ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন, নির্বাচন নিয়ে বিদেশীদের পর্যবেক্ষণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশটির ভিসা নীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

দেশে গত ৫২ বছরেও একটি স্থায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এর কারণগুলো কী বলে মনে করেন?

এর কারণ অত্যন্ত সহজ। রাজনৈতিক বিভাজন, রাজনৈতিক অপরিপক্বতা, একই সঙ্গে আমাদের সমাজ গঠন আর রাজনৈতিক মূল্যবোধ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, ক্ষমতার মোহ, ক্ষমতায় যাওয়ার এবং থাকার যে অদম্য ইচ্ছা ইত্যাদি। এর মধ্যে রাজনীতিকদের আবার একে অন্যের প্রতি অবিশ্বাসও রয়েছে। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচনের নামে নির্বাচন হয়েছে। বেশির ভাগ সময় একপেশে, কোনো পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত নির্বাচন হয়েছে। শুধু কয়েকটি ছাড়া বাকি সবই সরকারি দলের পক্ষে গেছে। অথবা যারা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তাদের পক্ষে গেছে। যার ফলে গত ৫২ বছরেও নির্বাচন যেভাবে বিকশিত হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। মাঝেমধ্যে হয়েছে, তারপর আবার সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমরা স্বাধীনতার ৫২ বছরে এসে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র, ন্যায়বিচার, গুণগতমান এবং গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেকবার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল, সেখান থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র হয়েছে কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্রে ব্যক্তি বা পক্ষ দ্বারা হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। সামাজিক পরিপক্বতা হয়নি, সামাজিক ব্যবস্থাপনায় সেভাবে উন্নতি হয়নি। সব কিছু মিলে আমাদের এখনকার যে অবস্থা, সে অবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পর বা জাতীয় নির্বাচন এলে সমস্যা শুরু হয়। এগুলোই আমি মনে করি আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কোনো ব্যবস্থাই আমরা ঠিক করতে পারিনি, নির্বাচন কীভাবে হবে?

বর্তমান আইন ও কাঠামোর মধ্যে থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন কতটুকু সম্ভব?

আইনে কোনো সমস্যা নেই। আইন ঠিকই আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বর্তমান কাঠামো যেটা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে যে নির্বাচনটা হওয়ার কথা, এখানে যে ক’টি নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হয়নি। মাঠপর্যায়ে যারা নির্বাচন পরিচালনা করে, তাদের ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। রাজনীতিকরণ সব সময় হয়ে থাকে, কিন্তু এ লম্বা সময় ধরে রাজনীতিকরণের কারণে তাদের ওপর যে আস্থাটা রাখার প্রয়োজন সেটি রাখতে পারছেন না ভোটাররা। তারাও এমন কাজ করছেন যার ফলে সেই আস্থার জায়গায় সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা খুবই কষ্টকর, খুবই কঠিন। আগেই বলেছি, আমাদের দেশে রাজনৈতিক পরিবেশের যে মূল বিষয়গুলো সেই জায়গায় এখনো পরিপক্বতার অভাব আছে। রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের এখানে সব সময় নিচের দিকে গেছে। মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি, চাটুকারিতা এসবের ওপর নির্ভর করে চলছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে কাজ করছে না। ফলে এ কাঠামোর মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও নানা বিতর্ক উঠেছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই দুটি নির্বাচনের সময় কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে বর্তমান নির্বাচনের সময় কেন নিচ্ছে?

