বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে চোরাই পথে প্রবেশ করা স্বর্ণের সিংহভাগ ঢুকছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের পাশাপাশি মিয়ানমারের মাধ্যমেও দেশটিতে স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। ভারতে স্বর্ণের বৈধ আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চোরাচালানে জড়িতরা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা স্বর্ণ বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। মূলত ভারতে পাচারের জন্যই বাংলাদেশে এ স্বর্ণ চোরাচালান করে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান রুটের সবচেয়ে বড় করিডোরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে সামনের দিনগুলোয় তা আরো মারাত্মক রূপ নেয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালানে উড়োজাহাজের ক্রু, বিমানবালা, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সরাসরি জড়িত রয়েছেন। আবার অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আর্থিক ও শুল্ক খাতের বিভিন্ন সংস্থার কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় কিংবা তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ব্যর্থতা ছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান মহামারী আকার ধারণ করতে পারত না।

ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ভারত বৈশ্বিক স্বর্ণ চোরাচালানের সবচেয়ে বড় গন্তব্য দেশ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে চোরাচালানের স্বর্ণের সবচেয়ে বড় উৎস এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। ভারতে এখন পর্যন্ত আটক পাচারকৃত স্বর্ণের ৭৩ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে। দেশটিতে চীন থেকে আসা স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে মিয়ানমার হয়ে। আর মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকাসহ অন্যান্য উৎস থেকে পাচার হওয়া স্বর্ণের সবচেয়ে বড় করিডোর এখন বাংলাদেশ।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্যেও দেখা যায়, বাংলাদেশ হয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচার এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বাহিনীটি সীমান্তে পাচারের সময় মোট স্বর্ণ আটক করেছিল ৫৯ কেজি ৪৬৮ গ্রাম। আর গত মে মাস পর্যন্ত বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ১২১ কেজি ৪৭৯ গ্রাম স্বর্ণ আটকের তথ্য জানিয়েছে বিজিবি।

বর্তমানে বৈশ্বিক স্বর্ণ আমদানি ও স্বর্ণগহনা রফতানি—দুই দিক থেকেই ভারতের অবস্থান শীর্ষে। দেশটিতে এখন প্রতিনিয়তই সম্প্রসারণ হচ্ছে স্বর্ণের কালোবাজার। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) জানিয়েছে, এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী গৃহস্থালি পর্যায়ে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে ভারতে। দেশটিতে পারিবারিকভাবে জমা স্বর্ণের পরিমাণ ২৫ হাজার টন। বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব ও পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য ভারতে স্বর্ণের চাহিদা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। এ কারণেই দেশটিতে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে যেহেতু বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ আমদানি-রফতানি হয় না, এছাড়া শুল্কহার-সংক্রান্ত তেমন কোনো বাধাও নেই। সেক্ষেত্রে যেসব দেশ একই সঙ্গে বড় স্বর্ণ আমদানিকারক ও রফতানিকারক; সেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণ পাচার হলে এর সঙ্গে জড়িত দুই পক্ষেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে।

তবে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেরই খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, দুই দেশে আইন-শৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে যে পরিমাণ স্বর্ণ আটক হচ্ছে, পাচার হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তারও বেশি। ডব্লিউজিসি ২০২২ সালে ভারতে পাচারকৃত স্বর্ণের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রাক্কলন করেছে ১৬০ টন (এক টন = এক হাজার কেজি)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে কভিডপূর্ব সময়ের তুলনায় স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।

বণিক বার্তায় আরো প্রকাশিত হয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালানের ক্ষেত্রে লেনদেন হয় প্রধানত হুন্ডি ও হাওলার মাধ্যমে। ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করতে যে পরিমাণ টাকার এলসি করেন, তার ১০ গুণ পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। সে টাকাই প্রধানত স্বর্ণ চোরাচালানে ব্যবহার হয়। 

আবার বাংলাদেশ থেকে স্থলসীমান্তে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খুলতে গিয়ে আন্ডার-ইনভয়েসিং (আমদানি পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো) ও হুন্ডির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দেশের প্রধান শ্রমবাজার এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ভারতে চোরাচালানের স্বর্ণের বড় একটি অংশও আসছে সেখান থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি-হাওলায় প্রবাসীদের অর্থের বড় অংশ দেশে আসার অভিযোগ উঠেছে। আবার স্বর্ণ চোরাচালানেও লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে হুন্ডি-হাওলাকেই চিহ্নিত করছেন পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি চোরাচালান কার্যক্রমেরও প্রধান ভর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে লেনদেনের অবৈধ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হুন্ডি-হাওলা।

এভাবে হুন্ডি-হাওলার দৌরাত্ম্য বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। প্রবাসীরা যেন বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন এজন্য তাদের উৎসাহিত করতে হবে। এর সঙ্গে দেশ যেন আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচারের করিডোর হিসেবে ব্যবহার না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি দরকার। 

আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত তৎপরতা চালানোর বিকল্প নেই।