বিদেশে দক্ষ শ্রমিক রফতানির লক্ষ্যে ও দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে তরুণদের প্রশিক্ষণার্থে সারা দেশে ১০০ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপনের যুগোপযোগী পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। কিন্তু অর্থ সংকটে প্রথম ধাপে মাত্র ৩০টি কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় ‘‌বিভিন্ন জেলায় ৩০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায়। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্পটির অধীনে ২৭টি টিটিসি নির্মিত হয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েও কাজ পাননি প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ। বিএমইটি বাস্তবায়িত প্রকল্পটির ওপর সরকাররের মনিটরিং প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনের বরাতে বণিক বার্তায় বলা হয়েছে, যুগোপযোগী প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের অভাব, ব্যবহারিক বিদ্যার সুযোগ না থাকা, প্রশিক্ষক সংকটসহ নানা জটিলতায় সরকারের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ এ টিটিসিগুলো। ফলে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ অবস্থায় সেন্টারগুলোর টিকে থাকাই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী দুটি প্রধান খাতের একটি প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা ঘরে তুলতে হলে আমাদের বিদেশে সুপ্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি পাঠানো আবশ্যক। ভারত, শ্রীলংকা, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো যেখানে প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি পাঠিয়ে বড় অংকের রেমিট্যান্স আয় করছে সেখানে আমাদের বেশির ভাগ প্রবাসী শ্রমিক একেবারে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ বা প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যাচ্ছেন। এতে আমাদের শ্রমিকরা ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনি দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। 

পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও পরামর্শ, দক্ষতার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের স্থানীয় ও বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে নির্মাণ করা হয়েছিল কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো। সেখানে মূলত কম্পিউটার অপারেশন, গার্মেন্ট, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, সিভিল কনস্ট্রাকশন, মেশিন টুলস, ওভেন গার্মেন্ট মেশিন অপারেটর, বিদেশগামী কর্মীদের তিনদিনের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস, হাউজকিপিং কোর্স, ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফ্যাব্রিকেশনসহ বিভিন্ন কাজে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ টিটিসিতে দেখা যায়, সেখানে ঠিকমতো ক্লাস হয় না, প্রধান প্রশিক্ষকসহ দায়িত্বশীলরা নিয়মিত কেন্দ্রে আসেন না, এমনকি ইচ্ছেমাফিক তারা ক্লাসও বন্ধ করে দেন কিংবা ক্লাসের সময় পরিবর্তন করেন বিনা নোটিসে। 

সরকারের প্রকল্প মনিটরিংয়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও টিটিসিগুলোর নানা অনিয়ম উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম বছর কোর্সগুলোয় ভালো সাড়া মেলে। তবে টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে কাজে যুক্ত হলেও বাকি ৭০ শতাংশই কোনো কাজ পাননি। তাই ধীরে ধীরে তরুণদের আগ্রহ কমতে শুরু করে। 

আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ছয় বছরে ২৭টি টিটিসি থেকে ১০টি বিষয়ে সাড়ে তিন লাখ তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ২০১৭ সালে চালু হওয়া কেন্দ্রগুলোয় পরের বছরেই প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়। কোর্স করলেই বিদেশে বা দেশে চাকরি পাওয়া যাবে, এ আশায় ব্যাপক সাড়া পড়ে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে আশানুরূপ কাজ না পাওয়ায় প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে। ২০১৮ সালের পর আর কোনো বছরেই প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেনি।

তরুণদের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণ শেষে বিদেশে যেতে পেরেছেন মাত্র ৮-১২ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী। আর দেশে কাজ পেয়েছেন ১৫-২০ শতাংশের মতো। বাকি ৭০ শতাংশই কাজ না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত। সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কোর্স করলেই চাকরি—এমন আশা বাস্তবে না মেলায় তরুণদের আগ্রহে ভাটা পড়ে। প্রশিক্ষণগুলো ২০০৯ সালে পরিকল্পনা করা হলেও সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়ন ও বাজারের চাহিদাভিত্তিক না হওয়ায় তা কোনো কাজে আসছে না বলে মনে করছে আইএমইডি। 

আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশ থেকে উন্নত প্রশিক্ষিত শ্রমিক প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে। জনশক্তি রফতানিতে বিদ্যমান কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে। এতে বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পাশাপাশি দেশেও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা। 

গত ১৩ জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স এসেছে ১৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সপ্তম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স উপার্জনকারী বাংলাদেশে এসেছে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। প্রতিবেশী দেশ ভারতে রেমিট্যান্স এসেছে ১১ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা বছরওয়ারি ২৪ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি পাকিস্তান আমাদের চেয়ে বেশি (৩ হাজার কোটি ডলার) রেমিট্যান্স পেয়েছে। তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালও রেমিট্যান্সে নবম স্থানে উঠে এসেছে। আমরা যদি যথাশিগগির সুপ্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগ না দিই তাহলে বিশ্ববাজারে নেপাল, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর কাছে সুযোগ হারাব।  

কারিগরি ও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা জনশক্তিকে দক্ষ সম্পদে রূপান্তর করতে পারি। এক্ষেত্রে দেশে যে ৩০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে তা একটি ভালো উদ্যোগ ছিল। কিন্তু পুরনো কারিকুলাম, প্রশিক্ষকস্বল্পতা, দায়িত্বশীলদের খামখেয়ালিপনায় এ ভালো উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখছে না। বিদেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা ও বাজার বাড়লেও সে অনুপাতে দক্ষ কর্মী বাড়ছে না। এর একটি বড় কারণ আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের চ্যালেঞ্জে উতরে যেতে পারছে না। টিটিসিগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে তৈরি করতে পারলে অবশ্যই দক্ষ জনশক্তির চাহিদা মিটবে, বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়বে আর দেশে আসবে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহারই সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।