এটার মূল কারণগুলো তো আমি বলতে পারব না। এটা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব চিন্তা, তারা এ বিষয়ে কখনো কোথাও কিছু বলেনি। তবে বাহ্যিক কারণগুলো আমি বলতে পারি। মোটা দাগে বলি, এখন বিশ্বে সহনশীল গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। এর ফলে দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ লেগেই আছে। একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দেখা যায়। আর কিছু দেশে গণতন্ত্র সংকীর্ণ হতে হতে একেবারে হাইব্রিড ডেমোক্রেসি অথবা ইলেকটেড অটোক্রেসির মধ্যে চলে এসেছে। ফলে গণতান্ত্রিক বিশ্বকে নেতৃত্বদানকারী পশ্চিমারা চায় গণতন্ত্র পৃথিবীতে আরো প্রচার পাক, প্রসারিত হোক। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে তারা শঙ্কার চোখে দেখছে। 

আমাদের এখানে তারা ২০১৪ ও ২০১৮ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। সেগুলো তাদের মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচন তো গ্রহণযোগ্য হয়নি, ২০১৮ সালের নির্বাচনেও যেসব কাণ্ডকারখানা হয়েছে, সেখানে যে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেটি কিছু পত্রপত্রিকায় এসেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছে। যারা ওই সময় নির্বাচন আয়োজনে ছিলেন তারা এখন সরাসরি স্বীকার করে নিচ্ছেন। তার পরও দৃশ্যমান ছিল। কাজেই সব কিছু মিলিয়ে ১৫ বছর এভাবে কেটে গেছে। এখন যে সংকট তৈরি হয়েছে, বিশ্ব ভাগ হয়ে যাচ্ছে। প্রথম ভাগে আছে উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলো। যেকোনোভাবে নির্বাচন আয়োজন করলেই বিশ্বের শক্তিধর দু-একটি দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তারা দাঁড়িয়ে আছে অন্য একটি বলয়ে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশও উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে যদিও এখন সেখানে কিছুটা ভাটা পড়ছে বলে মনে হয়। তার পরও তারা শুরু থেকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ। মাঝেমধ্যে শুনি তারাও বাংলাদেশে উদার গণতন্ত্রের প্রসার দেখতে ইচ্ছুক নয়। ফলে পশ্চিমারা এখানে নজর দিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ একটু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে হাজির রয়েছে। গত শতকে কমিউনিস্ট বনাম ক্যাপিটালিস্টের বৈশ্বিক একটা দ্বন্দ্ব ছিল। বিশ্ব একটা ঠাণ্ডাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন কমিউনিস্ট দেশগুলোও ক্যাপিটালিস্ট ইকোনমিতে চলে এসেছে। পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে যে বিভাজন হয়েছে, সেই বিভাজনে বাংলাদেশের অবস্থান না হলেও অন্যান্য প্যারামিটার্সে ধরা হচ্ছে আমরা দক্ষিণ-দক্ষিণ বলয়ে পড়ে গেছি। ফলে এখানে একটা ভূরাজনৈতিক বিষয় উঠে আসছে। সে কারণে বাংলাদেশের এ নির্বাচন যেন হাইব্রিড নির্বাচন না হয়ে যায়। ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হয় সেটি নিশ্চিত করার জন্যই পশ্চিমা দেশগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমাদের কাছে আমাদের নিয়ে সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। যদিও ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। কিন্তু পশ্চিমারা ভারতকে ওই চোখে দেখে না যেই চোখে সমর্থক শক্তি (নিরাপত্তা কাউন্সিলে যাদের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা আছে) বলতে যাদের বোঝায় তাদের দেখে। এখন সেই কারণে ভারতের কাছে এবং বিশ্বব্যাপী অন্য দেশের কাছে আমরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছি। তার ওপর আমরা বৃহত্তর মুসলিম দেশ। তরুণ জনসংখ্যা এশিয়ার দেশগুলোয় থাকলেও বাংলাদেশও কম যায় না। সেজন্য শ্রমশক্তিতে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। এসব কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। ফলে এ নির্বাচনের গুরুত্ব বেড়েছে। কারণ তারা জানে যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হয় তাহলে এ দেশের পরিস্থিতি অনেক খারাপ হবে এবং ভূরাজনৈতিক সমস্যাগুলো আরো প্রকট হয়ে উঠবে। 

ভিসা নীতি প্রয়োগসহ আর কোন কোন পদক্ষেপ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? নিলে সেটি নির্বাচনকেন্দ্রিক নাকি তার পর হতে পারে?

