দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এক ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে অর্থনীতিতে; আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে রিজার্ভ সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনে আইএমএফ থেকে প্রতিশ্রুত ঋণের তৃতীয় কিস্তি বাবদ ১১৫ কোটি ডলার ছাড় হয়। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া, আইবিআরডি, আইডিবিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা থেকে ৯০ কোটি ডলার ঋণ পায় বাংলাদেশ। ঋণের এ অর্থ যুক্ত হওয়ায় জুনে রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু জুলাইয়ে পুনরায় কমেছে রিজার্ভ। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছে জুলাইয়ে। এর প্রভাব পড়েছে রিজার্ভে। জুনের তুলনায় গত মাসে ৬৩ কোটি ডলার বা প্রায় ২৫ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে। আর জুলাইয়ে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১৩০ কোটি বা ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুসারে দেশের রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। ৩১ জুলাই তা ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহারযোগ্য নিট রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম।

এদিকে প্রকৃত পক্ষে কেন রিজার্ভ কমেছে সে বিষয় গণমাধ্যমে জানানো হবে না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। এছাড়া তিনি জানান যে এখন থেকে মাসে একবার রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করা হবে। সম্ভবত এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি মাসের ১ তারিখে আগের মাসের রেমিট্যান্সের বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ পেলেও ১ আগস্ট তা করা হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তার মাধ্যমে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে রেমিট্যান্সের তথ্য পাঠানো হয়। 

এভাবে তথ্য লুকিয়ে দেশের অর্থনীতির ক্ষত ঢাকা যাবে কি? তাছাড়া প্রকাশকৃত তথ্য, পরিসংখ্যান নিয়েও তো ধোঁয়াশার শেষ নেই। রফতানি-আমদানির তথ্য থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়ের হিসাবেও রয়েছে বিরাট অংকের ফারাক। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) রাজস্ব আহরণের তথ্যে পার্থক্য দেখা গেছে ৯৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকার বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পৃথিবীব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ, ডলারের বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতির মতো অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর প্রকৃত তথ্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কী হতে পারে সে বিষয়ে পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্টো পথে হাঁটতে যাচ্ছে। 

রিজার্ভ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছাড়া আমদানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা যায় না। বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। এরই মধ্যে প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি নেতিবাচক; ক্রমশ নিম্নমুখী। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুসারে গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর পর থেকেই ধারাবাহিক ক্ষয় চলছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলছে। এ অবস্থায় রিজার্ভ সংক্রান্ত এবং অর্থনীতির যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সূচকের প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত না করা অর্থনীতিকে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিতে পারে। কারণ প্রকৃত তথ্য ছাড়া সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা অনেকটাই দুঃসাধ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। আর চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রিজার্ভ ধরে রাখতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ঠিক রাখা জরুরি।

দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে মূলত রফতানি আয় ও প্রবাসী আয় অবদান রাখে। তবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেমিট্যান্সের। গত অক্টোবর থেকে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে সে প্রবৃদ্ধি কমেছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৫ শতাংশ কম। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে গত ১৬ জুলাই দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যদিও সরকারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৫০। তাছাড়া আন্দোলন ঘিরে ১৮-২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। দেশ ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রবাসীরা পরিবারের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ করতে পারেননি। একই সময় বন্ধ ছিল ব্যাংকসহ অর্থ লেনদেনের আনুষ্ঠানিক প্রায় সব মাধ্যম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারফিউ জারির পাশাপাশি দেশব্যাপী সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সরকার। দেশে সংঘটিত সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ, আমেরিকার কয়েকটি দেশে প্রবাসীরা সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেন। এর মধ্যে কোনো কোনো সমাবেশ থেকে রেমিট্যান্স ‘শাটডাউনের’ ঘোষণাও আসে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ‘শাটডাউনের’ ঘোষণার পর দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছিল।

এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১২ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীকে ডেকে রেমিট্যান্স বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণে মাসের শেষ তিনদিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু এ পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন। এর ফলে আবারো ডলারের বিনিময় হার অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। আবার এরই মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমায় কার্ব মার্কেটে বেড়েছে ডলারের দাম।

দেশে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে এজেন্ট ব্যাংকিং বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ব্যবহার করে। এসব সেবার অন্যতম বিকাশ। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ১৮-২৪ জুলাই পর্যন্ত সেবাটি ব্যবহার করে কেউ রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেননি। আবার ব্যাংকও বন্ধ ছিল। নগদ টাকার সংকট ছিল এটিএম বুথগুলোয়। একদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগহীনতা, অন্যদিকে আর্থিক লেনদেনের এ ভোগান্তি প্রবাসীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে বলা যায়। দেশের এমন দুর্যোগময় সময়ে যদি প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে আয় না পাঠায় তাহলে রিজার্ভের ক্রমশ পতন ঠেকানো আরো কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

সরকারের উচিত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া। দেশের এমন ক্রান্তিকালে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে সরকারের বিচক্ষণতাই কাম্য। যে বিচক্ষণতা দেশবাসী ও বাংলাদেশী প্রবাসীদের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে। নয়তো ভয়াবহ ধস নেমে আসবে রেমিট্যান্সসহ দেশের অর্থনীতিতে।