ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। শুরুতে ছিলাম দেশের বাইরে, ফিরলাম ১৫ জুলাই। তার পরই আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। কীভাবে তা হলো তার একটি সারসংক্ষেপ দেয়া দরকার। আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। তখনই সরকার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা কোটা ঘোষণা করেছিল। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার সময়। ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছিল। ছাত্রলীগও পাল্টা প্রতিবাদ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ হোসেন তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। ১৪ জুলাই ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। তখনো ভাংচুর হয় সরকারি সম্পত্তি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে আমাদের কাছে ছবি রয়েছে, যারা ভাংচুরের সঙ্গে জড়িত তাদের নাম পিএসসিতে দেয়া হবে তারা যেন আর কখনো কোনো সরকারি চাকরি না পায়। আন্দোলনটির শুরু করেছিল জামায়াতে ইসলামী। ঘটনার সমাপ্তি ঘটিয়েছিল অন্য একটি ঘটনায়। জামায়াতের বহু নেতাকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। তাই সাধারণ ছাত্রদের দাবির মেধা মূল্যায়ন মঞ্চ শিগগিরই রূপ নিয়েছিল শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চে। সেটাও ছিল জুলাই মাস।
এরপর আবার ২০১৮ সালে আন্দোলন হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আন্দোলনকারীদের তালেবান ও বোকো হারাম দলের মতো বলে তিরস্কার করেছিলেন। তখন ২ জুলাই তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। উদ্বিগ্ন অভিভাবকের ব্যানারে শিক্ষক ও অভিভাবকরা রাস্তায় এসে দাঁড়ালে প্রধানমন্ত্রী পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে কারো কোটা থাকবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছিল যে রাগে-দুঃখে তিনি বাতিল করেছিলেন। তবে ছাত্রদের বাগে আনাটাই ছিল প্রধান কাজ। পরিপত্রও জারি হলো। তিন বছর পর ২০২১ সালে রিট করেন অহিদুল ইসলাম এবং অন্যরা। গত ৫ জুন হাইকোর্ট সেই ২০১৮ সালের পরিপত্রটি বাতিল করেন। বলা বাহুল্য, সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে একজন ডেপুটি ও কয়েকজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এ নিয়ে লড়েছিলেন। সরকারের প্রধান আইন পরামর্শক বা অ্যাটর্নি জেনারেল তাতে কোর্টে আর্জি পেশ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেননি। এর পরের ঘটনা আমাদের অজানা নয়।
১৬ জুলাই আবু সাঈদ গুলিতে নিহত হন। পুরো ঘটনাটি নেট দুনিয়ায় এখনো দেখতে পাবেন। আমিও দেখেছি। অবাক হয়েছি। রাগান্বিত হয়েছি। দুঃখ পেয়েছি। পরবর্তী দুটো দিন চোখের সামনেই সাঈদের গুলি খেয়ে বসে পড়া ও তাকে বন্ধুদের তুলে নেয়ার দৃশ্য ভাসছিল। ১৮ তারিখ সরকারের একদল ইঞ্জিনিয়ারের একটি প্রশিক্ষণে আমার লেকচার দেয়ার কথা ছিল। