স্থানিক দূরত্বের ব্যবধানে বদলে যায় পতাকা, বদলে যায় মানুষের মুখের ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাস। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কৃতি ও অঞ্চলভেদে খুব স্বল্প দূরত্বের ব্যবধানেও ভাষার ধ্বনিগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ফলে একই ভাষার উচ্চারণেও তারতম্য ঘটে। আবার ধর্ম, সংস্কৃতি বা সম্প্রদায়ের পার্থক্যের কারণে বদলে যেতে পারে মুখের ভাষাটিও।
বিশ্বায়নের প্রভাবে কয়েকটি ভাষার প্রমিত রূপ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সীমানার অভ্যন্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষার প্রমিত রূপই সে স্থানের যোগাযোগের অনিবার্য মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত হতে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রমিত ভাষাকে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রতি ১৪ দিনের ব্যবধানে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা, আর সেই ভাষাটির সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। ইউনেস্কোর ২০১০ সালের রিপোর্টে প্রায় আড়াই হাজার বিপন্ন ভাষার একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এসব ভাষায় পাঁচ হাজারের চেয়ে কমসংখ্যক লোক কথা বলে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে ভাষাগুলো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা যে ভাষাগুলো বিপন্নপ্রায়; সে ভাষাগুলো বৈশ্বিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক বিবেচনায় ব্রাত্যজনের ভাষা। বাংলাদেশ থেকে গত এক শতাব্দীতে বেশকিছু ভাষা পরিপূর্ণরূপে হারিয়ে গেছে, অন্তত ১৪টি ভাষা বিপন্নপ্রায় এবং আরো সিকি শতক ভাষা বিপন্নতার দিকে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ভাষাভাষী প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীই সমাজে ব্রাত্য হিসেবে বিবেচিত। সমাজে ব্রাত্য হিসেবে বিবেচিত এমন বেশকিছু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রতি আমার কথা হয় এবং এ ভাষাগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি।
ব্রাত্যজনের ভাষা হারিয়ে যাওয়ার বা বিপন্ন হওয়ার পেছনে প্রধানতম কারণ হিসেবে নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার পরাধীনতা বিশেষ বিবেচ্য। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যেসব ভাষার কোনো লিখিত রূপ নেই, সেসব ভাষা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ১৪টি ভাষা বিপন্ন হওয়ার পথে, সেসব ভাষার কোনোটিতেই শিক্ষার অধিকার তো দূরের কথা, এ ভাষাগুলোর নিজস্ব বর্ণমালা পর্যন্ত নেই। তাই এসব জনগোষ্ঠীর তরুণরা নিজেদের ভাষার প্রতি ক্রমাগত আগ্রহ হারাচ্ছে। যেসব ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে, সেসব ভাষা অন্য যেকোনো অনুষঙ্গ বিবেচনায় না নিলেও অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিতে রয়েছে। মূলত বর্ণমালা আছে কিন্তু ভাষা হারিয়ে গেছে, এমন ঘটনা খুবই বিরল। সিলেটের নাগরী ভাষা ছাড়া এ অঞ্চলে এমনটি আর দেখা যায়নি। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে ৩৯টি ভাষা, সেগুলোর মধ্যে মাত্র আটটি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। চার-পাঁচটি ভাষা বাংলা ও রোমান বর্ণমালায় লেখা যায়। জনগোষ্ঠী ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এ ভাষাগুলো থেকে পাঁচটি ভাষায় ২০১৭ সাল থেকে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ সরকার। এখন এ ভাষার শিশুরা প্রি-প্রাইমারি থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত এ ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এ প্রচেষ্টাকে আরেকটু সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে এ ভাষাগুলো বিপন্নতার হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে। একইভাবে অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ভাষা বিলুপ্তির পেছনে দ্বিতীয় যে কারণ উল্লেখযোগ্য, তা হচ্ছে আর্থসামাজিক অবস্থা। দিন দিন এসব জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা হ্রাসমান হওয়ায় নিজস্ব পরিমণ্ডলে জীবিকা অর্জনের ব্যাপ্তি কমে যাচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে এসব জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে মিশতে হচ্ছে। তাই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রমিত ভাষার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া সামরিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরাধীনতার বাহ্যিক চাপও এসব জনগোষ্ঠীর তরুণ সমাজকে এসব ভাষা শিখতে নিরুৎসাহিত করছে।
বাংলাদেশে যে কয়েকটি ভাষা আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রেংমিটা ভাষা। এ ভাষায় নিয়মিত কথা বলে এমন লোকের সংখ্যা ২০ জনেরও কম। কন্দ, কোডা, লুসাইসহ আরো বেশ কয়েকটি ভাষা আছে যেসব ভাষায় অল্পসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠী কথা বলেন এবং তাদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাবে এসব ভাষা। তবে এসব ভাষার দু-একটিতে কথা বলে এমন অল্পসংখ্যক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও রয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, ভারতের সেসব অঞ্চল থেকেও হারিয়ে যেতে বসেছে এসব ভাষা। ভারতের ভাষা জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৬০০ ভাষা বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। এ চিত্র শুধু ভারতে নয়। পাপুয়া নিউ গিনিকে ভাষাবৈচিত্র্যের আধার বলা হয়। গিনি দ্বীপগুলোয় ভাষার সংখ্যা প্রায় ৮০০। এসব ভাষায় কথা বলে কয়েকশ থেকে হাজার দশেক মানুষ পর্যন্ত। এ ভাষাগুলো যেভাবে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যেই অন্তত ৭৫০টি ভাষা হারিয়ে যাবে। ইউনেস্কোর মতে, মাত্র দুজন ব্যক্তি কথা বলেন পৃথিবীতে এমন ভাষার সংখ্যা একশর কাছাকাছি। অর্থাৎ মাত্র দুজন ব্যক্তি মারা গেলেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে এমন ভাষার সংখ্যা প্রায় ১০০। পৃথিবীর শতকরা ৪৩ ভাগ ভাষা বিপন্নপ্রায় এবং পৃথিবীতে বর্তমানে ভাষার সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি হলেও পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষ কথা বলেন ১০০টিরও কম ভাষায়।
ককবরক ভাষায় কথা বলেন এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এ দেশে নেহাত কম নয়। পার্বত্য জেলাগুলো এমনকি ত্রিপুরায়ও এ ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠী দেখা যায়। একইভাবে বাংলাদেশের একাধিক জেলায়ও এ ভাষার লোকজন রয়েছে, যা সেসব অঞ্চলে ভাষাগত বৈচিত্র্য এনেছে। কিন্তু পার্বত্য জেলায় সরকারি উদ্যোগে ককবরক ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হলেও অন্যান্য জেলা থেকে ভাষাটি হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য জেলা থেকে ভাষাটি হারিয়ে যাওয়ার সময়প্রবাহের দিকে দৃষ্টি রাখলে আমরা একটি ব্রাত্যজনের ভাষাগত সংকটের বিস্তৃত ধারণা পেতে পারি। চাঁদপুর জেলায় ককবরক ভাষাভাষী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কয়েকটি ক্ষুদ্র পল্লী আছে। এ সম্প্রদায়ের একজন মিঠুন ত্রিপুরা। স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছেন। মিঠুন ত্রিপুরা শুদ্ধ উচ্চারণে প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। তার বাবা মাখন ত্রিপুরা পুরোপুরি প্রমিত ভাষায় কথা না বললেও ককবরক ভাষার শব্দ সামান্যই ব্যবহার করেন। মিঠুন ত্রিপুরার দাদা নিরদ ত্রিপুরা ককবরক ভাষায় নিয়মিত ও অনর্গল কথা বলতেন। