কোটা সংস্কার আন্দোলনে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধসহ কারফিউ জারি করায় আমদানি-রফতানিসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে য়ায়। ফলে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, চাঁদাবাজি, বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়তা, অনেক কারখানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পোশাক কারখানায় বারবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন মাসের অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকেও। অনেক শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ না আসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বাড়ছে বেকারত্ব। দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় দিশাহারা সাধারণ মানুষ। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলায় ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারকে চারটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রথমত, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা; দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকি বাড়ানো এবং চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটমুক্ত করা; তৃতীয়ত, দেশের শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং চতুর্থত, বন্যাকবলিত এলাকায় কৃষি উৎপাদন কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে বীজসহ কৃষি উপকরণ বিতরণ করতে হবে।

শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমতে থাকা অর্থনীতির জন্য মোটেই শুভবার্তা নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ জিডিপিতে এ খাতের ভূমিকা অনেক। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ে। বিবিএসের তথ্যানুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পতনের ধারা অব্যাহত থাকায় এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিল্পের প্রবৃদ্ধি চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে। সে বছর প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ব্যতীত এ খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কঠিন। বিগত সরকারঘনিষ্ঠদের ব্যাংক লুটপাট, দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা, লাগামহীন দুর্নীতি, ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, রিজার্ভ সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করে। দেশের ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে। জ্বালানির অভাবে চাহিদা অনুসারে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক হয় নিম্নগামী। এছাড়া বাংলাদেশের ঋণমান সূচকও নিচে নেমে আসে। ফলে তৈরি হয় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা। বিনিয়োগ, প্রাথমিক পণ্য আমদানি ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। সিমেন্ট শিল্পের ক্লিংকার, টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনচালিত মোটর শিল্পের উৎপাদনও নেতিবাচক ধারায় নেমে এসেছে। কাঠ ও ফার্নিচার জাতীয় বিলাসপণ্যের বাজারেও ছিল ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি।

বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। এরপর রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব ও ক্রয়ে জটিলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংকের ঋণ জোগানে সক্ষমতার অভাব এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যোগসূত্র ও সমন্বয়ের অভাব। এগুলোর বাইরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের অভাবও দায়ী। এখন এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে অন্তর্বর্তী সরকারকে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

গত আগস্টে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলায়গুলোয় বন্যায় কৃষিসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফেনী ও নোয়াখালী জেলা। এ দুই জেলার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে ৪৮ শতাংশ বাড়িঘর। এছাড়া দুই জেলার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও সুপেয় পানির সুবিধা শতভাগ অচল হয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে, শুধু ফেনী জেলায় অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ফেনীর ছয় উপজেলায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হওয়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কৃষক পরিবারের ক্ষতি হয়েছে ৫২৫ কোটি টাকার বেশি। এসব এলাকার কৃষিজমিতে তিন-চার ফুট বালি জমে গেছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে ফসল উৎপাদনে।

বন্যার ক্ষত কাটাতে যেসব অঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব এলাকায় কৃষি উৎপাদনসহ সব ধরনের সেবা ও উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সরকারকে বেশি নজর দেয়া দরকার। প্রয়োজনে সরকারের উদ্যোগে কৃষককে বীজসহ কৃষি উপকরণ বিতরণ করতে হবে। যদিও এখনো কোনো সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নজরে আসেনি। এ এলাকায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে। শুধু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল নয়, বন্যাকবলিত সব এলাকায় সরকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা কৃষি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সংস্থাটি ‘‌সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানায়, আগস্টের বন্যায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ ও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য খাতের মতো আর্থিক খাত সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে। এর ইতিবাচকতা স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর ফল পেতে আরো সময়ের প্রয়োজন। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে থেকেই বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য বিক্রি কমে যাওয়া, সুদের উচ্চ হার, শ্রম অসন্তোষ, ডলার সংকটে শিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা ‌এরই মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে দেশের অর্থনীতিতে।

দেশের কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ (পিই) যৌথভাবে প্রতি মাসে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচক প্রকাশ করে। গত সোমবার সেপ্টেম্বরের পিএমআই প্রকাশ করা হয়েছে। ১০০-এর মধ্যে পিএমআই পরিমাপ করা হয়। অর্থনীতির সম্প্রসারণ বোঝাতে এ মান ৫০-এর অধিক হতে হবে এবং সংকোচনের ধারা বোঝাতে ৫০-এর নিচে। তবে সেপ্টেম্বরে দেশের পিএমআই সূচক কিছুটা আশা সৃষ্টি করেছে। আগের মাসের তুলনায় এ মাসে বাংলাদেশ পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৬ দশমিক ২ পয়েন্ট বেড়ে ৪৯ দশমিক ৭-এ পৌঁছেছে। দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বোঝাতে পিএমআই সূচককে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন বিনিয়োগকারীরা। সাধারণত পিএমআই সূচক ৫০ বা তার ওপরে হলে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়।

সরকার আর্থিক খাত সংস্কারে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও কিছুটা প্রভাব পড়ছে এ খাতে। আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে, তবে স্থিতিশীলতা দরকার। এখনো মানুষ আতঙ্কে আছে কখন কী হয়। সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে প্রভাব পড়ছে না। বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি সক্রিয় থাকায় উল্টো নিত্যপণ্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। সর্বোপরি জনআস্থা বাড়াতে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়াতে দরকার সরকারের সঠিক পরিকল্পনা।