২৩ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে মন্ত্রিসভা প্রস্তাবিত ‘আয়কর আইন ২০২৩’কে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করে। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতাগুলোকে সরিয়ে ফেলা মূলত এ প্রস্তাবিত আইন প্রণয়নের মূল লক্ষ্য। তবে এ আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে কতকগুলো বিষয় পর্যালোচনা করা দরকার।
রিট পিটিশন নং ৬৯৬ অফ ২০১০-এ প্রদত্ত ২৬ আগস্ট ২০১০ তারিখের রায়ে হাইকোর্ট ২৪ মার্চ ১৯৮১ থেকে ১১ নভেম্বর ১৯৮৬ সময়বৃত্তে প্রণীত সব অধ্যাদেশকে অবৈধ বলে রায় দেন। আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ৪৮ অফ ২০১১তে প্রদত্ত ১৫ মে ২০১১ তারিখে আদেশে হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখেন। ফলে ৪ জুন ১৯৮৪তে জারীকৃত ‘আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪’ অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ৭ নং আইনে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪সহ ২১টি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়া হয়। এ বৈধতা প্রয়োজনীয়তা ডকট্রিনের আলোকে করা হয়।
তদুপরি ‘আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪’ ইংরেজি ভাষায় লিখিত। অথচ ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭’ অনুসারে সব আইন বাংলা ভাষায় রচিত হতে হয়। এসব কারণে একটি নতুন আয়কর আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
খাতাপত্রভিত্তিক হিসাবরক্ষণ থেকে কম্পিউটারভিত্তিক হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডের বিধান বাংলাদেশে পরিপালনের বিধান করা হয়েছে। অডিট রিপোর্ট ডিবিসি নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাতে একই কোম্পানির একাধিক অডিটেড হিসাব বিবরণী তথা ভুয়া হিসাব তৈরির সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে গেছে। এছাড়া নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে হিসাব পদ্ধতি তথা সার্বিক হিসাব প্রতিবেদনের মানের প্রভূত উন্নতি হয়। এসব পরিবর্তনের আলোকে আয়করের Business Prosses-এর সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রয়োজন।
সম্ভাব্য কর আদায়ের পরিমাণ যাচাইয়ের জন্য কোনো সমীক্ষা এখনো পরিচালিত হয়নি। অর্থ বিভাগের মাসিক ফাইন্যান্সিং রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে কর জিডিপির অনুপাত ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মোট কর রাজস্বে আয়কর রাজস্বের হিস্যা ছিল ৩২ শতাংশ। একই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে আয়কর রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ৯১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়। ওই বছরে জিডিপির পরিমাণ ছিল ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের কর রাজস্ব জিডিপির অনুপাত যেকোনো মানেই আশাব্যঞ্জক নয়। ধারণাগতভাবে বলা হয়, আমাদের কর জালের পরিধি ছোট। দেশের জনসংখ্যা যেখানে ১৭ কোটি। সেখানে ১৩ এপ্রিল ২০২৩-এর হিসাব অনুযায়ী নিবন্ধিত ব্যক্তি আয়করদাতার সংখ্যা ৮৫ লাখ ৬ হাজার ৬১১। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উৎসে আয়কর কর্তন করা হচ্ছে এসব ক্ষেত্রকে বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, প্রকৃত আয়করদাতার সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন ডিসেম্বর ২০২২-এর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সুদ সংযুক্ত সঞ্চয়ী আমানতের সংখ্যা ১১ কোটি ২ লাখ ২২ হাজার ৫০৫। অন্যদিকে সুদ সংযুক্ত স্থায়ী আমানতের সংখ্যা ৫০ লাখ ২৬ হাজার ২০৩। সুদ প্রদানকারী এসব আমানতকারীদের কাছ থেকে সুদের ১০ বা ১৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কর্তন করা হয়। এ সংখ্যা নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী মার্চ, ২০২৩-এ নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ২ লাখ ৭ হাজার ৭১১। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ১৩ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিবন্ধিত কোম্পানি আয়করদাতার সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮০। নিবন্ধিত হয়েছে কিন্তু বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি বা একসময় চালু ছিল কিন্তু এখন বন্ধ হয়ে আছে এরূপ কোম্পানির সংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেখা যায় অনিবন্ধিত কোম্পানি আয়করদাতাদের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
এতে করে এটা প্রতীয়মান হয় যে আহরিত হয়নি এসব আয়কর রাজস্ব মূলত নিবন্ধিত করদাতাদের কাছেই আছে।
আহরিত হয়নি এমন অংকের রাজস্বের একটি বড় উৎস হচ্ছে কালো টাকা। ২০১০ সালে অর্থ বিভাগ কালো টাকার জন্য একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা পরিচালনা করে। ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে কালো টাকার পরিমাণ জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে টাকা পাচারের পরিমাণ বৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
কালো টাকা ও পাচারকৃত অর্থকে কীভাবে আয়করের আওতায় আনা যায় তা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রস্তাবিত নতুন আয়কর আইনে এর কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর বাজেট কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় করে থাকে। সেখানে করদাতারা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
