(গতকালের পর)
স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকাসহ বিশ্বের অনেক দেশই সফল হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ কী করতে পারে?
দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে। এর দুটো পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, আন্তর্জাতিক ও দেশজ। আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতের কারণে সব দেশেই দুই বছর আগে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। বেশকিছু কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। যেমন কভিডের কারণে বিভিন্ন জায়গায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। যে কারণে সরবরাহ কমে যায়। কর্ম নিয়োজন হ্রাস পায়। সেই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল, তখন দেখা গেল খাদ্যের আমদানি-রফতানিতে প্রভাব পড়ছে। যেহেতু গম আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ ইউক্রেন থেকে আসে। এটি যখন ব্যাহত হলো, তখন দেখা গেছে যে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। জ্বালানি তেল, খাদ্যের দাম, বাসা ভাড়া বেড়েছে। দেশজ পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক এ প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। পরবর্তী সময়ে কভিডের প্রকোপ কমে আসায় উৎপাদন ব্যবস্থা কভিডের আগের জায়গায় চলে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে একসময় মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছিল, এখন ৪ শতাংশ। ব্রিটেনে ১০ শতাংশ ছিল, সেটি এখন ৬-এ এসে গেছে। ভারতের মতো দেশে ৭ শতাংশে এসেছে। বাংলাদেশে কেন হচ্ছে না?
বাংলাদেশে এটি না হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ যেটা মনে হয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিত থেকে এটা দেখা যাক। যেমন কৃষক উৎপাদন করছেন, উৎপাদিত পণ্য একেবারে শেষ ভোক্তা হিসেবে আমার কাছে আসছে। এর মধ্যে অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। প্রাথমিক ও মধ্যম স্তর রয়েছে, এখন এ স্তরগুলোর মধ্যে যদি অন্তরায় সৃষ্টি করা হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমবে না। অনেক সময় দেখা যায়, চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পণ্যটি পৌঁছানোর আগে নানা জায়গায় কতগুলো অন্তরায় তৈরি করা হয়েছে। মূল্য যাতে না কমে সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। যাদের সিন্ডিকেট বলা হয়, তারা এটি নিয়ন্ত্রণ করলে মূল্যস্ফীতি কমবে না। তেল আমদানি করা হচ্ছে, বর্তমানে জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য কমে গেছে। স্বল্প দামে জ্বালানি তেল কেনা হচ্ছে, কিন্তু স্বল্প দামের সুবিধা যদি চূড়ান্ত ভোক্তাকে না দেয়া হয়, এ সুবিধা আমদানিকারক নিজে নিলে চূড়ান্ত ভোক্তা যখন কেরোসিন বা পেট্রল কিনবেন, তার মূল্য হয়তো কমবে না। আমি মনে করি বিভিন্ন দেশে যে মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে, তারা এক্ষেত্রে যেসব অন্তরায় ছিল সেগুলোকে ধীরে ধীরে তিরোহিত করেছে। কিন্তু আমাদের মূল্যস্তর কমছে না, কারণ কৃত্রিমভাবে আমদানিমূল্য কমে যাওয়ার সুবিধা সেটি আমরা চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে স্থানান্তর করছি না। মাঝখানে কতগুলো ধাপ আছে, সে ধাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কমে আসছে না। মূল্যস্ফীতির ভোগান্তি সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগ করছে। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কৃতকর্মের কুফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, মূল্যস্ফীতি বিভিন্ন দেশে যেভাবে কমানো হয়েছে, সেটা সরকারের বিতরণের দিক থেকে হতে পারে, খাদ্য বা জ্বালানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়ার ক্ষেত্রে হতে পারে। এসব ব্যবস্থা বাংলাদেশে গ্রহণ করা হয়নি। এজন্য মূল্যের যে উঁচু স্তর তাতে বাংলাদেশের মূল্যমান বা বাজারমূল্য আটকে আছে।
রফতানি খাতের বৈচিত্র্যায়ণ প্রয়োজন। বর্তমানে জাহাজ ভাড়াও কমে গেছে, বাংলাদেশ এ সুবিধা নিতে পারছে না কেন?