এটা তো নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ তারা তো স্পষ্ট করে কিছু বলছে না যে কাদের ওপর এ নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। এটা যাদের ওপর প্রয়োগ হয়েছে তাদের সন্তান বা তারা ওইসব দেশে যেতে বা যারা আছেন তারা অসুবিধায় পড়বেন। এছাড়া আরো কিছু প্রয়োগ করার পরিকল্পনা তাদের আছে কিনা আমরা জানি না। তবে আশঙ্কা আছে। কারণ তাদের যে অভিব্যক্তি সেটি এখন পর্যন্ত বেশ ভালো মনে হয় না। এ জায়গায় পরবর্তী সময়ে ভিসা নীতিই বহাল থাকবে নাকি নির্দিষ্ট করে কাউকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে, নাকি বাণিজ্যের ওপর কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে, নাকি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে না সেটি বোঝা যাচ্ছে না। কারণ কিছুদিন আগে আফ্রিকার চারটি দেশকে ভিসা নীতির আওতায় আনা হয়, পরবর্তী সময়ে তাদের বাণিজ্য তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাই এগুলোয় আমাদের শঙ্কার জায়গা তো থাকছেই। এরপরও কিছুদিন আগে ওয়াশিংটন থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমস্যা যদি হয় তাহলে তারা ব্যবস্থা নেবে। এখন কী ব্যবস্থা নেবে সেটি তো আমরা বলতে পারি না।

 গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচার বিভাগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। যদি সেটি সত্যিই আসে তাহলে তার প্রভাব এবং ব্যাপকতা কেমন হবে?

একজন বাংলাদেশী হিসেবে আশা করি এমন পরিস্থিতি যেন আমাদের না হয়। কারণ এটি দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য একদমই সুখকর হবে না। তবে আমি এত দিন যেভাবে দেখেছি, তারা এমন কিছু করে না যেটাতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি সাধন হয়। এখন ধরুন, যদি কোনো একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় তাহলে তাদের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। এখন এক জায়গায় আপনি এত বছর ধরে বাজার গড়ে তুলেছেন, সেটি এখন পরিবর্তন করে অন্য কোথাও বাজার তৈরি করা কঠিন। এটুকু বলতে পারি এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না।

বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করেছে। ইউরেনিয়ামের ব্যবহার নিয়ে নানা সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এখানে তেমন কিছুর শঙ্কা আছে কি?

এটা তো আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আওতার মধ্যে থেকেই করা হচ্ছে। এ সংস্থা আন্তর্জাতিকভাবে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা রাখে। সব দেশ থেকে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যে কেউ ইউরেনিয়াম আনতে পারবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, ইউরেনিয়ামকে আপনার অন্য পথে নিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আছে কিনা বা নিয়ে যাচ্ছন কিনা এসবের ওপর আইএইএর একটা পর্যবেক্ষণ থাকে। একই সঙ্গে সংস্থাটি নজর রাখে কতখানি ইউরেনিয়াম আপনি নিয়ে আসলেন, কতখানি ব্যবহার করলেন, কোথায় রাখছেন, কীভাবে রাখছেন, কীভাবে ব্যবহার করছেন, কারা সেখানে কাজ করছে সবকিছুই তারা নজরে রাখে। কাজেই ইউরেনিয়াম কোনোভাবে অন্য খাতে নিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের হয়েছে বলে আমি মনে করি না। এটা যদি ভারত-পাকিস্তানের দিকে দেখেন, আমাদের এখানে সেরকম ম্যানপাওয়ার তৈরি হয়নি বা হলেও সেটি করাটা কঠিন হবে। কারণ গোটা বিশ্বের চোখ রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে, বিশেষ নজর থাকে এসব দেশের মধ্যে যারা ইউরেনিয়াম ব্যবহার করছে তাদের ওপর। ফলে এখানে অন্য কিছু করা প্রায় অসম্ভব। 