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আগেই বলেছিলেন অনলাইনে লেকচারটি দেয়ার জন্য। মন খারাপ থাকায় ১৮ তারিখ শেষ মুহূর্তে তাকে জানালাম আমার পক্ষে এ মুহূর্তে লেকচার দেয়া সম্ভব নয়। তিনি বললেন, স্যার, সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। একটু আসুন। গুগল মিট দিয়ে যখন ক্লাসে গেলাম তখনো আমার মন ভালো ছিল না। প্রশিক্ষণার্থীদের বলে নিলাম মন ভালো নেই—মৃত্যুটি মর্মান্তিক। আন্দোলন টিভিতে দেখছি। পুলিশের মারমুখো মূর্তি কাম্য নয়। আমি পড়াতে চাচ্ছি না, তবু যেহেতু কথা দিয়েছি তাই এসেছি। পরবর্তী ১ মিনিটেই মনে হলো, আমার অনলাইনের ক্লাসটি যেন এক কবরস্থান। নিঃশব্দ। নীরব শ্রোতা। এরা সবাই সরকারি কর্মকর্তা। গত এক বছরে চাকরিতে এসেছে। বললাম আমার মন ভালো নেই, এখন আপনারাও যদি কথা না বলে নিশ্চুপ থাকেন তবে আমার পক্ষে ক্লাস করা সম্ভব হবে না। আমার কথায় নীরবতা ভাঙল। শুনতে পেলাম কান্নার শব্দ। তাদের কয়েকজন বলে উঠলেন আমাদেরও ক্লাস করতে ইচ্ছা হচ্ছে না স্যার। অন্য যেকোনো দিন ক্লাস করতে রাজি আছি; আজ নয়। যারা আন্দোলন করছে এদের অনেককেই আমরা চিনি। আমাদেরই হলের ছোট ভাই। তাদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে তা সহ্য হচ্ছে না। প্রশিক্ষণের ইতি টানলাম। ঘটনাটি বললাম এ কারণে যে সাঈদের মৃত্যু আমাদের মতো শিক্ষককে নয়, গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদেরও। অনেকের ধারণা, গুটি কয়েক দল এর সঙ্গে জড়িত। নিশ্চয় তা নয়। আমার অনেক আওয়ামী বন্ধুও পুরোটা মানতে পারছেন না। অনেক পেশাজীবী এখন সরব। সরকারের দলের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। দলীয় কার্যালয়ে স্বয়ং সাধারণ সম্পাদক অপদস্থ হয়েছেন। এক সাবেক মন্ত্রীর ছেলে বাবার কথা না ভেবে বিবেকের তাড়নায় সরব হয়েছে, স্ট্যাটাস দিয়েছে নেট দুনিয়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শেষ পর্যন্ত চুপ থাকতে পারেননি। মহিলা শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন প্রকাশ্যে জনতার সামনে। এক ছাত্রী বাঘের মতে গর্জে উঠে রুখে দাঁড়িয়েছে, পুলিশের গাড়ির সামনে। খালি হাতে। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও সে মৃত্যু চিন্তায় বিচলিত হয়নি। পুলিশ শেষ পর্যন্ত নীরবে হার মেনেছে, হয়তো বা তার নিজেরই বিবেকের কাছে! তারও হয়তো এমন একটি বোন রয়েছে। আমার অফিসে এক কর্মচারী বাসায় এসে দেখেন তার কলেজপড়ুয়া মেয়ে বাসায় নেই। সেও গেছে প্রতিবাদে।
কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে—অন্য একদল সরব। দুঃখে হৃদয় ভারাক্রান্ত। নিজের জন্য নয়; নিজের সম্পত্তির জন্য নয়; নিজের সন্তানের জন্যও নয়। চোখের সামনে টিভিতে দেখা সাঈদ বা অন্য কোনো সন্তানের মৃত্যুতেও নয়। দেশের অর্থনীতির বিশাল ক্ষতির কারণে তারা ভারাক্রান্ত। এর কারণও হয়তোবা রয়েছে। গত এক দশকে শূন্য হতে চার-পাঁচশ বা হাজার কোটি টাকার মালিক যারা হয়েছেন, যাদের দেশের বাইরে দ্বিতীয় বাড়ি রয়েছে, যাদের স্ত্রী-সন্তানরা আগেই পাড়ি দিয়েছেন বিদেশে তাদেরই যত মায়াকান্না। এ দেশের মানুষের কাছে এগুলো লুকানো সম্ভব নয়। নেট দুনিয়া বন্ধ করলেও সবাই জানে ও বোঝে। যখন ইন্টারনেট ছিল না তখন কি আন্দোলন হয়নি?
