পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে পণ্যের দামের এক ধরনের যোগসাজশ রয়েছে। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় যেহেতু উৎপাদনের মোট ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এদিকে দেশে সড়কে চাঁদাবাজি রীতিমতো সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসার পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদাবাজি যদি বন্ধ করা যায়, ব্যবসার ব্যয় খাতভেদে গড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা শাকসবজির মতো নিত্যপণ্যের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোয় সহায়ক হবে।
সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের মাধ্যমে পণ্যের দাম যে কমানো সম্ভব, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলি তা দৃশ্যমান করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কর্মবিরতিতে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাস্তায় ছিল না ট্রাফিক পুলিশ। তাদের অবর্তমানে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন শিক্ষার্থীরা। এতে একদিকে চাঁদাবাজি কমেছে, অন্যদিকে কমেছে পুলিশের হয়রানিও। যার প্রতিফলন বাজারে স্পষ্ট। স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে শাকসবজির বাজারে। সবজি বিক্রেতাদের ভাষ্য, বাজারে এখন কোনো সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি না থাকায় সবজির দাম অনেক কম। এর মধ্যেই তাদের লাভ হচ্ছে এবং ক্রেতারাও এতে খুশি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নিত্যপণ্যের দাম আরো অনেক কমে যাবে। সুতরাং দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া বিশেজ্ঞদের মতে, চাঁদাবাজি বন্ধ হলে কেবল পরিচালন ব্যয় ও দাম নয়, পণ্য পরিবহনের সময়ও কমে আসবে। মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিতে গিয়ে পণ্যবাহী যানকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না আর। যদিও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদাবাজি কমলে কোন খাতে কত শতাংশ ব্যয় কমবে তা হিসাব করা কঠিন। কারণ পণ্য ও দূরত্বভেদে চাঁদার হার ও পরিমাণ ভিন্ন হয়। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের লজিস্টিক খাতের ব্যয় খাতভেদে সাড়ে ৪ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়। প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে এ ব্যয় অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ যে সড়কে চাঁদাবাজি তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই।
দেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা রয়েছে। উৎস থেকে পণ্য পাইকারি বাজার পর্যন্ত আসতে বেশ কয়েকবার হাতবদল হয় এবং প্রতি হাতবদলের সঙ্গে বাড়তে থাকে পণ্যের দাম। এ পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক মানুষ যুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এমনকি প্রশাসনের লোকজন জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও নানা সময়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। উল্টো পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বাজারের প্রতিটি পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লাগামহীন হয়ে ওঠে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে দেখা যায়, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার দাম বেঁধে দিয়ে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নামিয়ে বাজারে অভিযান ও তদারকি বাড়িয়েও দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারেনি। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজির উৎপাত এখন অনেকটাই কমে এসেছে।
বর্তমান চিত্র এটিই নির্দেশ করছে যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে চাঁদাবাজি বন্ধ ও পুরনো সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ায় বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাচ্ছে। যদিও যে হারে দাম বেড়েছে, সে হারে দাম কমতে শুরু করেনি এখনো।
তবে আমরা আশাবাদী হতে চাই, নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ পরিস্থিতির ক্রমোন্নতিতে সক্ষম হবে। তারা বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া এবং সিন্ডিকেট ভেঙে ভোক্তাদের এর উপকারভোগী করা হবে। এছাড়া চাঁদাবাজি কমলে পরিবহন শ্রমিকরাও শান্তিতে গাড়ি চালাতে পারবেন।
খাদ্যপণ্যের দাম জীবনযাপনে বেশি প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনমতে, খাদ্যের বাড়তি দাম বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ পরিবারের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে যে অস্থিতিশীল অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে বজায় আছে, তা রাতারাতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ও বাজারদর সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখা অতি আবশ্যক। কেননা বাজার ব্যবস্থাপনার অতিগুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কমে গেলে বা সরবরাহ ব্যয় বাড়লে দাম বেড়ে যায়। অসাধু ও অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট কারসাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট যেন তৈরি করতে না পারে সেজন্য নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। প্রমাণসাপেক্ষে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিকল্প নেই। বিবিএসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২১ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছে, যার মধ্যে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা দশমিক ৮৩ শতাংশ।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের খাবার গ্রহণের তালিকাও এরই মধ্যে ছোট হয়ে এসেছে। জরুরি ভিত্তিতে তাই কিছু পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি। দ্রব্যমূল্যের তালিকা ও বিক্রয়মূল্য দোকানের সামনে টানিয়ে রাখতে বাধ্য করা যেতে পারে। যাতে ক্রেতারা সে অনুযায়ী পণ্য কিনতে পারে। ভোক্তাদেরও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে যেন তালিকায় উল্লিখিত দামের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কেউ পণ্য না কেনে। পাশাপাশি কোথাও এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখলে যেন তৎক্ষণাৎ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হয়। ভোক্তা যদি সচেতন না হয় তাহলে সেই সুযোগ ব্যবসায়ীরা নেবেই। সর্বস্তর থেকে তাদের রুখতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকর করা গেলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।