ইউরোপে মোটামুটি পরমাণু বিদ্যুৎ ডাল-ভাতের মতো হয়ে গেছে। এখন ইরান কিন্তু ইউরেনিয়ামকে আরো রিফাইন করে অস্ত্র তৈরি করছে বা করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেক দেশ আছে যারা ইউরেনিয়াম ব্যবহার করছে। সেটি করার সামর্থ্য আমাদের আছে কি না? বললেই তো হবে না। আমাদের এখন বলা চলে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ। সেই জায়গায় আমাদের পক্ষে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম করা সম্ভব হবে না। হলে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা একটা বিপদের মধ্যে পড়তে পারি। আমি এটা নিয়ে খুব চিন্তিত না। এখানে একটি কথা আছে, অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয় আছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা, নিষেধাজ্ঞা, ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি এবং বিদেশী ঋণ বেড়ে যাওয়ার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা কি তৈরি হচ্ছে?

হ্যাঁ। এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ আমাদের নিরাপত্তা বলেন, সামাজিক অবস্থা বলেন, আমাদের উন্নতি বলেন সব কিছু নির্ভর করছে পেটের ওপরে। আলু বাংলাদেশে একসময় রফতানি করতে হবে ইত্যাদি। এখন সেই আলু আমদানি করতে হবে। এখন ভারত বা অন্য কোনো দেশ থেকে আলু আনতে হবে। বর্তমান বাজারে আলুর কেজি ৬০-৬৫ টাকা, পেঁয়াজের কেজি ১৪০-১৫০ টাকা। এটা ভাবা যায়! কাজেই অর্থনীতির ওপর তো চাপ আমরা এখনই অনুভব করছি। বাজারে ডলার নেই। ডলারের দাম বেড়ে এখন ১২৫, কোথাও কোথাও ১৩০ বিক্রি হচ্ছে। ব্যাংকে গেলে বলছে ডলার নেই। বাইরে থেকে নিলে উচ্চমূল্য। তার মধ্যে আগামী বছর থেকে শুরু হবে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়। আমাদের অর্থনীতিবিদরা হরহামেশা যে ইঙ্গিতগুলো দিয়ে আসছেন তাতে বোঝা যায়, বর্তমান অবস্থা চলমান থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমরা বড় ধরনের একটা অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে পড়ব। সেটি সাধারণ মানুষকে আক্রান্ত করবে। তারা রাজনীতি যতটা বোঝে, সেই জায়গায় দৈনন্দিন জীবনযাপনের যে খরচ, সেই খরচে তাদের একটি নজর আছে। সবারই আছে। এখন দেখেন, এ দুর্মূল্যের বাজারে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছেন। মালিকরা বলছেন আমাদের রফতানি ঠিকমতো হচ্ছে না। এই যে দুই পক্ষেরই শক্ত যুক্তি থাকা এবং দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়ে যাওয়া, এটি কিন্তু অশনিসংকেত। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাইরের কোনো হুমকি আসবে তা আমি মনে করি না। তবে অভ্যন্তরীণ কিছু হুমকি আছে, যেগুলো জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত সে ধরনের কিছু ঘটতে পারে। সেই অভ্যন্তরীণ সমস্যাটা বাইরের আগ্রাসন বা হামলা থেকে অনেক বেশি গুরুতর। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

রাজনীতিতে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতেই হবে। যদি সেটি না থাকে তাহলে কোনো উন্নতিকেই উন্নতি বলা যাবে না। কারণ অবকাঠামো উন্নতি তো না, সেটির ব্যবহারকারীর উন্নতি তো হতে হবে। এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েতে কেন বাসগুলো উঠছে না? কারণ ওই টাকা দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে ব্যবহার করার মতো অর্থনৈতিক উন্নতি সাধারণ মানুষের হয়নি। অন্যদিকে তাদের কোনো স্টপেজ নেই, উঠলে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় গিয়ে নামতে হবে। সে কারণে মেট্রোরেলে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে সেভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। অবকাঠামো উন্নতি যাদের জন্য করব তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না করলে তো কোনো লাভ হবে না।