এরই মাঝে সত্তরোর্ধ্ব এক বিচারপতিকে (অবসরপ্রাপ্ত) দেখলাম টিভিতে। তিনি পারলে এক উপস্থাপিকাকে গিলেই ফেলেন! যে কোমলমতি ছাত্রীটি অবিচলিতভাবে পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল তার চেয়ে চার গুণ বয়সের এ বৃদ্ধের এমন আচরণ আমাদের কী শিক্ষা দেয় বিচার বিভাগ সম্পর্কে। বিচারকদের শুনেছি প্রশিক্ষণটাই ভিন্ন। রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে তারা কখনো বিচারকার্য সম্পাদন করেন না। বিব্রত বোধ করেন। এই একই ব্যক্তি সাঈদের হাতেও ‘অস্ত্র’ দেখতে পেয়েছিলেন। উপস্থাপিকাকে ভর্ৎসনা করছিলেন তা না বোঝার জন্য। উপস্থাপিকার প্রশ্নের উত্তরে বললেন কেন লাঠি! স্পষ্ট দেখেছি তার হাতে লাঠি ছিল। তার এমন সরলীকরণে মনে হলো, সত্যিই লাঠি দিয়েও মানুষকে আহত বা নিহত করা যায়। নখ দিয়েও কিন্তু আহত করা যায়। দাঁত দিয়েও করা যায়। এমনকি মুখের বাক্যবাণ দিয়েও কিন্তু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা যায়। তবে কি আমরা সবাই মানুষ নাকি অস্ত্র? ধরণি দ্বিধা হোক। সাঈদকে তো গুলি করা হয়নি তার মতানুসারে একটি অস্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে মাত্র।
যা-ই হোক, আমি রাজনীতিবিদ নই। বহুদিন আগে যখন ছাত্র ছিলাম তখন প্রেসিডেন্ট এরশাদ মাত্র ক্ষমতায় এসেছেন। সম্ভবত এক পুলিশের ট্রাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মিছিলের ওপর উঠে গিয়েছিল। সরকারি ভাষ্যে তা ছিল একটি দুর্ঘটনা। পুলিশি ব্যাখ্যা ছিল নিছক ব্রেক ফেল! (অনেকটা গায়েবি গুলিতে সাঈদকে হত্যা করার মতো) কিন্তু ছাত্রদের সেই ক্রোধ থামেনি। সেই সময়ে একবার এবারের মতোই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছিলেন দেশের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং এরশাদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাত ৯টায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল। দুই মাস পর প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিশ্ববিদ্যালয় খোলার জন্য রাজি হয়েছিলেন। আবারো এক রাত্রের ঘোষণায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট খুলে দিলেন। দেশে তখন এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। বাকি ছিল কেবল চারটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। তবুও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলতে ভয় পাচ্ছিলেন। তাই তিনি তার চাটুকারদের প্ররোচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নোটিস দিলেন। ভাবলেন শহরের বাইরে হাটহাজারীতে স্থাপিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কিছু বলবে না। কিন্তু বাদ সাধলেন শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বললেন, বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে হলে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ডাকঘর মার্কা নোটিসে বিশ্ববিদ্যালয় খোলে না, বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আইনগত অধিকার রয়েছে কেবল সিন্ডিকেটের। আমি তখন ছাত্র। সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের এমন মনোভাব আমাদের মনে অহংকার এনেছিল। এরাই আমাদের শিক্ষক! আমরা তাদের গর্বিত ছাত্র। উপাচার্য সিন্ডিকেট সভা ডাকলেন। সিন্ডিকেটের শিক্ষক সদস্যরা (অন্য অনেক সদস্যই ছিলেন যারা ছিলেন মূলত সরকারি চামচা) জানতে চাইলেন, কবে সিন্ডিকেটের কোন ঘোষণায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছিল? উপাচার্যের কাছে সেই তথ্য নেই। তিনি জানালেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে। সিন্ডিকেট নয়।
শিক্ষকরা বললেন, তাহলে তো বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খোলার প্রশ্নই আসে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ঘোষণা দিয়েছে তাতেই হয়। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ঘোষণায় বন্ধ হয়েছে, এখন তাদের ঘোষণায় খুলেছে। সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্তের যুক্তি নেই। উপাচার্য কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার ওপর সরকারি চাপ। পরদিন তিনি জানালেন, যেহেতু সরকারি সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছিল তাই এখন তাদেরই সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা আছে। ছাত্ররা হলে থাকবে। ক্লাস চলবে। অর্থনীতির অধ্যাপক মইনুল ইসলাম, রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক আফতাব আহমেদসহ অনেকেই তখন চট্টগ্রামে আমাদের বিজ্ঞ শিক্ষক। সবাই ডাকলেন শিক্ষক সমিতির সভা। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে, তাই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে শিক্ষকরা ক্লাসে যাবেন না। এরশাদ গোসা করলেন। এখনো মনে আছে, তিনি খুলনায় এক জনসভায় অভিযোগ আনলেন যে, এ দেশে আরো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে যার নাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বলা বাহুল্য, শিক্ষকরা ছাত্রদের জীবনের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত আরো দেড় মাস পর ক্লাসে যেতে রাজি হলেন।
যাক সে কথা। এরশাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক-ছাত্রদের সম্মিলিত রোষানল সহজে থামেনি। নয় বছর পর এরশাদের পতনে তার যবনিকা হয়েছিল। তখনকার রাজনীতিবিদরা নরমে গরমে কাটিয়েছিলেন বহুদিন। কেউ কেউ এরশাদের সঙ্গে বেড়াতে গেছেন। কবিতা লিখেছিলেন। নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু সেই যে ট্রাক উঠেছিল ছাত্রদের মিছিলে, সেই ক্রোধ থামেনি। আমরা কিন্তু পাস করে গিয়েছিলাম। এরশাদ দেশের উন্নয়নের প্রথম সোপানটি তৈরি করেছিলেন। গ্রামকে আলোকিত করেছিলেন। যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। ফ্যাক্স (তখনকার ডিজিটাল রূপ) চালু করেছিলেন উপজেলা পর্যন্ত। পল্লীবন্ধু হয়েছিলেন। তাতেও কিছু হয়নি। তার রাজনৈতিক সান্নিধ্যে যারাই এসেছিলেন তারাও কোটিপতি বনে গিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য মিল!!
ছাত্রদের আন্দোলন থামাতে বর্তমান সরকারের সাফল্য অনেক। পুলিশের সশস্ত্র প্রহরায় হেলমেট বাহিনীর গুলির বহু উদাহরণ রয়েছে। সবক্ষেত্রেই সরকারের জয় হয়েছে। তবে তাতে লাভ হয়েছে হেলমেট বাহিনীরই। প্রধানমন্ত্রীর নয়। তাকে বোঝানো হয়েছে এ যাত্রায় রক্ষা পেলেন! আমরা ছিলাম বলে। পেটুয়া বাহিনী তাই ক্রমাগত ফুলেফেঁপে মোটা হয়েছে। এমনকি তার সামান্য ‘পিয়ন’ও ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার পেশাদার বাহিনীর প্রধান দেশটা প্রায় কিনেই ফেলেছিলেন! সরকারের কোষাগার খালি অথচ তার পাহারাদারের পকেট ভর্তি। (গত কয়েকদিন আগে এ ডামাডোলের মাঝে তিনি কিন্তু নীরবে স্বেচ্ছা অবসরে গেছেন!!!) তার দলীয় চাটুকাররা এখন নিজেদের রক্ষার্থে বাহিনী পুষছেন। বাহিনী রক্ষায় প্রয়োজন মোটা অংকের অর্থ। প্রয়োজন মেগা প্রজেক্ট। প্রয়োজন ভাংচুর। কারণ ভাংচুর স্থবির অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ভেঙে ফেলুন মেট্রো! দেখবেন নতুন কন্ট্রাক্ট আসবে। পুড়িয়ে ফেলুন সরকারি ভবন—শত শত কোটি টাকার ফিরিস্তি শুনবেন। সবই কিন্তু পুনরায় ঠিক করতে হবে। প্রতিটি কন্ট্রাক্ট জন্ম দেবে আরো অনেক কোটিপতির। অতএব অর্থনীতির মেগা ক্ষতি হবে না। তবে এতসবের মাঝে সরকারপ্রধান কিন্তু নিজের জন্য কিছু করেননি। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এখনো শুনিনি। অথচ দেখুন তাকে দেখিয়ে, তাকে কাঁদিয়ে বাকি সবাই কোটিপতি, শিল্পপতি, ব্যাংকপতি, রিসোর্টপতি, খামারপতি, এমনকি ছাগলপতিও হয়েছেন! খেসারত কিন্তু একজনকেই দিতে হবে। বাকিরা লাপাত্তা লেডিসের মতোই সাময়িক অনুপস্থিত। অনেক মন্ত্রী কয়েক দিনে দেশ ছেড়েছেন। বিদেশে হাসপাতালে রয়েছেন বলে রটনা তৈরি করেছেন। ঢাকার বহু এমপিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ মাথা নেড়েছেন। তসবি ধরেছেন। বাজে বকেছেন। তিলকে তাল করেছেন। সত্যকে মিথ্যা বলেছেন। মিথ্যাকেও মিথ্যা বলেছেন। যা বলেছিলেন তার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বলেছেন বলিনি। নিজেই নিজেকে বিব্রত করেছেন। তাতে তারা অপমানিত হয়েছেন বলে মনে হয়নি। তাদের মূল উদ্দেশ্য নিজের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রক্ষা করা। কথায় বলে, নিজে বাঁচলে তবে তো বাপের নাম! এ সবকিছুই সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্রমাগত নিম্নগামী করেছে। সরকার ক্রমাগত কূল হারাচ্ছে। নিজের দলের কর্মীরাই নেতাদের শিষ দিয়েছে। সাধারণের কথা না-ই বললাম। দলীয় কর্মীরা নেতাদের বলছে, গাছেরটা খাবেন আবার তলারটাও খাবেন তা হবে না। তবে হ্যাঁ, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছিলেন কয়েকজন তরুণ মন্ত্রী। তাদের স্যালুট। তারা অন্তত দুর্নীতিগ্রস্ত নন বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। তাদের আনুগত্য সম্পদে নয়, অন্য কোথাও।
প্রশ্ন উঠেছে, এতসবের পর দেশের কী হবে? অর্থনীতি টিকবে তো? প্রাথমিকভাবে বলি, ধ্বংসযজ্ঞ নতুন কোটিপতি তৈরি করবে। অনেকেই বসে আছেন কবে সরকার নতুন টেন্ডার দেবে। তাই দেখবেন এ খেলায় তাদের উৎসাহ বেশি। আহত-নিহতদের হিসাব না করে গুনছেন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও বাদ নেই। তারা আহতদের চিকিৎসার জন্য কোনো বরাদ্দ চাননি। নিহতদের পরিবারের জন্য কোনো কিছু চাননি। চেয়েছেন ধ্বংসযজ্ঞের জন্য। তাই দেখবেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাঝেও তৃতীয় কিংবা চতুর্থ পক্ষের উৎসাহ থাকে। ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালে ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স আন্দোলনের সময় প্রচুর লুটতরাজ হয়েছিল। তাতে তাদের নেতারা কি বলেছিলেন যে, আন্দোলনে মাছি এসেছে, তাই আন্দোলন বন্ধ করো? অনেকগুলো ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও এখন দেখতে পাওয়া যাবে যাদের কোনো অবস্থাতেই ছাত্র, অভিভাবক কিংবা রাজনৈতিক কর্মীও মনে হবে না। এরা অপরাধী কিংবা ভাড়াটে অপরাধী। তারাই অনেকগুলো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িত। কী তাদের স্বার্থ? শুধুই কি সরকার হটাও? ধ্বংসযজ্ঞ করে কি সরকার হটানো যায়? এরশাদ কি ধ্বংসযজ্ঞের কারণে হটেছিলেন? নাকি জনরোষ এড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন?
একটি কথা অনেকে বলেছেন, রেমিট্যান্স শাটডাউন কি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে? প্রথম কথা হলো, তা বন্ধ করা কি আদৌ সম্ভব হবে? আমার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ। প্রথমত, যারা দেশে রেমিট্যান্স পাঠান তারা আমাদের ধনিক শ্রেণী নন। তারা নিতান্ত খেটে খাওয়া মানুষ। ধার করে, জমি বন্ধক রেখে তারা গেছেন বিদেশে। তাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এ সময়ে তারা যদি দেশে টাকা না পাঠান তাহলে কি চলবে? চলবে না। মা অপেক্ষা করছে, ভাই অপেক্ষা করছে, বোনের বিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা যদি ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে ডলার না পাঠান তবে কীভাবে পাঠাবেন? তারা পাঠাবেন হুন্ডির মাধ্যমে। তাতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারে টান পড়বে। ডলারের মূল্য বাড়বে। দেশে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। বিদেশ থেকে আরো বেশি টাকা পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। বিদেশে অবস্থানরত অনেকেই এ চাপ উপেক্ষা করতে পারবেন না। কী হবে? তারা আরো বেশি অংক হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাবেন। বলতে পারেন কারা এ হুন্ডিজীবী? এদের অনেককেই আমরা চিনি। এরা বিদেশে বসে ডলার নিজের পকেটে রেখে দেশে তাদের এজেন্টের মাধ্যমে টাকা পৌঁছে দেবে। বলতে পারেন এত টাকা তারা কোত্থেকে সংগ্রহ করবে? প্রথমত, নিজেদের সঞ্চয় থেকে কিছুটা করবে, দ্বিতীয়ত, ব্যবসা থেকে কিছু করবে, ব্যবসায় লোকসান দেখাবে, তাতে ট্যাক্স থেকে রেহাই পাবে। তৃতীয়ত, তাদের অনেকেই ব্যাংকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট দিয়ে ঋণ করবে। কেউ কেউ হয়তোবা ব্যাংকের মালিক! এবং এ ঋণের অর্থ দিয়ে হুন্ডির দেনা শোধ করে তারা দেশ ছেড়ে পালাবে। যে ব্যাংক তাকে ঋণ দিয়েছিল সেই ব্যাংকে যদি আপনার অর্থ জমা থাকে তবে হয়তোবা একদিন ব্যাংক বলবে, ‘আমি দুঃখিত আপনার জমা ফেরত দিতে পারব না।’ আরো একটু ভাবুন, যিনি ডলারটি নিয়েছিলেন তিনি কে? উত্তর পেয়ে যাবেন। অতএব অর্থনীতির ওপর সাময়িক চাপ বাড়বে সত্যি, তবে শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনে আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি হবে। যাদের শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন তারা কিন্তু সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক বা দুবাইতে বসে আপনার ডলার দিয়েই আয়েসে জীবন যাপন করবে। বিশ্বের বিলিয়নেয়ারদের তালিকায় তাদের নামও দেখতে পাবেন হয়তোবা!
