চিনির দামের ওঠানামা গত কয়েক দশকের বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ হিসেবে হাজির। হঠাৎ করেই বেড়ে যায় চিনির দাম, কখনো বাজার ঘুরেও মেলে না এক কেজি চিনি। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলো উৎপাদন বাড়ানো তো দূরের কথা, স্থায়ীভাবে বন্ধের দিকে এগোচ্ছে। এতে ভোক্তামহলে চাপ এবং বাজারে সিন্ডিকেটের আধিপত্য বাড়ছে। বাজারে চিনির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতে চিনিকলগুলোকে আরো সচল ও সক্রিয় করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুগারবিটের মতো বিকল্প উৎসে জোর দেয়া উচিত। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে চিনির সরবরাহ বাড়লে বাজারে অস্থিরতা যেমন কাটবে, তেমনি আমরা দেশের চাহিদা পূরণ করে হয়তো একসময় বিদেশে রফতানিও করতে পারি।
গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনির প্রধান উৎস আখ থেকে দেশে ধারাবাহিক কমছে চিনি উৎপাদন। অন্যদিকে সুগারবিট গবেষণায় সুফল মিললেও সম্প্রসারণ হয়নি এ কৃষিপণ্য থেকে চিনি উৎপাদন কার্যক্রম। এটা আমাদের পলিসিগত দৈন্যকেই তুলে ধরে। মার্কেট ইনসাইডারের বরাতে জানা গেছে, গত এপ্রিলে অপরিশোধিত চিনির বৈশ্বিক দাম এক দশকের সর্বোচ্চে উঠে এসেছে। শীর্ষ দেশগুলো থেকে সরবরাহ কমার আশঙ্কায় বাজারদরে এমন উল্লম্ফন দেখা গেছে। বিশ্বের শীর্ষ চিনি উৎপাদক ভারত তখন রফতানি না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এমন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রোজার আগে থেকেই যেখানে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল সেখানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নীরবতায় দেশের বাজারে নিত্যপণ্যটির দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
আখ ও সুগারবিট চিনি উৎপাদনের প্রধান দুই কাঁচামাল হলেও আমাদের দেশে চিনি উৎপাদন হয় কেবল আখ থেকে। তবে কাঁচামাল সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন লোকসান গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো। ফলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ১৫ কলের ছয়টির কার্যক্রম। বিকল্প হিসেবে তাই ২০১১-১২ অর্থবছরে সুগারবিট চাষাবাদ প্রযুক্তি উন্নয়নে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় দেশের বেশ ক’টি চিনিকলের নিজস্ব জমিতে চাষ করা হয় অনেকটা মুলা গাছের মতো দেখতে এ ফসলটি। গবেষণায় এর সুফলও মেলে। তবে এক দশকেও এর সম্প্রসারণে কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। দায়িত্বশীলরা বলছেন, চিনিকলগুলোয় সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের যন্ত্র না থাকায় এটি আর এগোয়নি।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, সুগারবিট শীতপ্রধান দেশের ফসল হলেও বর্তমানে এর উদ্ভাবিত জাতগুলো উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলেও চাষ করা হয়। সুগারবিট উৎপাদনে শীর্ষ দেশ রাশিয়া। এছাড়া ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, তুরস্ক, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, মিসর, চীন ও যুক্তরাজ্যেও প্রচুর পরিমাণে সুগারবিট চাষ করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৩০-৩৫ ভাগ চিনি সুগারবিট থেকে উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশেও এ ফসল চাষের কার্যকারিতা দেখতে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) দেশের ১২টি সুগারমিল এবং লবণাক্ত এলাকা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে গবেষণা চালায়। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের গবেষণায় দেখা যায়, সুগারবিট এ দেশের আবহাওয়ায় পাঁচ-ছয় মাসের ফসল। মূলত শীতকালে এ ফসল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন পাওয়া যায় ৭০-৮০ টন, যেখানে চিনির হার ১৪-১৮ শতাংশ। গবেষকরা জানান, সুগারবিট থেকে চিনি ছাড়াও এর পাতা, বিটপাল্প ও মোলাসেস পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। আবার পাতা-ডগা থেকে গ্যাস ও সার উৎপাদন সম্ভব। ফলে চিনির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পশুখাদ্য, জ্বালানি ও সারের চাহিদা মেটানোও সম্ভব এ ফসল থেকে। তবে দেশে চিনিকলগুলোয় সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় চিনি সংগ্রহ সম্ভব নয়। এ কারণে দীর্ঘদিন গবেষণা চললেও সুগারবিটের সম্প্রসারণ করা যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া না হলে দীর্ঘদিনের গবেষণা পুরোটাই বিফলে যাবে। আবার লোকসানে থাকা চিনিকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হলেও কোনো এক অজানা কারণে বিএসএফআইসি থেকে সুগারবিট উপযোগী যন্ত্র প্রতিস্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
দেশে দিন দিনই কমছে আখের উৎপাদন। মাড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল পাচ্ছে না সরকারি চিনিকলগুলো। ফলে সক্ষমতার ১০ ভাগ চিনিও তারা উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো বছর তাই হাজার কোটি টাকাও লোকসান গুনতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৫টি চিনিকলের ছয়টির কার্যক্রম স্থগিত করেছে বিএসএফআইসি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির হিসাবে, দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। দেশের চিনিকলে বছরে উৎপাদন সক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ টন। ভারতের চিনি রফতানি বন্ধের ঘোষণা বড় আকারে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের চিনি খাতের জন্য অশনিসংকেত। গত মাসে প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধ নাগাদ চিনি রফতানির অনুমতি দেবে না ভারত। অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে আখ উৎপাদন কমতে পারে—এ আশঙ্কায় এমন সিদ্ধান্ত ভারত সরকারের। স্পষ্টত, চিনির দাম সামনের দিনগুলোয় কমার পরিবর্তে বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। ঈদুল আজহার আগে চিনির দাম কেজিতে ২৫ টাকা বাড়ানোর দাবির মাধ্যমে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন।
নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে শিগগিরই হয়তো আমরা রাতারাতি চিনিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব না, কিন্তু বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত এ পদক্ষেপ। বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত মিলে উৎপাদিত লাল চিনির ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের মতো চিনির দাম নিয়ন্ত্রণেও হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এ অবস্থায় সুগারক্রপ বা চিনিশস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়া দরকার। আখের পাশাপাশি সুগারবিট, তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেডিয়া, মধু, যষ্টিমধু প্রভৃতি চিনিফসল নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। সুগারবিট নিয়ে গবেষণা করায় সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু মাত্র ৬০ কোটি টাকা খরচ করে এখনো একটি মিল না হওয়া হতাশারই ব্যাপার। চিনি নিয়ে ভবিষ্যৎ সংকট আমলে নিয়ে বিকল্প উৎসে মনোযোগ বাড়বে এবং এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার হবে—এমন আশাবাদ সবার।










