সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের এক সংবাদ সম্মেলনে দেশ থেকে বড় শিল্প গ্রুপগুলো অর্থ পাচারে জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আমদানি ও রফতানির আড়ালে মূলত অর্থ পাচার হয়ে থাকে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। বেশকিছু জালিয়াতির খবরও গণমাধ্যমে এসেছে, যা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার রোধে আরো সক্রিয় হতে হবে।
অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয় বাণিজ্যের আড়ালে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান জানিয়েছেন, আমদানি পণ্যের দাম ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকিং ও কাস্টমস পরিভাষায় এ বাড়িয়ে দেখানোর নাম ‘ওভার ইনভয়েসিং’। বাংলাদেশের অর্থ পাচারের বেশির ভাগ সংঘটিত হয় আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যে ‘মিস ইনভয়েসিং’ বা চালান জালিয়াতির মাধ্যমে। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যাপক কর ফাঁকি সংঘটিত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়? সহজ কথায় তার জবাব হলো, ওভার ইনভয়েসিং। অর্থাৎ কর ফাঁকি দিতে, কোম্পানির মুনাফা লুকাতে এবং অন্যান্য কারণে পণ্য আমদানি ও রফতানিতে অনেক সময় পণ্যের প্রকৃত মূল্য দেখানো হয় না। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পণ্য সরবরাহকারী কিংবা ব্যাংক বা শুল্ক কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ অবশ্যই থাকে। যদি বাড়তি ব্যয় দেখানো না হতো, তাহলে আমদানি ব্যয় এত হতো না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আন্ডার ইনভয়েসিং বা পণ্যের দর কম দেখানোর চিত্র তুলে ধরেছিলেন এক আলোচনা সভায়। এর মাধ্যমে একদিকে কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে পণ্যমূল্যের বাকি অংশ অবৈধভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। তদন্তে দেখা গেছে, কিছু পণ্য ২০ থেকে ২০০ শতাংশ ওভার ইনভয়েসিং দিয়ে আমদানি করা হয়েছে। এর আগে আমরা খবর দেখেছি, বিদেশে টাকা পাচারে বাংলাদেশ শীর্ষে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রাক্কলন বলছে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং বা কম মূল্য দেখানো এবং ওভার ইনভয়েসিং বা বেশি মূল্য দেখানোর কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের পরিসংখ্যানের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে।
বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিংয়ের সুযোগ ও ব্যাপকতা অন্য মাধ্যমের চেয়ে বেশি। বর্তমান বাস্তবতায় এত টাকা বিদেশে পাঠানোর জন্য সঙ্গে বহন করা প্রায় অসম্ভব। বিমানবন্দরগুলোয় নানা নিরাপত্তা ও কাস্টমসের নজরদারি এখন আগের তুলনায় বেশ কঠোর। এখন ইচ্ছা করলেই স্যুটকেস ভর্তি টাকা নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যায় না। ঘোষণা ছাড়া কোনো অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে পার হওয়ার ঝুঁকি আছে পদে পদে। এ ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও লক্ষণীয়। তাই বিকল্প হিসেবে বড় ধরনের অর্থ পাচারের জন্য বাণিজ্যভিত্তিক নানা অপকৌশল ব্যবহার করা অপেক্ষাকৃত শ্রেয়। বলতে গেলে, আমদানি ও রফতানি সুবিধাদির অপব্যবহার করা পাচারকারীদের প্রিয় মাধ্যম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যের মাধ্যমে আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে ব্যাংক চ্যানেলে যেসব লেনদেন হয় তা উন্মুক্ত এবং যেকোনো সময় তা যাচাই ও তদন্ত করা যায়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ঘোষণা থাকে বাস্তবে পণ্যের প্রকৃত মূল্য অনেক বেশি। অথবা এক পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য আনা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ হয়েছে ১ কোটি টাকার কম। কিন্তু ব্যাংকের বাইরে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এ বিপুল পার্থক্যজনিত অর্থ হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা সামনে আসেনি বা আমরা জানছি না। ব্যাংকের মাধ্যমে লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহার করে যে অর্থের লেনদেন হয় তার সমান্তরাল আরেকটি অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার হচ্ছে। এ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলটি মানি লন্ডারিংয়ের জন্য উর্বর স্থান। এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে একটা মাধ্যম মাত্র। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুসারে এর আওতা আরো ব্যাপক। শুল্কসংক্রান্ত বা চোরাচালানের অপরাধসহ আরো ২৬টি সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ লেনদেন, ব্যবহার, বিনিয়োগ, পাচার বা ভোগ হলেই তা মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞাভুক্ত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। এর অর্থ হলো, চোরাচালান বা শুল্কসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটন করে যেকোনো মুনাফা বিদেশে পাচার হোক বা না হোক দেশের অভ্যন্তরে তা ব্যবহার কিংবা বিনিয়োগ হলেই মানি লন্ডারিং হিসেবে বিবেচিত হবে। মানি লন্ডারিংয়ের অন্যতম কৌশল হলো ‘ডার্টি মানি’র উৎস লুকানো বা গোপন করা কিংবা সত্যকে অসত্য দিয়ে আড়াল করা। ঘটনাগুলোয় ব্যাংক ও কাস্টমসের ঘোষণা বা কাগজপত্রে আছে এক রকম তথ্য; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পণ্য বা পণ্যমূল্য আছে ভিন্ন রকম। ঘোষণা ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্যের মূল কারণ হলো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শুল্ককর ফাঁকিসংক্রান্ত আর্থিক লাভ বা পাচারের সংযোগ। এ জালিয়াতি বা মিথ্যা ঘোষণাই হচ্ছে বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিংয়ের ভিত্তি। এর মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে অবৈধ মুনাফা ও সম্পন্ন হচ্ছে পাচার। এর ব্যবহারও হতে পারে নিয়ন্ত্রণহীন। প্রচলিত আইন লঙ্ঘন হচ্ছে মানি লন্ডারিংয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুসারে ২৬ ধরনের অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে যেকোনো অর্থ অর্জন ও ব্যবহার করলেই তা মানি লন্ডারিং হিসেবে গণ্য হবে। উল্লিখিত ঘটনাগুলোর প্রত্যেকটিতে কাস্টমস আইনসহ অন্যান্য আইন ভঙ্গের উপাদান রয়েছে।
বলা প্রয়োজন, বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৭টি ‘পেডিকেট অফেন্স’ বা সম্পৃক্ত অপরাধের মধ্যে শুধু একটির (দুর্নীতি ও ঘুস) অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের। বাকিগুলো সরকারের ছয়টি সংস্থা— সিআইডি, এনবিআর, বিএসইসি, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কাস্টমস, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত। অপ্রিয় হলেও সত্য, এসব সংস্থা বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে নজির সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাইসওয়াটারহাউজকুপারস ও গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ অন্যান্য সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিংহভাগ অর্থই ব্যবসা-বাণিজ্য বা আমদানি-রফতানির আড়ালে পাচার হয়ে থাকে। দেশ থেকেও একই প্রক্রিয়ায় প্রচুর অর্থ ও সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। বস্তুত এসব বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দুদকের হাতে ন্যস্ত না থাকায় পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস, পেন্ডোরা পেপারস ছাড়াও অবৈধ সম্পদের অন্যতম গন্তব্যস্থল মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্প, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও সুষ্ঠু তদন্ত শেষে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না। তবে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংককেই বড় পদক্ষেপটি নিতে হবে। তারা আগের চেয়ে অনেক সচেতন এখন। তার পরও যেসব অভিযোগ সামনে আসছে সেগুলো যাচাই-বাছাইপূর্বক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বাণিজ্যের প্রসার বহুগুণ বেড়েছে। ১৯৭৩ সালের তুলনায় এর পরিমাণ প্রায় ৫৭৩ গুণ বেশি; ২০৪১ সাল নাগাদ এর পরিমাণ আরো বাড়বে। এ অনুপাতে অপবাণিজ্যের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে মানি লন্ডারিংয়ের প্রবণতার রাশ টেনে ধরা দরকার। বাণিজ্যের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের এ ব্যাপ্তি বিবেচনায় কাস্টমস কর্তৃক প্রতিরোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বর্ণিত ক্ষমতা অনুসারে বাংলাদেশ কাস্টমসের সক্ষমতাকে বাড়ানো এবং এর সহায়ক ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে একটি বিশেষায়িত পৃথক ইউনিট গঠন করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিল রেখে এবং উত্তম চর্চা অনুসারে কাস্টমসের আধুনিকায়নে সময়াবদ্ধ দৃশ্যমান অগ্রগতি আনা প্রয়োজন। দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাটা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। দেশে এ-সংক্রান্ত কিছু নজির স্থাপন করতে পারলে পাচারকারীরা চাপে পড়বে; বিদেশমুখিতার মোহে ভাটা পড়বে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাচার অন্যতম প্রতিবন্ধক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশ থেকে প্রতি বছর নানাভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থ পাচারের এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব অপরাপর সংস্থার পাশাপাশি দুদকের ওপর ন্যস্ত হলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে, তা বলাই বাহুল্য।










