দিনের শুরুতে ঘুম থেকে জাগার পর কর্মব্যস্ত সময়ের শেষে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত কোন সময়টি আছে যেখানে প্লাস্টিকের উপস্থিতি নেই। ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আট বিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন হয়েছে। যদি আমরা বিশ্বের মোট জনসংখ্যা অনুপাতে হিসাব করি তাহলে দেখা যাবে জনপ্রতি প্লাস্টিক উৎপাদনের পরিমাণ এক টন। একবার ভাবুন তো আপনার আমার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে এক টন প্লাস্টিক। এ প্লাস্টিক নিয়েই আমাদের যাপিত জীবন। যেন দিন দিন আমরা প্লাস্টিকের সাগরে ডুবে যাচ্ছি।
প্রতিদিন আমরা নতুন নতুন প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করছি। আর বিশ্বব্যাপী যে প্লাস্টিক উৎপাদন হচ্ছে তার মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্চক্রায়ণ (রিসাইকেল) করা হচ্ছে। যখন এই প্লাস্টিক রিসাইকেল করা হয় তখন সেখানে নানান ধরনের প্লাস্টিক থাকে যেগুলোর রাসায়নিক ধরন ভিন্ন। ফলে ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক একত্র হয়ে পুনর্চক্রায়িত প্লাস্টিকের বিষক্রিয়া বাড়িয়ে তোলে। এ কারণে রিসাইকেল প্লাস্টিক দিন দিন ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। গবেষণা বলছে, রিসাইকেল প্লাস্টিকে আগের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন ফ্লেম রিটার্ডেন্স বেনজিন, ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ যেমন ব্রোমিনেটেড এবং ক্লোরিনেটেড ডাই অক্সিনস, যা এন্ডোক্রাইন সিস্টেম ধ্বংস করে এবং শরীরে হরমোন নিঃসরণের মাত্রার তারতম্য ঘটাতে পারে। আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই রিসাইকেল করা যাবে আমদানীকৃত এমন প্লাস্টিকের অধিকাংশ আসে উন্নত বিশ্ব থেকে। ড. থেরেস কার্লসনের মতে, প্লাস্টিক তৈরি হয় বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে এবং যখন প্লাস্টিক রিসাইকেল করা হয় এগুলো সহজে বিদূরিত হয় না। বিজ্ঞানীরা অবশ্য অনেক আগে থেকেই বলছেন যে প্লাস্টিক রিসাইকেল মূলত একটি বিষাক্ত উদ্ভাবন, যার পুরোটা পর্যায়ে আমাদের স্বাস্থ্য ও শরীরের জন্য হুমকিস্বরূপ। অর্থাৎ আমরা যেসব রিসাইকেলযোগ্য প্লাস্টিক আমদানি করছি সেগুলো বিষাক্ত।
বিশ্বব্যাপী যে প্লাস্টিক চুক্তিটি হচ্ছে সেটি নিয়ে রয়েছে নানান বিতর্ক। বিশ্বের ১৭৩টি দেশ যখন প্লাস্টিকের পুরোপুরি পুনর্চক্রায়ণের (রিসাইকেল) বিষয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে গবেষণা বলছে পুনর্চক্রায়ণ প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের কোনো টেকসই উপায় নয়। কারণ আমরা প্রতিনিয়ত যে প্লাস্টিক ব্যবহার করছি সেগুলো সময়ের চক্রে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন জীবের পাকস্থলীতে এবং রক্তেও পাওয়া যাচ্ছে বলে গবেষণা ফলাফল জানাচ্ছে।
সহজ ভাষায় বলা যায় প্লাস্টিক আমাদের চক্রাকার অর্থনীতিতে যেমন বিষের সঞ্চার করেছে, তেমনি আমাদের শরীর, আমাদের চারপাশে আলো, বাতাস, পানি, খাবার সবকিছুকে করে তুলেছে বিষাক্ত। যেসব প্লাস্টিক মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্বারা তৈরি সেগুলোকে আমাদের কোনোভাবেই রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করা ঠিক হবে না। বরং আমাদের উচিত বিষাক্ত রাসায়নিক দ্বারা তৈরি প্লাস্টিকগুলোকে বর্জন করা, প্লাস্টিক তৈরিতে রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবহার বন্ধ করা এবং সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। আমরা অনেকেই মনে করি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরে যেগুলোকে আমরা রিসাইকেল বিনে ফেলে দিয়ে আসি সেগুলো সব পুনর্চক্রায়ণ হচ্ছে। আসলে তা মোটেও নয়। ‘বিচ ক্লিনআপ অ্যান্ড বিয়ন্ড প্লাস্টিক’ নামের একটি সংস্থা তাদের গবেষণা তথ্য থেকে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালে রিসাইকেল বিনে ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের মাত্র ৫-৬ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্চক্রায়ণ করা হয়েছিল। খোদ মার্কিন মুল্লুকের এমন পরিস্থিতি আমাদের আতঙ্কিত করে বটে। পুনর্চক্রায়ণের বাইরে যে প্লাস্টিকগুলো থাকে সেগুলোকে ল্যান্ডফিলে পরিণত করা হয়, যা মোটেই পরিবেশবান্ধব নয়। বলা চলে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৮৫ শতাংশের শেষ গন্তব্য ল্যান্ডফিল আর বাকি ১০ শতাংশ পোড়ানো হয় ইনসিনারেটরের মাধ্যমে। ল্যান্ডফিলে যে ৮০ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হলো সেটি মাটির কতটা ক্ষতি করছে এবং জীব ও খাদ্যচক্রে এর কী প্রভাব পড়ছে সে নিয়ে আমরা কতটা জানি?
প্লাস্টিকের পলিমারগুলোকে বিভিন্ন ধরনের রঙে সাজাতে গিয়ে যেসব রাসায়নিক এবং রঞ্জক ব্যবহার করা হয় সেগুলোর সঙ্গে এসব প্লাস্টিক দ্বারা তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর নানান বৈশিষ্ট্য যেমন দৃঢ়তা, বাঁকানোর ক্ষমতা, তাপমাত্রা সহনশীলতা, সূর্যের আলোতে টিকে থাকার ক্ষমতা এসব যোগ করতে গিয়ে নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বলতে গেলে প্রায় ১৩ হাজার রাসায়নিক পদার্থ প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং এসব রাসায়নিকের অনেকগুলোর বিষক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের এখনো ধারণা নেই। পুনর্চক্রায়ণকালে নানান ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক একত্র হয়ে যে ককটেল উৎপন্ন হয় সেটি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অন্যদিকে বিভিন্ন প্লাস্টিকসামগ্রী একত্রে পুনর্চক্রায়ণ বা রিসাইকেল করার সময় নতুন ধরনের রাসায়নিকের সৃষ্টি হয়। যেটি একক প্লাস্টিকসামগ্রীতে থাকা প্লাস্টিকের চেয়েও ভয়ানক ক্ষতিকর। আমরা প্লাস্টিকসামগ্রী ব্যবহার করি এবং তাতে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ সংরক্ষণ করে থাকি। যেমন ধরা যাক প্লাস্টিক কনটেইনারে আমরা কীটনাশক সংরক্ষণ করছি এবং দীর্ঘদিন ধরে এই কনটেইনার কীটনাশকের কিছু অংশ শোষণ করে। এভাবে নানান কনটেইনারে সংরক্ষিত দ্রব্য থেকে শোষিত রাসায়নিক মিলেমিশে রাসায়নিকের ককটেল তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক থেকে তৈরি পণ্যগুলোতে স্থানান্তরিত হতে পারে। প্রমাণ হিসেবে খাদ্য প্যাকেজিং এবং শিশুদের খেলনা যেগুলো রিসাইকেল করা প্লাস্টিক থেকে তৈরি সেগুলোতে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্লাস্টিক অহরহ মাটিতে, পানিতে ফেলে দিচ্ছি এবং সময়ের পরিক্রমায় এসব প্লাস্টিক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিকে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমাদের গবেষণায় দেখেছি, এসব আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক, যেগুলোকে গবেষণার ভাষায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বলি, সেগুলো মাটিতে পানিতে ও মাছের পাকস্থলীতে হাজির। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রাণীর রক্তেও মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিত। বাংলাদেশের মাটি, পানি এবং জলজ জীবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে আমাদের পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে আশঙ্কাজনক চিত্র। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আমরা যারা সর্বভুক প্রাণী রয়েছি তাদের দেহে ক্ষতিকর রাসায়নিকবাহী মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবারের সঙ্গে সহজেই প্রবেশ করতে পারে। এর পরের রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া যে দুরারোগ্য ব্যাধির জন্ম দিতে পারে সেটাও অনুমেয়।
