মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ অনুযায়ী অর্থ পাচারে সম্পৃক্ত ২৭ ধরনের অপরাধ অনুসন্ধান ও তদন্তের একক দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৫ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের মধ্যে কেবল ঘুস ও দুর্নীতি অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় দুদককে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, দেশী-বিদেশী মুদ্রা পাচার, জালিয়াতি ও প্রতারণাসংক্রান্ত অপরাধ থেকে উদ্ভূত অর্থ পাচারসংক্রান্ত অন্য সব অপরাধ দুদকের এখতিয়ারের বাইরে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে হাইকোর্টের এক আদেশে অর্থ পাচারে সম্পৃক্ত সব অপরাধ তদন্ত করার সুযোগ পায় সংস্থাটি। যদিও এ অপরাধসংক্রান্ত অনুসন্ধান-তদন্তে দুদকের কার্যক্রমে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

অনগ্রগতির অন্যতম একটি কারণ দুদকের মানি লন্ডারিং অনুবিভাগে রয়েছে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল সংকট। বিষয়টি দুদকের মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায়। সংস্থাটির ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর জমে থাকা অনিষ্পন্ন অনুসন্ধানের সংখ্যা ছিল ১৪৮। এর মধ্যে কেবল ১০টি অনুসন্ধান সম্পন্ন করা হয়েছিল।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আটটি অনুবিভাগের মধ্যে ‘মানি লন্ডারিং’ অনুবিভাগ অন্যতম। এ অনুবিভাগে মানি লন্ডারিং, ব্যাংক এবং বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে তিনটি অধিশাখা রয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনুবিভাগটিতে মঞ্জুরীকৃত জনবলের চেয়ে কম জনবল রয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা আরো কম। কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ব্যাংক শাখায় ৫৬ জনের মধ্যে ১১ জন, মানি লন্ডারিং শাখায় ৪৫ জনের মধ্যে ২৪ জন এবং বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখায় ৫৬ জনের মধ্যে ১৩ জন কর্মরত রয়েছেন। সব মিলিয়ে জনবল সংকটে রয়েছে ‘মানি লন্ডারিং’ অনুবিভাগ।

দুদক সূত্রমতে, আগে থেকেই অনুবিভাগটিকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে। সেজন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য দুদকে বিশেষায়িত অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তা তৈরি হচ্ছে না। দুদক থেকে বিভিন্ন সময় অভিযোগও করা হয়েছে যে মানি লন্ডারিংয়ে সম্পৃক্ত সব অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত দুদক করতে পারে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২২ সালের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে দশম দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ। গত ১১ বছরে বাংলাদেশের স্কোর ২৪ থেকে ২৮-এর মধ্যে রয়েছে। বলা হয়, যে দেশের স্কোর যত কম, সেই দেশ তত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৩-এ বাংলাদেশের স্কোর ২০২২-এর তুলনায় ১ পয়েন্ট কমে ২৪-এ দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে দুর্নীতি দমনের জন্য ২০০৪ সালে গঠিত হয়েছিল কমিশন (দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক)।

কেবল মানি লন্ডারিং-বিষয়ক অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিকভাবে দুর্নীতি দমনে ব্যর্থ হওয়া এবং ধীর প্রক্রিয়ার জবাবদিহিতায় দুদক হরহামেশাই বলে এসেছে পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কথা। চলতি বছরের শুরুর দিকেও বণিক বার্তার অন্য এক প্রতিবেদন মারফত জানা যায় জনবল ও যান সংকটে দুদকের একমাত্র ফরেনসিক ল্যাবের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা। ফলে দুদকের জনবল সংকট-সংক্রান্ত অভিযোগ ও দাবি একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। দুদকে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মানি লন্ডারিং অনুবিভাগে দ্রুততার সঙ্গে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি নিয়োজন করা আবশ্যক। কেননা দুদক সম্প্রতি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ পর্যন্ত ৭১টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক। তাই বলা যায়, দুদকের অনুবিভাগটিতে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করা এবং এটিকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তাছাড়া দেশের ব্যাংক খাত ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের ভঙ্গুর দশা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা বেড়েছে আর ব্যাংক খাতে একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচারের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বিদায়ী সরকারের শাসনামালে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ অন্তত ১৪ হাজার ৯২০ কোটি বা ১৪৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। দেশ থেকে অর্থ পাচারের জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ কিছু দ্বীপরাষ্ট্র আর অর্থ পাচারের অন্যতম বড় মাধ্যম আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং। অর্থ পাচার যেভাবে দেশের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়েছে, এতে মানি লন্ডারিং অনুবিভাগের লোকবল বাড়িয়ে অনুসন্ধান-তদন্ত জোরদার করা ভিন্ন উপায় নেই।

দেশে গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকার বদল হয়েছে। বিদায়ী সরকারের প্রতি জনরোষ সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিল সীমাহীন দুর্নীতি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ওই সরকার জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলে এলেও বাস্তবে কোনো নীতিই বাস্তবায়ন হয়নি। দুদক কেবল নামেমাত্র স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রায়ই অর্থনীতিবিদদের কলামে তাই দুদককে উল্লেখ করা হয়েছে নখদন্তহীন বাঘ হিসেবে। বর্তমান সরকারের দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে দুর্নীতি দমনে তৎপর হওয়া কঠিন। সঠিক তদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সরকারের সহযোগিতা অতীব জরুরি।

দুর্নীতি সংক্রামক রোগের মতো। উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এ রোগের বিস্তার আরো বেশি। যে কারণে দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতসহ অধিকাংশ খাতেই ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ মেলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দুদকের সক্ষমতা ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।