ইইউ বর্তমানে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব চুক্তির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। তাতে দেশে বিনিয়োগে মন্দা দেখা দেবে। আমার নিজের অভিমত একটু ভিন্ন। প্রথমত, ইইউ আমাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব চুক্তি কেন করছে? তাদের উন্নয়নের জন্য নাকি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য? বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক ইউরোপ পাড়ি দিচ্ছে। তাতে তাদের দেশে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। বাড়ছে বর্ণবিদ্বেষ। বাড়ছে সহিংসতা। ফলে তাদের বর্তমান সাম্যবাদী/প্রগতিশীল সরকারগুলো কিছুটা বিপদে রয়েছে। তারা বুঝতে পারছে, বাংলাদেশের মতো দেশে কর্মসংস্থান না বাড়ালে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি। তাই তারা এই চুক্তির অবতারণা করেছে। অতএব শেষ পর্যন্ত তারা এ চুক্তি করবেই। আপাতত কিছুটা স্থিতাবস্থায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, ইইউ যদি এ চুক্তি সম্পাদন করতে বিলম্ব করে তবে চীন কিংবা রাশিয়া সমজাতীয় চুক্তি তৈরি করবে। তাতে ইউরোপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের উচ্ছিষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করার শ্রেষ্ঠ দেশ হলো সেসব দেশ যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি। বাংলাদেশ তার অন্যতম। তৃতীয়ত, চীন বা রাশিয়া কোনো চুক্তি করে ফেললে বাংলাদেশ পশ্চিমা বলয় থেকে বেরিয়ে যাবে। এর ফলে পশ্চিমা অর্থনীতি সংকুচিত হবে। দেখুন আর্জেন্টিনায় এখন রক্ষণশীল সরকার, যার প্রধান নির্বাচনী লক্ষ্যমাত্রা ছিল চীনের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করা। এক বছর যেতে না যেতেই তারা অনুধাবন করেছে যে তাদের পক্ষে তা করা সম্ভব হবে না। এটাই আন্তর্জাতিক চুক্তির চাবিকাঠি। অতএব ইইউ যদি এক বছরের বেশি এ চুক্তির সময় বিলম্ব করে তবে শেষ পর্যন্ত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে আগামী বছরটি হবে সরকারের জন্য একটি কঠিন সময়। এ সময়ে সরকার যদি জনদরদি হয়, প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয় কিংবা সহনশীল হয় তবে বিষয়টি নিয়ে বেশি ভাবতে হবে না। তা না হলে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, ছাত্রদের কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যেমন জড়িত হয়েছে রাজনৈতিক দল, সরকারি দল, দুর্বৃত্তকারী, তার চেয়ে বেশি জড়িত হয়েছে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, কুশলী, এমনকি সরকারি দলে স্থান না পাওয়া অনেকে। কারণ তারা অর্থনৈতিক চাপে দিশাহারা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক চাপ আরো তীব্রতর হলে সরকার জনরোষ এড়াতে পারবে না। তাই অর্থনৈতিক চাপ এড়াতে সরকারকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে হবে।
ড. এ কে এনামুল হক: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি