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও নিরদ ত্রিপুরার মতোই এ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ ব্যক্তি ককবরক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতেন। এখনো এসব পল্লীর কয়েকজন প্রবীণ এ ভাষায় কথা বলেন। তবে সংখ্যাটি শতকরা পাঁচ ভাগের কাছাকাছি হবে। মধ্যবর্তী দুটি প্রজন্মের ব্যবধানে এ ভাষার ব্যবহার ক্রমাগত যেভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে, তাতে এসব প্রত্যন্ত পল্লীতে আগামী এক দশক পর এ ভাষায় কথা বলা লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে তা হলফ করেই বলা যায়। চাঁদপুরের আরেকটি ব্রাত্য সম্প্রদায় হচ্ছে হরিজন-হেলা সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায় মূল জনস্রোত থেকে বিচ্ছিন্নভাবেই এ জনপদে কাটিয়ে দিয়েছে দুই শতাব্দীকাল। এরা ইলাহাবাদী ভাষায় কথা বলেন। এখানকার বড়স্টেশন এলাকার একটি পল্লীতে হাজারখানেক লোকের বসবাস। দুই দশক ধরে তাদের নতুন প্রজন্ম বাইরের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর একটি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তাদের ভাষায়। বাইরের লোকজনের সঙ্গে তারা প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। এর প্রভাবে এখন তাদের নিজেদের আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি মিশ্র ভাষা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষায় ঢুকে পড়েছে প্রমিত বাংলার অসংখ্য শব্দ। একই কারণে হারাতে বসেছে তাদের ভাষার সমান্তরাল শব্দগুলো। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তাদের আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রেও প্রমিত বাংলা ব্যবহার করছেন। তবে মধ্যবয়সী এবং বয়সী লোকরা এখনো আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষাটির (মিশ্ররূপ) ব্যবহার করছেন। এ ভাষা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার কথা হয় দীপক হেলার সঙ্গে। দীপক হেলা গান করেন, স্বভাবসুলভ কবিতা লিখেন। তিনি প্রমিত বাংলা ও ইলাহাবাদী উভয় ভাষায়ই পারঙ্গম। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানতে পারি, তার বাবার পিতামহ ২০০ বছর আগে আসাম প্রদেশ থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তার দাদা রামকুমার এবং তার বাবা মনিলাল হেলা বাংলা জানতেন না। তিনি দুটো ভাষাই জানেন। তার সন্তান খোকন হেলা ইলাহাবাদী ভাষায় পারঙ্গম নন। তিনি মিশ্র ভাষায় কথা বলেন। তার নাতনি আরদ্ধা হেলা প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। এটি তার নৈমিত্তিক ভাষা হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ তিন প্রজন্মের মধ্যেই হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের ভাষাটি। পারস্পরিক আলাপচারিতায় জানা যায়, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মতো শিক্ষায় অতটা অগ্রসর না হলেও তাদের সন্তানদের অধিকাংশই এখন স্কুল কলেজে যাচ্ছে এবং সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করছে। তাই বাইরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে ক্রমে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে তাদের ভাষার শব্দগুলো। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যেই অঞ্চলটি থেকে হারিয়ে যেতে পারে এ ভাষা।
