বর্ষীয়ান রাষ্ট্র চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর। পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী বদরুদ্দীন উমর রাজনীতি ও গবেষণায় সম্পৃক্ত রয়েছেন ৫৩ বছর ধরে। দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে শতাধিক বই রয়েছে তার। সম্প্রতি ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ও দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণ-অভ্যুত্থানে সরকারপ্রধানের পরিণতি নিয়ে জানতে চাই।
বাংলাদেশে এরশাদ ও হাসিনার আমলে দুটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। এরশাদের আমলে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল সেখানে এরশাদ খুব সহজেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি সময়মতো পদত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। এছাড়া সে সময় এরশাদের বিরুদ্ধে জনগণের আক্রোশ তেমন ছিল না এখন হাসিনার বিরুদ্ধে যেমন। দেখা যাবে নব্বই সালে এরশাদের বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে সেখানে পাঁচটি সিটে এরশাদ দাঁড়িয়েছে এবং পাঁচটি সিটেই এরশাদ জিতেছে। এ গণ-অভ্যুত্থানের পর হাসিনা যদি দাঁড়াত তাহলে আদৌ ১ শতাংশ ভোট পেত কিনা সন্দেহ। তার এমন অবস্থা হলো যে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো। গণভবন থেকে পালিয়ে না গেলে আর এক-দেড় ঘণ্টা থাকলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলত। এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরশাদের বিরুদ্ধে জনগণের সে রকম আক্রোশ ছিল না। বলতে গেলে হাসিনা যেমন নির্যাতন-খুন করেছে এরশাদ সে রকম করেনি। ডিক্টেটর হিসেবে এরশাদ হাসিনা থেকে অনেক দুর্বল ছিল। শেখ হাসিনা বেপরোয়াভাবে মানুষকে খুন করেছে।
গণ-অভ্যুত্থানে অতীতে প্রাণ হারানো আর এবার প্রাণ হারানো নিয়ে আপনার মূল্যায়ন শুনতে চাই।
অতীতে এরশাদের সময় যে গণ-অভ্যুত্থান হলো এতে সে রকম কোনো প্রাণহানি হয়নি। ছাত্রদের ওপর ট্রাক চালিয়ে দিয়ে হত্যাকাণ্ড হয়েছিল এরশাদের সময়। কিন্তু চারদিকে গুলি করে হত্যাকাণ্ড চালায়নি। এখন পর্যন্ত হিসাবে চারশর মতো পাওয়া গেছে। কিন্তু আসলে হাজার খানেকের ওপর মারা গেছে। এরশাদের সময় সে রকম কিছু্ হয়নি। এবার যেটা হলো দুনিয়ার ইতিহাসে এমন হয়নি। নেতানিয়াহু গাজায় একই ধরনের হত্যাকাণ্ড করছে। গাজায় ইসরায়েল যা করেছে; শেখ হাসিনা নিজের দেশের জনগণের ওপর তাই করেছে। কাজেই এখানে ব্যাপকভাবে মানুষের প্রাণ গেছে। নব্বই সাল আর চব্বিশের মধ্যে কোনো তুলনা নেই।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাকে আশ্রয় দেয়াসহ নানাভাবে সহযোগিতা করছে ভারত। এটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ওবায়দুল কাদের খুব গলা উঁচু করে বলত শেখ হাসিনা কখনো যেতে পারে না, বঙ্গবন্ধু কন্যা ইত্যাদি যত রকমের কথাবার্তা। এখন দেখা গেল শেখ হাসিনা পালাল। পালিয়ে এখান থেকে যাবে কোথায়? প্রথমে ভারতেই গেছে। সে ভারতের পা চেটে ক্ষমতায় থেকেছে এবং ভারতকে সবকিছু বিলি করে দিয়েছে। আমি বলেছি, এটা ভারতকে বিক্রি করে দিয়েছে বলা ঠিক না। কারণ বিক্রি করলে তার তো বিনিময় কিছু পাওয়া যায়। বিক্রি করে বাংলাদেশ কিছু পায়নি। বাংলাদেশ বিলিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ বিলিয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় ভারত যে আশ্রয় দেবে সেটি সাময়িকভাবে। সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারত তাকে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে না। ভারত তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে না। কারণ তারা জানে শেখ হাসিনার মতো একজন জনবিরোধী যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, তাকে যদি তারা স্থায়ী আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে যে একটি জনমত আছে তা আরো তীক্ষ্ণ ও গভীর হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে তার স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। কাজেই ভারত তাকে স্থায়ী কোনো আশ্রয় দেবে না। এখন তো যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। ব্রিটেন তাকে আশ্রয় দেয়া যাবে না বলেছে। ইউরোপের কোনো দেশ আশ্রয় দেবে না। এখন সে কোথায় যাবে? আপাতত সাময়িকভাবে ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে, যাতে সে এখানে থেকে অন্য কোথাও পালানোর সুযোগ করে নেয়।