সুবিধা নিতে পারছে না, কারণ এখানে কতগুলো ব্যাপার আছে। অন্তত দুটো জায়গায় আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে অধিক নির্ভর করি। একটি হলো আমাদের পোশাক শিল্প। আমাদের একটা বড় আয় আসে পোশাক শিল্প থেকে। আরেকটা যে খাত থেকে আমাদের বেশি আয় আসে সেটা হলো শ্রমিক রফতানি থেকে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এ দুটো খাতের ওপর নির্ভর করে আসছি। আমাদের এটা স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে। এটাকে কীভাবে আরো বৈচিত্র্যময় করা যায় সেদিকে কিন্তু সে অর্থে নজর দেয়া হচ্ছে না। এটাতে নজর দেয়ার জন্য অনেকগুলো ব্যাপার কাজ করতে পারে, যেমন আমাদের বিভিন্ন দেশে দূতাবাস রয়েছে এবং দূতাবাসে একটা বাণিজ্যিক শাখাও রয়েছে। এখন দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বা সে দেশের সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, আমাদের অন্য যেসব পণ্য রয়েছে, যেমন কারুশিল্প বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তার রফতানির ব্যাপারে। আমাদের দেশে প্রচুর ফল উৎপাদন হয়। সেই ফল বা ফলের রস প্রক্রিয়াজাত করে আমরা রফতানি করতে পারি। সেজন্য যেসব দূতাবাস আছে তাদের সহযোগিতায়ই বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। আরেকটা দিক হতে পারে আমরা অনেক দেশে পণ্য রফতানি করছি, সেই সব দেশে আমরা পোশাক বাদে আর কী কী জিনিস রফতানি করতে পারব এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা যায়। তারপর রফতানি সুবিধা অর্থাৎ শুল্ক সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয় আসে। আমরা দুটো জিনিস রফতানি করি। সেখান থেকেই আমাদের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসে। আমরা যদি এ জায়গায় স্থির থাকি তাহলে আমাদের রফতানি বৈচিত্র্যকরণ হবে না। এক্ষেত্রে সুযোগ রয়েছে। কোথায় সুযোগ আছে বা কীভাবে সেই সুযোগের ব্যবহার করা যেতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বেসরকারি খাতের বিরাট ভূমিকা আছে। যেমন বিভিন্ন সময় আমাদের রাষ্ট্রনেতা বা নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন দেশে সফরে যান, সেখানে যদি সবসময় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নেয়া যায় তাহলে আমার ধারণা, আলোচনাটা একটি ফলপ্রসূ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। আমি বলতে চাচ্ছি, আমরা যদি সম্মিলিতভাবে চেষ্টা না করি তাহলে আমরা বৈচিত্র্যপূর্ণ রফতানির দিকে খুব বেশি এগোতে পারব না।
আমাদের দেশে পর্যাপ্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
একজন বিদেশী বিনিয়োগকারী যদি বিনিয়োগ করতে চান। তাহলে তিনি দেখতে চাইবেন নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, বিনিয়োগ শর্ত, এক্ষেত্রে কি শতাধিক ধাপ পেরোতে হবে? নাকি চার-পাঁচটি ধাপ পেরোলেই হবে? দ্বিতীয়ত, অনুমতি পেতে ও পরে বিনিয়োগ কাজে লাগাতে কতখানি সময় লাগতে পারে। সেটা কি দীর্ঘ সময়? অনুমতি পেতে অনেক জায়গায় যেতে হবে? নাকি সেটা কম সময়ের মধ্যে হবে? তৃতীয়ত, দেখা হবে যে বিনিয়োগ করার যে ধাপ আছে, সেগুলোর সেবাসংক্রান্ত সুবিধা কী এক জায়গায় পাওয়া যাবে? যেমন এক জায়গাতেই ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে অনুমতি ও অর্থায়নের যে ছাড়পত্র সেটি মিলবে? চতুর্থত, বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে যে দেশের মানুষকে কাজে লাগানো হবে সে মানুষের দক্ষতা কতটা? তাদের কাজের প্রতি স্পৃহা কতখানি? কাজের নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কী ধরনের ধারণা রয়েছে? পঞ্চমত, পরিবহন ব্যবস্থা কেমন? যেসব জিনিস উৎপাদন করা হবে সেগুলো যদি রফতানি করা হয়, তাহলে সে সুযোগ-সুবিধা কতখানি রয়েছে? এই যে পাঁচটি কারণের কথা বললাম, বাংলাদেশ যদি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায়, তাহলে মনে রাখা দরকার এটা কিন্তু একটি প্রবল প্রতিযোগিতাপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশ যেমন বিনিয়োগ পেতে চায়, কম্বোডিয়াও বিনিয়োগ পেতে চায়। ভিয়েতনামও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায়। সুতরাং, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে যে প্রাক-শর্তগুলো রয়েছে, সেগুলো যদি ইতিবাচক না হয়, তাহলে তো বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন না। অন্যান্যভাবে আমি তাদের যতই আকৃষ্ট করতে চাই না কেন, বিনিয়োগকারী উল্লিখিত পাঁচটি ব্যাপারে জানতে চাইবেন। এখন এটিকে কীভাবে নমনীয়, বিনিয়োগবান্ধব ও সহজ করা যায় এ ব্যাপারে যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে। (শেষ)
শ্রুতলিখন: আতিকুর রহমান, ফারিন জাহান সিগমা ও আব্দুল কাইয়ুম