চাঁদপুরের আরেকটি ব্রাত্য সম্প্রদায় হচ্ছে বেদে জনগোষ্ঠী। এ জনগোষ্ঠীর আদি ভাষা হচ্ছে ঠার। প্রায় ২৫০ বছর ধরে এখানে বসবাসকারী এ সম্প্রদায়ের অনেকেই ভাষার পাশাপাশি বদলে নিয়েছেন নৌকাজীবনও। এখন তাদের অনেকেই বসতভিটা গেড়েছেন লোকালয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, সন্তান-সন্ততিদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। অবশিষ্ট যারা এখনো নৌকাজীবনে আছেন কিংবা নদীতীরে তাঁবু পেতেছেন, তাদের সবাই এখন বাংলায় কথা বলেন। তাদের উচ্চারণ শতভাগ প্রমিত না হলেও কিংবা উচ্চারণে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও তাদের ভাষা এ অঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে কয়েক যুগ আগেই। এখন তাদের ভাষার ক্ষয়িষ্ণু কঙ্কালটি এ সম্প্রদায়ের খুবই ন্যূনসংখ্যক ব্যক্তির স্বরের ওপর ভর করে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে ছায়াময়। তবে তাদের সংস্কৃতি তাদের ইতিহাসের ধারক হয়ে নিভুনিভু টিকে আছে তাদের দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞে। এখানকার ব্রাত্যজনদের ভাষা সম্পর্কে সম্যক ধারণালাভে কয়েকটি জেলেপল্লী ও মাঝিপল্লী ঘুরে একটি বিষয় অনুভব করি। এসব পল্লীর নিজস্ব ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির রেশটুকুও হারিয়ে গেছে বহুকাল আগেই। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত দু-চারটি শব্দ ব্যতিরেকে আর কিছুই টিকে নেই। তারা চাঁদপুরের স্থানীয় জনগণের স্বরেই কথা বলছেন। অন্য সম্প্রদায়গুলোর তুলনায় তারা সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে অনেক বেশি মেশার সুযোগ পেয়েছেন যার প্রভাব তাদের নৈমিত্তিক জীবনেও লক্ষণীয়। খুবই নগণ্যসংখ্যক লোকের কথার স্বরে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। প্রেস ক্লাবঘাটের মাঝি সুমন দাসের সঙ্গে কথা হয়। সুমন দাস জানান, ১৫০ বছর আগে পাটনী সম্প্রদায়ভুক্ত তার প্রপিতামহকে নৌকা চালানোর জন্য ব্রিটিশ অফিসাররা বিক্রমপুর থেকে চাঁদপুরে নিয়ে আসেন। তার পিতামহ এবং তার বাবাও মাঝি ছিলেন। তবে তার প্রজন্মের অধিকাংশই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তার দুটি বোন সমাজের অপরাপর শিশুদের সঙ্গে শৈশব থেকেই মিশেছেন। তারা দুজনই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। একজন সরকারি চাকরিও করছেন। সুমন দাসের বাবা বা দাদার ভাষায় ও স্বরে ভিন্নতা থাকলেও উচ্চারণ বা শব্দের প্রমিত ব্যবহার বিবেচনায় সুমন দাসকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করার সাধ্য কারো নেই। নিজেদের গোত্রীয় আন্তঃযোগাযোগের ক্ষেত্রেও তারা এখন একই ভাষারূপ ব্যবহার করছেন। এমনকি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বলতেও আলাদাভাবে শনাক্ত করার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সুমন দাসদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে মূলত বহুকাল আগেই। অনুসন্ধান করেও সে ভাষা ও সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট রূপ দাঁড় করোনো অসাধ্য কাজ। সুমন দাসদের ভাষা বহুকাল আগেই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে তাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যও। বেদে সম্প্রদায়ের ভাষার ফসিলটুকু স্বরের ওপর ভর করে লীন হতে চলেছে, যেভাবে লীন হতে চলেছে রেংমিটা, কন্দ, লুসাইসহ অসংখ্য নৃগোষ্ঠীর ভাষা। চাকমা, গারো বা ককবরক ভাষার মতো করে এসব ভাষাকে অতিদ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া না হলে বেশ কয়েকটি ভাষা এর ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে হারিয়ে যাবে আসন্ন এক দশকেই। বিপন্নপ্রায় আয়ুরেখা পাড়ি দেবে আরো কয়েকটি ভাষা। আগামী দুই দশকের পরিক্রমায় এ সুজলা-শ্যামলা বাংলাদেশ নামক বহুবর্ণিল, বহুবৈচিত্র্যময় ময়ূরটি একরঙা পালক আর পুচ্ছ নাচিয়ে ইতিহাসের অবশিষ্ট পথ পাড়ি দেবে।
মাইনুল ইসলাম মানিক: কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক










