আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতালে যাচ্ছেন না অনেক চিকিৎসক ও স্টাফ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসক-স্টাফরা আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে গেছেন। এতে হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে চিকিৎসাসেবা প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে ফিরে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক ও স্টাফদের জন্য কর্মস্থল নিরাপদ করতে সরকারের মনোযোগ কাম্য। চিকিৎসার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমানে এ বিষয়ে জোর দিতে হবে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভঙ্গুর। প্রায় ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় মানুষ নিজের পকেট থেকে মেটায়। এ খাতে একদিকে বাজেট বরাদ্দ অপ্রতুল, অন্যদিকে রয়েছে প্রশাসনিক সুশাসনের অভাব, নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, চিকিৎসকদের মূল্যবোধের অভাব, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অতিরিক্ত অর্থ নেয়া প্রভৃতি। এমন নানা অসংগতি খাতটিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে, বিশেষত গত ১৫ বছরে। কার্যত সে কারণেই তৎকালীন সরকার পতনের পর ওই দলের সঙ্গে সম্পৃক্তরা আত্মগোপনে চলে যান।
সরকার পতনের পর পরই বণিক বার্তা সরজমিন তথ্যের ভিত্তিতে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল রাজধানীর অন্তত ১০টি বিশেষায়িত সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ও সহযোগী চিকিৎসকরা লাপাত্তা রয়েছেন। ফলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত অস্ত্রোপচারেও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। আবার অন্য অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে গেলেও ভিন্ন ধারা রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মী দ্বারা হেনস্তার শিকার হয়ে ফিরে যান।
সম্প্রতি বণিক বার্তার আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিলেট বিভাগের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরও একই অবস্থা। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর চিকিৎসক ও স্টাফদের অনেকেই চলে গেছেন আত্মগোপনে। কেউ আবার নিরাপত্তাহীনতায় আসছেন না কাজে, যার প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, জনবল সংকট থাকলেও রোগীর বাড়তি চাপ নিয়েই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে প্রশাসনিক জটিলতা, সীমিত লোকবলের কারণে ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনাসহ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রমে। কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়নি এখনো।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অবহেলার কারণে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ উঠলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নিউরোসার্জারি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে চিকিৎসকদের মারধর করেন এবং ভাংচুর চালান। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকরাও কমপ্লিট শাটডাউন ডেকে কর্মবিরতিতে চলে যান। সে সময় চিকিৎসকদের এ কর্মসূচির কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি সেবা নিতে গিয়েও অনেকে ফিরে গেছে।
অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা বিরাজমান। পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, বরং তা আরো ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। কোন চিকিৎসক কোন রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী বা কোন দলের সঙ্গে জড়িত, চিকিৎসা ক্ষেত্রে তা প্রাধান্য পাওয়া উচিত নয়। দল-মত নির্বিশেষে সব চিকিৎসক ও স্টাফকে সুরক্ষা দিতে সরকারকে বদ্ধপরিকর হতে হবে। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে তা যাচাই সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমনিতে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই।
দেশে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে জনবলের সংকট সর্বদাই একটি বড় বাধা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)তথ্যানুসারে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের জন্য প্রতি এক লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ৪৪৫ চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ থাকা দরকার। কিন্তু দেশে প্রতি লাখ মানুষের সেবায় আছেন মাত্র ১২৭ চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ।
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্যমতে, দেশে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার। বিশ্লেষকদের মতে, এ সংখ্যা বাস্তবে আরো কম। কারণ অনেক চিকিৎসক সেবায় যুক্ত নন, অনেকে অবসর নিয়েছেন, আবার অনেকে বিদেশে রয়েছেন। যার কারণে অনেক মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার সেবা পেলেও মানসম্মত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের এ বেহাল দশার মধ্যে যদি বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে চিকিৎসক ও স্টাফরা হাসপাতালে না যান, তবে চিকিৎসা না পেয়ে ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে।
এক্ষেত্রে চিকিৎসকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে আত্মগোপনে থাকা কোনো সমাধান নয়। কীভাবে কার্যকর সমাধান করা যায় সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসা জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের সংস্কারকেন্দ্রিক প্রত্যাশা অনেক। সংস্কার নিঃসন্দেহে একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে অগ্রাধিকার দিয়ে হাসপাতালের জনবল সংকট দূর করা আবশ্যক। এ খাতে চলমান অস্থিরতা দূরীকরণে দৃশ্যমান উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। যারা গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক কারণে বৈষম্য ও পদবঞ্চিত হয়েছেন তাদের অভিযোগও আমলে নিতে হবে। সরকারকে তাদের আশ্বস্ত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সংযত হতে প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে। সেজন্য আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য সরকার নতুন একটি কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে বলে গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। প্রত্যাশা থাকবে, স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এ কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ হবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের অধিকাংশ সমস্যা দূর হবে এবং জনগণের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হবে।