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের দাপট কমাতে গিয়ে আমরা ঠিক করে নিয়েছি উৎপাদিত প্লাস্টিক রিসাইকেল (পুনর্চক্রায়ণ) করে এর নতুন উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করব। অথচ আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিস আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক চুক্তির জন্য আয়োজিত আলোচনার প্রাক্কালে জানিয়ে দিয়েছে পুনর্চক্রায়িত প্লাস্টিক থেকে তৈরি নতুন প্লাস্টিকসামগ্রীতে প্রাথমিকভাবে উৎপাদিত প্লাস্টিকের তুলনায় অনেক বিষাক্ত রাসায়নিক থাকতে পারে। অন্যদিকে এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কও বলছে যে রিসাইকেল করা প্লাস্টিকগুলো তাদের ভার্জিন উপাদানগুলোর চেয়ে বেশি বিষাক্ত। মানে দাঁড়াল প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিকটিকে আমরা যতই প্রশমিত করতে চাই সে ফাঁকফোকর গলে নতুন ভয়াবহ বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক যেভাবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে ইচ্ছে করলেই স্বল্প সময়ে এর ওপর নির্ভরশীলতা একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে পারব কি? আমরা কি পারব বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে? আর নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও আদতে সেটা কি কেউ মানবে?
তাহলে আমাদের করণীয় কী? প্লাস্টিক নামের যে সিন্দবাদের ভূত আমাদের ঘাড়ে উঠে বসেছে তাকে কি সহজেই নামিয়ে দেয়া সম্ভব? এটা বলা ঠিক হবে না যে আমরা এখনই প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে দিই এবং সেটা সম্ভবও না। বরং প্লাস্টিক কীভাবে পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যবহার করা যায়, প্লাস্টিক উৎপাদনে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার পরিহার করা যায় সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। যেমন প্রতিদিন আমরা যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করছি সেগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে পারি। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন গবেষক এবং শিক্ষক শার্লট লয়েডও অবশ্য তেমনটাই মনে করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো প্লাস্টিক তৈরির সময় যেসব কাঁচামাল রাসায়নিক হিসেবে ব্যবহার করা হয় তার বিষাক্ততা সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকতে হবে। যদিও উৎপাদকরা তাদের লাভের হিসাব করতে গিয়ে রাসায়নিক বিষক্রিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য দেবেও না, এমনকি বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহারও বন্ধ করবে না। তার পরও জনস্বার্থে নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রয়োজনে প্লাস্টিক উৎপাদককে বাধ্য করতে হবে যেন তার উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্যের গায়ে সেটি তৈরিতে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে তার একটি তালিকা দিয়ে দেয়া হয় এবং এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য কতটা হুমকি সৃষ্টি করে সেটি লিখে দেয়। যেমনটা তামাকজাত পণ্যের মোড়কের গায়ে লেখা থাকে। এ বছরে পালিত পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলায় যার অর্থ দাঁড়াতে পারে ‘প্লাস্টিক দূষণের সমাধানে শামিল হই সকলে’। এ প্রতিপাদ্য জনগণের কাছে তুলে ধরতেও হয়তো সহস্র প্লাস্টিক ব্যানার তৈরি হবে। আমাদের প্রত্যেকের ঘাড়ে শুরুতে যে এক টন প্লাস্টিক জমে থাকার কথা বলেছিলাম তার সঙ্গে আরো কিছু প্লাস্টিক যোগ হবে। যত প্লাস্টিক বাড়বে ততই আমরা প্লাস্টিক সাগরে ডুবতে থাকব। আচ্ছা ডুবন্ত মানুষ তো বাঁচতে চায়, আমরাও সময় থাকতে একটু বাঁচার চেষ্টা করতে পারি না? যাপিত জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে শুরু করলেই হয়তো একদিন আমরা প্লাস্টিকের জঞ্জাল থেকে বের হয়ে বাঁচার জন্য নিশ্বাস নিতে পারব। বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন থেকে এমন একটা উদ্যোগ আমরা নিতেই পারি।
ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়










