গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত বকেয়ার চক্রে আটকে আছে। দেনার পরিমাণও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এক্ষেত্রে ভুল নীতি গ্রহণ করার বিষয়টিই উঠে আসছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাশাপাশি বিদ্যুৎও বেশি দামে কিনে কম মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যে ভর্তুকি দেয়া হয়, সেটিও যথাসময়ে মিলছে না। ফলে দেনার যে উল্লম্ফন ঘটছে, সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ খাত দুটোয় এখন বকেয়ার পরিমাণ এরই মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশী-বিদেশী বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর পাওনার বড় একটি অংশ পরিশোধ করতে পারছে না বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিক্রীত বিদ্যুতের বিল না পাওয়ায় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) গ্যাস কোম্পানিগুলোর জ্বালানির মূল্য দিতে পারছে না বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো (আইপিপি)। এসব আইপিপির কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় পেট্রোবাংলা এলএনজি বিক্রেতা ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহকারী বিদেশী কোম্পানির (আইওসি) পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না।
সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যুৎ কিনছে বিপিডিবি। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও আমদানি করছে। আবার এ বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ডলারের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হচ্ছে। ফলে টাকার অবমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিপিডিবির বিদ্যুতের দাম বাবদ প্রদেয় অর্থের পরিমাণও বাড়ছে। বেশি দামে কেনা এ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কম মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট ঘাটতি বিপিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি হিসেবে পাওয়ার কথা থাকলেও অর্থ বিভাগ তা সময়মতো ছাড় করছে না। অর্থ ও ডলার সংকটের কারণে দেড় বছর ধরে আইপিপিগুলোকে বিপিডিবি বিদ্যুৎ বিলের পুরোটা পরিশোধ করতে পারছে না। দেনার পরিমাণও তাই ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
এ রকমই বকেয়ার দুষ্ট চক্রে আটকা পড়েছে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়ার এ চক্র তৈরির কারণ হিসেবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) একতরফা মূল্য নির্ধারণকে দায়ী করছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
পেট্রোবাংলার ক্ষেত্রে আইপিপি ও সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সার কারখানার কাছে আটকে থাকা বকেয়াই আর্থিক দুর্বলতার কারণ বলা হচ্ছে। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, দেনাদার প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই সামান্য অর্থ পরিশোধ করছে এবং তা ধীর প্রক্রিয়ায়। এ পরিস্থিতিতে বিল পরিশোধ করা হলে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এলএনজির আমদানি বিল পরিশোধ করতে না পারলে সরবরাহকারীরা বাকিতে এলএনজি দিতে অস্বীকার করলে আমাদের রফতানি শিল্প ধসে পড়বে। এছাড়া এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও সার কারখানাগুলোর কাছে বিপুল অংকের পাওনা আদায় ডলার সংকটের চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এ টাকা পাওয়া গেলে পেট্রোবাংলা সরবরাহকারীদের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এ অর্থ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সার কারখানাগুলোর বকেয়া অর্থ দ্রুত পেট্রোবাংলার হাতে আসা দরকার।
অন্যদিকে সরকারের হাতে নগদ অর্থের সংকট এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বকেয়া পরিস্থিতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাতগুলো থেকে পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকার নগদ অর্থের সংকটে ভুগছে। এজন্য গ্যাস ও বিদ্যুতে বকেয়ার চক্র থেকে বের হতে হলে সময়মতো বিপিডিবির ভর্তুকির অর্থছাড় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইপিপিগুলোর সঙ্গে বিপিডিবির ডলার রেট-সংক্রান্ত জটিলতাগুলো দূর করা প্রয়োজন। নাহলে এ চক্র থেকে শিগগিরই বেরিয়ে আসা যাবে না।
এদিকে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, বিপিডিবির কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়ার কারণে অনেক আইপিপি বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেকে ব্যাংকের ঋণখেলাপিও হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিকভাবে বকেয়ার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। সবকিছু বলা যায় স্থবির হয়ে রয়েছে। টাকা না পাওয়ায় আইপিপিগুলো তাদের উৎপাদন কার্যক্রম ঠিক রাখতে পারছে না। এছাড়া আইপিপিগুলো যেসব সরবরাহকারীর কাছ থেকে জ্বালানি কিনছে তাদের অর্থও পরিশোধ করতে পারছে না।
সময়মতো বিদ্যুতের বিল না পেয়ে গ্যাসভিত্তিক আইপিপিগুলো এখন পেট্রোবাংলার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সরবরাহকৃত গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না। একই পরিস্থিতি গ্যাসভিত্তিক সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর। এর সঙ্গে আবার সার কারখানাগুলোও এখন গ্যাস সরবরাহ বাবদ পেট্রোবাংলার পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। এদিকে পাওনা অর্থ হাতে না আসায় পেট্রোবাংলাও এলএনজি সরবরাহকারী ও আইওসিগুলোর কাছে দেনা বাবদ জমে যাওয়া অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এ রকম ভুল নীতির ফলে বকেয়ার বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য ভর্তুকির অর্থ সময়মতো ছাড় করা প্রয়োজন। অন্যদিকে ডলার সংকটের বিষয়েও সরকারের সঠিক পদক্ষেপ নেয়া উচিত। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বকেয়ার চক্র বেড়ে ওঠা কোনো ইতিবাচক লক্ষণ নয়। এতে সংস্থাগুলোর আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমরা প্রত্যাশা করব, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বকেয়া সমস্যার সমাধানে সঠিক নীতি অনুসরণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।