এ ক্রিমিনাল এখন দুনিয়ায় কোনো আশ্রয় পাচ্ছে না। আমেরিকা, ইংল্যান্ড তাকে বিদায় করে দিয়েছে। ভারত তাকে রাখবে না। বাকি জীবনটা সে হয়তো লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া এসব কোনো জায়গায় সারা জীবন একা থাকবে। তার ছেলের কাছেও থাকতে পারবে না, বোনের কাছেও থাকতে পারবে না। ইংল্যান্ড তাকে আশ্রয় দিলে আনন্দের সঙ্গে থাকত। সেই সুযোগ তো হলো না তার। অনেক দেশের সঙ্গেই তার সম্পর্ক ছিল। এখন কোনো দেশই তাকে স্বীকার করতে চাচ্ছে না। কারণ জানে যে বাংলাদেশের জনগণ তার এত বেশি বিরোধী যে তাকে আশ্রয় দিলে বাংলাদেশকে হারাতে হবে। বাংলাদেশকে তো কেউ হারাতে চায় না। ভারতও হারাতে চায় না। তাই ভারতও তাকে আশ্রয় দেবে না।
দুনিয়ায় তিনজন পালানোর চেষ্টা করেছিল। ১৯৫৯ সালে কিউবায় বাতিস্তা পালিয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডায় থেকেছে বাকি জীবনটা। রোমানিয়ার চশেস্কু পালানোর চেষ্টা করেছিল প্লেনে। কিন্তু ওই প্লেন নামিয়ে নিয়ে এনে তাকে ও তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছিল। আর তৃতীয় হলো, শেখ হাসিনা সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ভারত পালিয়েছে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরেছে ১৯৯৬ সালে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ পালিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সংগঠন একদম শেষ হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। পরে তো জিয়াউর রহমান সব দলকে অনুমতি দিল—সে সময় আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী সব চলে এল। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু নেই। এবার যা হয়েছে তা ১৯৭৫ সালে যা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক গুরুতর। আওয়ামী লীগের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। আওয়ামী লীগের এ অবস্থা তুলনা করা যেতে পারে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের অবস্থার মতো। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ধাক্কায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়েছিল। এবারে ২০২৪ সালে যে নির্বাচন হয়েছে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে উৎখাত হয়ে গেছে। আমার মনে হয় না এ আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে খুব উঠে দাঁড়াতে পারবে। সামনে ২০২৪ সালের নির্বাচন দিচ্ছে, দেখা যাবে আওয়ামী লীগ একটি সিটও পাবে না। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এরশাদ একাই পাঁচটি সিটসহ তার দলের অনেকেই জয়ী হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ নয়টি সিট পেয়েছিল। আমার মনে হয় না আওয়ামী লীগ একটিও সিট পাবে। সেই হিসেবে বলা চলে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রায় উচ্ছেদ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগে ভাঙন দেখা যাচ্ছে। ওবায়দুল কাদের লোকদের রাস্তায় নামতে বলেছিল, নামেনি। ওবায়দুল কাদের নিজেই বলেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতিই এখন আওয়ামী লীগকে ছেড়ে পালিয়েছে। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ায় নিজের দলকে অবজ্ঞা করেছে। তাদের শুধু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে—চুরি করো, আরো চুরি করো। খেতে খেতে তাদের অবস্থা হয়েছে—বাড়ির বিড়ালকে যখন ভালো ভালো খাওয়াদাওয়া করানো হয় তখন সেই বিড়াল আর ইঁদুর ধরে না। সে রকম আওয়ামী লীগের লোকদের শেখ হাসিনা এমনভাবে খাইয়েছে যে সে আর ইঁদুর ধরতে চাইছে না। এ অবস্থায় যে ধাক্কা এখন এসেছে, আওয়ামী লীগের লোকজন খেয়েদেয়ে এখন সরে পড়েছে। এখন সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখি না। রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রায় বিলুপ্তই বলা চলে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে যেসব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে এবং ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে যেসব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে এর প্রভাব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভারত নীতিতে পড়বে কি?