কিছু কিছু সমস্যার কথা তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। যেমন আয়কর আইন ও পদ্ধতি জটিল। এটা সহজতর করা প্রয়োজন। আয়কর আইনে কর কর্মকর্তাদের হাতে অত্যধিক স্বেচ্ছাক্ষমতা প্রদান করা আছে। যা হ্রাস করা প্রয়োজন। স্বেচ্ছাক্ষমতার ন্যায়সংগত প্রয়োগ কার্যকর করার কথাও তারা বলেছেন। ব্যবসার আয় নিরূপণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত স্থূল মুনাফাকে আয় নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়, যা বাস্তবসম্মত নয়। স্থূল মুনাফায় কর বিভাগে প্রচলিত হারও অযৌক্তিকভাবে বেশি। কর কর্মকর্তা অযৌক্তিকভাবে এমন সব তথ্যপ্রমাণ চান যা বাস্তবে পাওয়া যায় না। উৎসে কর কর্তন হার কোনো ভিত্তি ছাড়াই বেশি হারে নির্ধারণ করা হয়েছে। যাতে করে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
করদাতাদের এসব ক্ষোভ যাচাইয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রিফর্মস ইন রেভিনিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (রিরা) প্রকল্পের আওতায় ২০০২ সালে একটা করদাতা জরিপ পরিচালনা করে। বিশ্বব্যাংকের আইএফসির সহযোগিতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পরবর্তী সময়ে অন্য একটি করদাতা জরিপ পরিচালনা করে। এ জরিপ এপ্রিল, ২০১৩তে প্রকাশ হয়।
প্রস্তাবিত নতুন আয়কর আইনে জরিপে প্রাপ্ত তথ্য ও করদাতাদের এমন ক্ষোভের বিষয়গুলো বিবেচনায় আনার কোনো আলামত পাওয়া যায় না।
কর্তৃপক্ষের আদেশে ক্ষুব্ধ করদাতাদের দুই স্তরের আপিল করার সুযোগ আছে। প্রথম স্তরে কর কমিশনার (আপিল) বা আপিলাত অতিরিক্ত কর কমিশনার বা আপিলাত যুগ্ম কর কমিশনারের কাছে আপিল দায়ের করা যায়, যা সাধারণভাবে বিভাগীয় আপিল নামে পরিচিত।
এ আপিল রায়ের বিরুদ্ধে আয়কর আপিলাত ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় স্তরের আপিল দায়ের করা যায়। ২০০২ সালে অজ্ঞাত কারণে ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চে ও ‘বিচারিক সদস্য’-এর পদ বিলোপ করা হয়। এতে ট্রাইব্যুন্যাল তার জুডিশিয়াল চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। তথ্যগত বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় চূড়ান্ত বিধায় এর বিচারিক চরিত্র ফিরিয়ে আগের অবস্থায় নেয়া দরকার।
বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশ কর কমিশনারদের হাতে রিভিশন ক্ষমতা অর্পণ করা আছে। কিন্তু কর কমিশনাররা এ ক্ষমতা প্রয়োগে অনীহা প্রদর্শন করে আসছেন।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আনা হয়েছে। আবার পরবর্তী সময়ে তা তুলে নেয়া হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ‘ট্যাক্স সেটেলমেন্ট কমিশন’ প্রবর্তন করা হয়, যা ২০০২ সালে তুলে নেয়া হয়। ২০০৫ সালে ‘কর ন্যায়পাল’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়, যা ২০১১ সালে তুলে নেয়া হয়। ২০১১ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রবর্তন করা হয়। এটা এখনো চালু থাকলেও ক্রমে এ পদ্ধতির কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
২০০০ সালে বিশ্বব্যংক, আইএমএফ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি যৌথ দল আয়কর সম্পর্কিত কর্মপদ্ধতি সম্পর্ক সমীক্ষা পরিচালনা করে। তারা সার্কেল অফিসের কাজগুলোকে চারটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেন। এ শ্রেণীগুলো যথাক্রমে ‘ট্যাক্সপেয়ার সার্ভিস’, ‘অডিট’, ‘রেভিনিউ অ্যাকাউন্টিং’ এবং ‘ট্যাক্স কালেকশন এনফোর্সমেন্ট ও আপিল’। প্রতিটি শ্রেণীর কর্মপদ্ধতির সংস্কার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শ্রেণীর কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রযুক্তি সহায়ক Standard Operating Procedure প্রণয়ন করা প্রয়োজন
কর্মপদ্ধতি সংস্কার দক্ষভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারকৃত কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে।
অমুনাফাভিত্তিকভাবে পরিচালিত ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর করযোগ্যতার বিষয়টি বিদ্যমান আইনে স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন জয়গান ছড়িয়ে থাকা বিধানগুলো একত্র করে একটি Comprehensive নতুন অধ্যায় নতুন আইনে আনা দরকার।
পদ্ধতিগত বিষয়গুলো মূল আয়কর আইনের পরিবর্তে বিধিতে রাখা যুক্তিযুক্ত। প্রস্তাবিত আইনে এ প্রথা অনুসরণ না করে কিছু বিধির বিষয় প্রস্তাবিত মূল আইনে আনা হয়েছে। এতে জুরিসপ্রডেন্স মূলনীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। এর ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিভিন্ন প্রায়োগিক অসুবিধায় পড়বে।
পুরনো বিধিবদ্ধ নোটিসের ভাষা যুগোপযোগী ও শালীন হওয়া প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি উপযোগী নোটিসের ডিজাইন ও নোটিস-পরবর্তী ধারাবাহিক পদক্ষেপের নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি প্রণয়ন প্রয়োজন।
প্রতিটি শ্রেণীর Standard Operating Procedure-এর জন্য অফিস ম্যানুয়াল প্রয়োজন। তা স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সর্বোপরি আমাদের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে উত্তরোত্তর সংযুক্ত হচ্ছে বিধায় মূল আইন ও বিধির একটি ইংরেজি ভার্সন তৈরি করা দরকার।
প্রস্তাবিত নতুন আয়কর আইন কার্যকর করার আগে উচ্চতর কোর্টের রায়ের দিকনির্দেশনা, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির রূপান্তর, কর গ্যাপ চিহ্নিতকরণ, Standard Operating Procedure-এর কাঠামো ও সহায়ক ম্যানুয়াল তৈরি প্রয়োজন। এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত নতুন আইন পর্যালোচনা হওয়া দরকার।
আমিনুর রহমান: সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড










