করোনা মহামারীকালে দেশের শহুরে এলাকাগুলোয় নতুন দরিদ্রের আবির্ভাব ঘটেছে। রাজধানী ঢাকার দরিদ্রদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে করোনার মহামারীর ধাক্কায়। চাকরি ও ব্যবসা হারিয়ে এ পরিণতি বরণ করে তারা। পরে করোনার প্রকোপ কমে গেলেও তারা আর দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পারেনি। করোনার আগে তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও মহামারীর সময়ে নিচে নেমে আসে। সেই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ৩০ লাখ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের  (বিআইডিএস) গবেষণায় উঠে এসেছে, গত বছর ঢাকা শহরের মোট দারিদ্র্যের প্রায় ৫১ শতাংশই ছিল নতুন দরিদ্র। যারা মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে নিচে নেমে এসেছে। তবে গবেষণা প্রতিবেদন এটাও বলছে যে সামগ্রিক দারিদ্র্য কমেছে। এ দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আত্মকর্মসংস্থানের প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিআইডিএস দুইদিনব্যাপী বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের (বিআইডিএস রিসার্চ অ্যালমানাক-২০২৩) প্রথম দিনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। কিন্তু শহরে নতুন দরিদ্র শ্রেণীর বৃদ্ধি পাওয়া বেশ উদ্বিগ্নের বিষয়। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ যে দারিদ্র্য হারের কথা বলা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেক বা ৯ শতাংশের মতো নতুন দরিদ্র হয়েছে। এর আগে তারা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছিল। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৭ কোটি। তার ৯ শতাংশ, অর্থাৎ দেড় কোটির বেশি মানুষ মহামারীর ধাক্কায় অধঃপতিত হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারী না হলে দেশের দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশের আশপাশে নেমে আসতে পারত। এছাড়া বিআইডিএসের সমীক্ষায় দেখা গেছে, চরম দরিদ্র পরিবারের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী জানিয়েছে, মহামারী চলার সময় তাদের সন্তানদের শিক্ষা বন্ধ করতে হয়েছে, করোনাকালীন অনেক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে বিশেষ কর্মসূচি নেয়া এখন প্রয়োজন। শহরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা অল্প বিধায় এ জায়গায় বেশি নজর দিতে হবে।

ঢাকায় আত্মকর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে সার্বিক দারিদ্র্য হ্রাসের ব্যাপারে বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘আরবান পভার্টি ডায়নামিক ডিউরিং দ্য টাইম অব করোনা: এভিডেন্স ফ্রম আ প্যানেল স্টাডি অন দ্য ঢাকা সিটি’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২২ সালে দারিদ্র্য কমার অন্যতম কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি। করোনার শুরুর দিকে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ ছিল। তবে ২০২২ সালের শুরুতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এতে ঢাকা শহরে কমে দারিদ্র্যের হার। ২০১৯ ও ২০২২ সালের মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে চরম দরিদ্র পরিবারের অনুপাত কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিআইডিএস ২ হাজার ৪৬টি থানার ওপর জরিপ করে গবেষণাটি করেছে। তাতে দেখা যায়, করোনার আগে ২০১৯ সালে দরিদ্র মানুষের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। করোনার পর ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে অতিদরিদ্র মানুষের মধ্যে করোনার আগে আত্মকর্মসংস্থানের হার ছিল ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। করোনার পর বেড়ে ৩৩ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়ায়।

বিআইডিএসের গবেষণা জানায়, রাজধানী ঢাকার মোট জনগোষ্ঠী ৬২ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ কখনই দারিদ্র্যসীমার নিচে যায়নি। এছাড়া প্রায় ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশের মতো মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়েছে যারা দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে এসেছে নিজেদের আয় বাড়ানোর মাধ্যমে, ১০ দশমিক ৯০ শতাংশের মতো মানুষের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে এবং নতুন করে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে নেমে এসেছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ—এরাই আগে দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল। এদের নতুন দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এ গবেষণা জরিপে। অর্থাৎ নিম্নমধ্যবিত্তদের ওপর আমাদের নজর রাখা দরকার, এখানে দুর্বল জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা যেকোনো সময়ে দরিদ্র হয়ে যেতে পারে।

মূলত বাংলাদেশে অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার কমে এলেও দুঃখের বিষয় হলো, দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বেশ ফারাক রয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে যে হারে দারিদ্র্য কমছে, সেই হারে শহরে কমছে না যা বড় চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে শহরাঞ্চল উপেক্ষিত থাকছে। শহরে বসবাসকারী দরিদ্রদের মাত্র ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি সহায়তা পায়, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। করোনা মহামারীর পর শহরের যে নতুন দরিদ্র শ্রেণী তৈরি হয়েছে সেটা মাথায় রেখে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ বিআইডিএসের গবেষণা দেখাচ্ছে, যাদের কর্মসংস্থান বেড়েছে তাদের বেশির ভাগই আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ ভাঙার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মহামারীর পর সবার সেই অর্থনৈতিক অবস্থা নেই, তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকেও সরকারকে বিনিয়োগ ও কাজ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন নীতির সম্প্রসারণ প্রয়োজন। শহরের দারিদ্র্য কমাতে হলে অবিলম্বে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল উদ্দিষ্ট হচ্ছে টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলা। দারিদ্র্যের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা না গেলে যেকোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টা ব্যর্থতা হিসেবে ধরা দেবে। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল নাগাদ প্রতি বছর বৈশ্বিক দারিদ্র্যের মাত্রা কমেছে অর্ধেকেরও কম শতাংশ হারে। এ অবস্থায় এমনকি কভিড-১৯ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৫৩৭ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যেই অবস্থান করত, যা জাতিসংঘের দেয়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বিশেষ করে এসডিজি-১ শর্ত পূরণের ব্যর্থতা এনে দিত। নিম্ন আয়ের দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচের দিকে বসবাসকারীদের ৭৯ শতাংশই কখনো কোনো সামাজিক সহায়তা পায় না। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহায্যগুলো তাদের কাছেই পৌঁছে দিতে হবে। তাই শহরের নতুন শ্রেণীর দরিদ্রের জন্য সরকার ও তার অংশীজনদের অবশ্যই দারিদ্র্য বিমোচন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনে শহরের নতুন দরিদ্রদের দারিদ্র্যসীমার আওতা থেকে বের করা যেতে পারে। সরকারকে সে পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।