বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল (ফার্নেস ও ডিজেল), কয়লা ও গ্যাসের ওপর নির্ভর করা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী বছর তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেশির ভাগই বসিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন না হলেও এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে। তাই বিশেষজ্ঞরা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সাড়ে ২৭ শতাংশ জ্বালানি তেলভিত্তিক (ফার্নেস ও ডিজেল)। যদিও বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ ধরনের জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার ২২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়ায় এবং ফার্নেস অয়েল আমদানিতে অর্থ সংকট ও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় সামনের বছর এ ব্যবহার ব্যাপক মাত্রায় কমে আসবে। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়বহুল এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন। তাদের ভাষ্যমতে, দেশের বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এরই মধ্যে উৎপাদনে এসেছে। চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও এখন পর্যাপ্ত। এ অবস্থায় ব্যয়বহুল এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই ফুরিয়েছে। 

তেলভিত্তিক বিদ্যুতে অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। আবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও এখন বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহারে বিপিডিবিকে সবচেয়ে বেশি অনুৎসাহিত করা হয়। সামনের দিনগুলোয় জ্বালানি তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠলে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে। অন্যদিকে দেশের কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোই এখন বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় পুরোটা পূরণ করতে সক্ষম।  চাহিদা কম থাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই বর্তমানে অব্যবহৃত থাকছে। অলস বসে থাকায় কোনো কোনোটির যন্ত্রাংশ অকেজোও হয়ে পড়ছে। আবার উৎপাদনের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও অনেক বেশি বলে বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

ব্যবহার না করলেও এগুলোর পেছনে বিপিডিবির ব্যয় কমছে না। বসে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতার চার্জ বাবদ সংস্থাটিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এদিকে বিপিডিবির আর্থিক পরিস্থিতি এখন নাজুক আকার ধারণ করেছে। অর্থ সংকটে সংস্থাটি আইপিপিগুলোর সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করতে পারছে না। এরই মধ্যে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপিডিবির বকেয়া দেনার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিপিডিবির কাছে আটকে থাকায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না। বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ প্রতি মাসে বিপিডিবি অর্থ পরিশোধ করলেও বকেয়ার বিষয়ে আইপিপিগুলো কোনো সিদ্ধান্ত জানতে পারছে না। 

বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়ার মধ্যে আগামী বছর এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঠিকমতো পরিচালনা করা না গেলে এ খাতে বড় সংকট তৈরি হতে পারে বলে আইপিপিগুলো জানিয়েছে। বিশেষ করে বিপুল অর্থের ঋণ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যানুযায়ী, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে  তেমন একটা নেই। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ব্যয়বহুল এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরকারের বেরিয়ে আসা উচিত বলেই তারা মত দিচ্ছেন। 

তবে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসা ঠিক হবে না বলে বিদ্যুৎ বিভাগসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন অনেক ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় এসব কেন্দ্র যথাসম্ভব কম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যয় সাশ্রয়ের কথা ভাবছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও বেড়ে গেছে। ফলে জ্বালানি আমদানি ও ব্যয়বহুল এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিপিডিবি আর্থিকভাবে লোকসান করছে। যে কারণে পিক ডিমান্ড ও অতিপ্রয়োজন ছাড়া সংস্থাটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করতে চাইছে না। তবে এ মুহূর্তে এগুলোর ব্যবহার থেকে একেবারে বের হয়ে আসাও যাবে না। পিক আওয়ারে বিদ্যুতের আকস্মিক চাহিদা বৃদ্ধি পেলে এগুলোকে ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক উৎপাদন বাড়িয়ে নেয়া যায়। 

এক্ষেত্রে জ্বালানি তেলভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র রেখে বাকিগুলো থেকে সরে আসার জন্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে বছরের পর বছর ক্যাপটিভ চার্জ বাবদ যে পরিমাণ টাকা লোকসান হচ্ছে, এ লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে। জ্বালানি খাতে ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করলে তাতে আখেরে বিদ্যুৎ বিভাগই লাভবান হবে। জ্বালানি সংকট, আমদানিতে অর্থ সংকুলানের জটিলতাসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাতে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব সর্বস্তরে পড়ে। এক্ষেত্রে বিপিডিবিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে হবে।