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চুক্তিগুলো সরকারিভাবে হয়েছে। এগুলো ভবিষ্যতে কী হবে তা বলা মুশকিল। দুই সরকারের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এখানে দেশের হলে যেমন তাড়াতাড়ি কাজ করা যায়—খালেদা জিয়াকে ছেড়ে দেয়া যায়, তারেক রহমানকে দেশে আনা যায় কিংবা এ ধরনের বন্দিদের ছেড়ে দেয়া যায়। কিন্তু এ দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় চুক্তি হয়েছে, এগুলো তো রাতারাতি বাতিল করা যাবে না। কিন্তু চুক্তিগুলো কীভাবে কাজ করবে তা ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখতে পারে। তবে শেখ হাসিনার আমলে ভারত যে সুবিধা পেয়েছে, এমন হাত-পা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো সরকার দেবে বলে মনে হয় না।
আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাংচুর করা হচ্ছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখেন।
এ আন্দোলন শুধু যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন তা-ই নয়। এটি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধেও আন্দোলন হচ্ছে। এখন শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে আগুন দিয়েছে। তার মানে লোকজন বুঝতে পেরেছে—শুধু শেখ হাসিনাই নয়, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শেখ মুজিবেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তার কারণেই বাংলাদেশের এ অবস্থা হয়েছে। জনগণের মধ্যে এ চেতনা দেখা দিয়েছে বলেই এ ধরনের কাজ করেছে। তথাকথিত শোকের মাসেই তার দফারফা করে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা এত বড় নির্বোধ যে গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম দফাটা পার হওয়ার পর কিছুটা তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু নিজের অহমিকা ও দম্ভের কারণে সে মনে করল এখনো সে মহাশক্তিশালী। ফলে আবার ছাত্র ও জনগণের বিরুদ্ধে নানা ধরনের উক্তি করায় এ দ্বিতীয় দফার আন্দোলন মাত্র কয়েক দিন পরই শুরু হলো, যার পরিণতিতে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগকে জনতা ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হলো’ বলে উচ্ছ্বাস করছে। আপনি কি তা মনে করেন?
শেখ হাসিনার মতো একজন স্বৈরতান্ত্রিক জালিমকে তাড়িয়ে দেয়ার পর জনগণ উচ্ছ্বসিত। তারা মনে করছে, এভাবে তাড়িয়ে দেয়ার পর দেশ একদম স্বাধীন হয়ে গেল। জনগণের হাতে ক্ষমতা চলে এল। এটিই হয়তো তারা মনে করে। এটি সাময়িকভাবে তারা মনে করছে। তাদের যে চিন্তার পরিপক্বতার অভাব এটি সাধারণভাবে বোঝা যাচ্ছে।
স্বাধীন দুই অর্থে হতে পারে। এক হলো, বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হওয়া। অন্যটি হলো, জনগণের স্বার্থ দেখা হবে, জনগণের কথা শোনা হবে এবং জনগণের ভালোর জন্য শাসনকাজ পরিচালনা করা হবে। প্রথমটির ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে বাংলাদেশ বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হয়েছে এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ শেখ হাসিনাকে তাড়িয়ে দেয়ার পর বাংলাদেশের যে অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং এতদিন ধরে তৈরি হওয়া যে বৈদেশিক সম্পর্ক সেটি চলে যাবে মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে এটি ঠিক, ভারতের নিয়ন্ত্রণ শেখ হাসিনার আমলে যেভাবে থেকেছে সেভাবে আর থাকবে না। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, ভারতের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব এখান থেকে চলে যাবে। পার্শ্ববর্তী বিশাল বড় শক্তিশালী একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বজায় রাখবে। ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের চলা সম্ভব নয়। তাছাড়া অন্যান্য দেশ এ দেশে বড় বড় ঋণ দিয়েছে। যেমন চীন। হাসিনার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক ছিল সেটি না থাকলেও চীন বাংলাদেশের সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক রেখেছিল সেটা না হলেও চীনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর অবশ্যই থাকবে। চীন যে বিরাট অংকের ঋণ দিয়েছে চীন তো চলে যেতে পারে না। তারা দেখবে যে তাদের বিরাট অংকের ঋণ রয়েছে; চীন তো চলে যেতে পারে না। তারা দেখবে তাদের স্বার্থ, বিনিয়োগ। কাজেই বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে বাংলাদেশ যে একেবারে স্বাধীন হয়ে যাবে, ইচ্ছামতো অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তা বলা যাবে না। কারণ যে অবস্থা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে তা বাংলাদেশে থাকবেই। এ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যে বিপুল ঋণ বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে নিয়েছে, এটির তো একটি প্রভাব থাকবেই। কাজেই বৈদেশিক ঋণের দিক থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে বলা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো মানে বাংলাদেশের জনগণ এমনভাবে স্বাধীন হলো যে এখানকার শাসন ব্যবস্থা শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ দ্বারা পরিচালিত হবে এটি মনে করার কোনো কারণ নেই।
১৯৭২ সাল থেকে যে শ্রেণীগত শাসন চলে আসছে, দেখা যাবে যে এখানে প্রত্যেকটি শাসন ব্যবস্থা ছিল স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। শেখ মুজিবের ছিল ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা। আওয়ামী-বাকশালী সরকারের মধ্যে যার পরিণতি। তারপর জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন। এরপর এরশাদের সামরিক শাসন। ১৯৯০ সালের পর খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার বেসামরিক স্বৈরশাসন কায়েম ছিল। বাংলাদেশ একের পর এক ফ্যাসিস্ট সরকার দেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো শেখ হাসিনা সরকার। যে ফ্যাসিজম সে করেছে এর তুলনা এ অঞ্চলে নেই; তার বাপের শাসনামল ছাড়া। ১৯৭৪-৭৫ ছাড়া শেখ হাসিনার শাসনের আর তুলনা নেই। বলা চলে যে ১৯৭৪-৭৫ সালের চেয়ে শেখ হাসিনার শাসন আরো খারাপ। আরো ব্যাপকভাবে নির্যাতক।
কাজেই এটি চলে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের ধারণা হতে পারে যে তারা স্বাধীন হয়ে গেল; মুক্ত হয়ে গেল। এ অবস্থা আর ফিরে আসবে না। এটি কিন্তু ঠিক নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনগণ অবশ্য স্বাধীনতা ভোগ করবে। কারণ এত কিছুর পর যারা আসবে তারা সঙ্গে সঙ্গেই এমন কোনো নির্যাতন আর করতে পারবে না। কিন্তু পরবর্তীকালে দেশের যে অবস্থা তাতে আবার যে শোষণ, নির্যাতন, জেলে দেয়া, নিরাপত্তা আইনের দরকার হবে না, তা নয়।
পরবর্তীকালের যে শাসক তারাও এখানে জনগণের প্রতিনিধি নয়। ১৯৭২ থেকে যে শাসক শ্রেণী তারাই তো ক্ষমতায় রয়েছে লুটপাট করার। এই যে জাতীয় সংসদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী শ্রেণী তারা তো চলে যাবে না। তাদের এ আন্দোলনের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেয়া যাবে না। তারা রয়েছে। তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ভবিষ্যতে শাসনকার্য পরিচালনা করবে। কাজেই ওইদিক থেকেও বাংলাদেশ যে একেবারে স্বাধীন হয়ে গেল তা কিন্তু নয়। শেখ হাসিনার মতো একজন ক্রিমিনাল ও ফ্যাসিস্টকে তাড়িয়ে দেয়ার পর মানুষ মনে করছে এটি স্বস্তির এবং তা চিরকাল থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে শ্রেণী শাসন ওই দুই অর্থে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে—এটি মনে করার কোনো কারণ নেই।










