীত হিপোক্রেটিক ওথ বা হিপোক্রেটিয়ো শপথ বা প্রতিজ্ঞা পাঠ করানো হয়। এ শপথের অন্যতম প্রতিজ্ঞা হলো ‘প্রথমত রোগীর কোনো ক্ষতি করো না’ (First do no harm বা লাতিনে: Primum non nocere) কিন্তু সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, কমিশন খেয়ে চিকিৎসকরা অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার অতিসুবিদিত। আবার আরেক গবেষণাপত্রে জানা যায়, দেশের অধিকাংশ শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিপোক্রেটিয়ো শপথ সম্পর্কে জানলেও ৮০ শতাংশের অধিক শিক্ষানবিশ গত শতাব্দীতে প্রণীত নুরেমবার্গ কোড কিংবা হেলসিংকি ডিক্লারেশন সম্পর্ক অবগত নন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন আছে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও তাদের পর্যবেক্ষণের কাজটি করে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল (জেএমসি)। এটি চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে তারা রোগীদের স্বার্থের বিষয়টিও দেখাশোনা করে। দক্ষতা, যোগ্যতা ও রোগীদের কল্যাণ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান যাচাইপূর্বক লাইসেন্স ও নিবন্ধন দেয়া হয়। লাইসেন্স বহাল রাখা হবে কিনা সে বিষয়ে প্রতি বছর চিকিৎসকের সেবা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে জেএমসি। চিকিৎসা-সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধে রোগী ও চিকিৎসক অভিযোগ করতে পারেন জেএমসিতে। অভিযোগ তদন্তে জেএমসির নিজস্ব তদন্ত দল রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়। পেশাগত ভুল, অবহেলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধ বিবেচনায় চিকিৎসকের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে রোগীকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। তবে চরম অবহেলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।   

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে চিকিৎসকের অবহেলার ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে প্রচুর মামলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কোর্ট উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির উপকারও করেছেন। ভারতে চিকিৎসকের অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কার্যকরী আইন তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে এ রকম কোনো আইন নেই।    

চিকিৎসকদের নৈতিক স্খলন কাম্য নয়। শপথ নিয়ে এ পেশায় আসতে হয়। মানবতার মহান এ ব্রতকে ইচ্ছেকৃতভাবে উপেক্ষা করলে শুধু আইন দিয়েও চিকিৎসকদের মনোভাব পরিবর্তন করা যাবে না। তাই আমরা প্রত্যাশা করব এ পেশার মাহাত্ম্যকে উপলব্ধি করে চিকিৎসকরা পেশাগত জীবনে নৈতিকতার চর্চা করবেন এবং তাদের নৈতিকতা যেন মিথে পরিণত না হয় সেটি নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাবলি তথা উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত আইনগুলোর আলোকে আমাদের সরকারের স্বাস্থ্যসেবা খসড়া আইনটি সংশোধন করে দ্রুত পাস ও বাস্তবায়ন করা হোক। রোগীর আর্থিক অবস্থান বিবেচনা না করে চিকিৎসকদের আন্তরিকতার পরিপ্রেক্ষিতে সব নাগরিকের জন্য সঠিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হোক, সেটিই আমাদের কাম্য।