দেশে চিনির বাজারে অস্থিতিশীলতা কাটছে না। চিনির মূল্যের পুনঃপুনঃ ঊর্ধ্বগতি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কিনা তা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নিতে হবে। বিএসএফআইসি রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি চিনিকলে তিন বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। যে কারণে বর্তমানে গুটিকয়েক বেসরকারি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান বাজারে চিনির জোগান নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখায় ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার চিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে সবসময় বড় প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছিল। আবার বাজারে আমদানীকৃত চিনিও সরবরাহ করত বিএসএফআইসি। তুলনামূলক কম দামে সরবরাহের মাধ্যমে সংস্থাটি চিনির বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার পাশাপাশি ভোক্তাদের ব্যয়ও কমিয়েছে দীর্ঘদিন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেশি থাকলেও দেশের ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব কম পড়েছে। কিন্তু বর্তমানে চিনি সরবরাহ এমনকি আমদানিও না করায় পণ্যটির বাজারে বিএসএফআইসি প্রভাবকের ভূমিকা হারিয়েছে। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএসএফআইসির লোকসান ও ভর্তুকি কমলেও ভোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের বাজার থেকে বাড়তি দামে চিনি ক্রয় করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না। এদিকে ক্রমাগত লোকসান এড়াতে সরকার ২০২০ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি মিলের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এতে বিএসএফআইসির বার্ষিক লোকসান কমেছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া বিএসএফআইসির ১৫টি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদন ছিল দুই লাখ টনেরও বেশি। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কমে বর্তমানে তা ২০ হাজার টনে নেমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের মিলগুলোর তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত মিলের চিনি উৎপাদনের পরিমাণ কম হলেও দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিএসএফআইসির একটা বড় ভূমিকা ছিল। সরকারি মিলে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারে স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে সংস্থাটি ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজার থেকে চিনি আমদানি করত। বিএসএফআইসির নির্ধারিত চিনির দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসরকারি মিলের চিনির দাম ওঠানামা করত। কিন্তু সরকারি মিলের চিনি উৎপাদন ও আমদানি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় নিত্যপণ্যটির বাজার বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে পড়েছে। এমনকি বর্তমানে বেসরকারি মিলগুলোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হচ্ছে চিনির দাম।

এভাবে বাজার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়া কাম্য নয়। কারণ জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এজন্য বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ যেন স্বাভাবিক থাকে তা তদারকি করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অপ্রত্যাশিত। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কেন সরকারি চিনিকলগুলো লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে, সেটি যথাযথ তদন্ত হয়েছে কিনা তা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে লাভের বদলে লোকসান হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। তাই জনগণের কথা বিবেচনা করে সরকারি চিনিকলগুলো পরিচালনায় যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে, সেক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ বাজারে সরকারি মিলের চিনির চাহিদা রয়েছে। তাই ভোক্তার কথা ভেবেই বাজারে চিনির সরবরাহ যেন স্বাভাবিক থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ বেসরকারি খাতে চিনির বাজার ব্যবস্থাপনা চলে গেলে তাতে যে মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, এতে ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা সরিয়ে নেয়। এমনকি বিষয়টি চক্রাকারে আবর্তিত হয়। যেমন চিনির পর পেঁয়াজ, আদা ও কাঁচামরিচের বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এমনকি চিনি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) সম্মতি না দিলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে।

ট্যারিফ কমিশনের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে ব্যবসায়ীদের এভাবে দাম বাড়ানো নিঃসন্দেহে অযৌক্তিক। কিন্তু সরকারি মিলে চিনি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় কার্যত তারা এ সুযোগ পেয়েছে। এক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি না করারও অভিযোগ উঠেছে। দেশে বর্তমানে ১৮ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরকারি মিলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের মিলগুলোর হাতে চিনির বাজার চলে গেছে। যে কারণে বিএসএফআইসি বর্তমানে চিনির দাম নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ না নিলেও বেসরকারি মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছেন। বাজারের এমন পরিস্থিতি সচেতনভাবেই কাম্য নয়। নাগরিকদের জন্য খাদ্যদ্রব্য সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা যেন গৌণ না হয়ে পড়ে সেজন্য চিনিকলগুলোয় উৎপাদন সচল রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলোয় আবার যেন উৎপাদন শুরু করা যায় সে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। কারণ লাভজনক এ খাত যেভাবে লোকসানের মুখে পড়েছে, এটি অব্যাহত থাকলে বর্তমানে উৎপাদনে থাকা মিলগুলোয়ও উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখনই সতর্ক হওয়া দরকার, না হলে তিক্ত অতীত বিবেচনায় নিকট ভবিষ্যতে আরো লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোকে। লাভজনক হওয়ার বদলে কী কারণে লোকসান হচ্ছে, কেন মিল পরিচালনায় স্বচ্ছতার প্রয়োগ ঘটছে না, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে চিনিকলগুলোকে আবারো উৎপাদনে ফেরানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। এতে ভোক্তাদের স্বার্থ যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভের মুখ দেখবে। চিনির বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এজন্য আশু পদক্ষেপ জরুরি।