দেশে বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিতে ২০০৪ সালে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের (এমএনও) যাত্রা শুরু হয়। যদিও প্রতিষ্ঠার দুই দশকেও বাজার প্রতিযোগিতা, এমনকি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পারেনি এমএনও। এ অবস্থার জন্য যেমন একদিকে দায়ী বিনিয়োগস্বল্পতা, অন্যদিকে মোবাইল নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এর বাইরে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির ইকোসিস্টেম, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও তার অধীনে এ খাতের দক্ষতা না থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রদান, যুগোপযোগী প্যাকেজ ঘোষণা না করা, সেবার মান বৃদ্ধিতে উদ্যোগী না হওয়া। এমন গুরুতর ঘাটতির মধ্যে অবস্থান করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অনেকটা অসম্ভবই বটে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিতের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে বাজারে না থাকার উপযোগী হয়ে পড়েছে কোম্পানিটি।

বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিতের জন্য প্রথমেই রাষ্ট্রায়ত্ত এ অপারেটরকে লাভজনক কোম্পানিতে পরিণত করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এ মানসিকতা ছাড়া কোনো কোম্পানি বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। আর কোম্পানি যদি লাভজনক হতে না পারে তবে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো যেভাবে গ্রাহকসেবা দিচ্ছে, তার চেয়ে ভালো সেবা প্রদান সম্ভব হবে না। লাভজনক অবস্থায় না দেখলে কিংবা লাভজনক হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারলে বিনিয়োগকারী হিসেবে একসময় সরকারও বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। এতে অন্য অপারেটররা বাজার দখলের মাধ্যমে মূল্যহীন করে তুলবে এ অপারেটরকে। আবার বর্তমান প্রেক্ষাপট বিচারে সরকারের একার পক্ষে এ অপারেটরকে লাভজনক করে তোলা কঠিন।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে কোম্পানিটি বর্তমানে সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অব্যাহতভাবে গ্রাহক হারানো ও বিভিন্ন সেবার মানদণ্ডে টেলিটকের পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেলিটকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতি উন্নয়নে তথা গ্রাহকসেবার মান বাড়িয়ে বাজারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ হতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের মনোযোগী হতে হবে।

টেলিটক যাত্রার শুরুতেই মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল তুলনামূলক ব্যয়সাশ্রয়ী সেবা প্রদানের মাধ্যমে। দেশীয় ব্র্যান্ড, মিনিটপ্রতি ৬ টাকার পরিবর্তে ৪ টাকায় কথা বলার সুযোগ ও টিঅ্যান্ডটি সেবা প্রভৃতি কারণে গ্রাহকরা এটি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। উদ্বোধনের পরই লাখ লাখ মানুষ এর গ্রাহক হন। কিন্তু কালক্রমে এটি পিছিয়ে পড়েছে। বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিটিআরসির (১০০ শর্টকোড) কল সেন্টার থেকে পাওয়া ২ হাজার ৮৫টি অভিযোগের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়নি বা এখনো সমাধানের অপেক্ষায় আছে। যেখানে বেসরকারি টেলিকম অপারেটরে অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৯৮ শতাংশের বেশি। আবার টেলিটকের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার দুই দশকেও তারা দেশের শতভাগ এলাকায় টুজি সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। দেশের মাত্র ৫৯ শতাংশ এলাকায় টুজি, ৪৯ শতাংশ এলাকায় থ্রিজি ও ৩৫ শতাংশ এলাকায় ফোরজি সেবা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। দেশের ৬৪ জেলায়ও ফোরজি সেবা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি অপারেটরটির পক্ষে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের পক্ষ থেকে গ্রাহকসেবার জন্য প্রকল্প উত্থাপন, অর্থছাড় ও কমিশন ভাগাভাগির অংশীদার হয়ে উঠেছে এ নেটওয়ার্ক অপারেটর।

জানা যায়, টেলিটকের সঙ্গে তিন মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের নানা সময়ে চুক্তি হয়। এসব চুক্তির মধ্যে রয়েছে বাংলালিংক ও টেলিটকের টাওয়ার ব্যবহার, টেলিটক-রবি ন্যাশনাল রোমিং সেবা, টেলিটক-গ্রামীণফোন আজীবন মেয়াদের ডাটা প্যাকেজসহ এক দশকে অন্তত ১৫টির বেশি চুক্তি হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর সূত্রমতে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-আমলাসহ টেলিটকের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসহযোগিতায় সেসব চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। অসহযোগিতার কারণ হিসেবে দর্শানো হয় বাজারে ব্যবসা করার মনোভাব না থাকা।

ব্যবসায়িক মনোভাব ও উপযোগিতা ছাড়া এটিকে কখনই প্রতিযোগিতা সক্ষম ও লাভজনক করে তোলা যাবে না। টেলিটক কর্তৃপক্ষের মতে, বাজারের অন্য অপারেটরগুলোর তুলনায় টেলিটকের সাকল্যে বিনিয়োগ ২-৩ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রাহক আকর্ষণ, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সম্ভব হয় না। এ কারণে টেলিটকের সেবা শতভাগ এলাকায় বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিনিয়োগ পেলে তারা কাজ করতে পারবে।

টেলিটকের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো বিনিয়োগ। কারণ এটি কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো বিনিয়োগ করতে পারে না। টেলিটকের অন্য তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর ভেতর গ্রামীণফোন প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, রবি ৩৩ হাজার কোটি ও বাংলালিংক ২৪ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বিনিয়োগ শুরু করে। অন্যদিকে, টেলিটক মাত্র ৬৪২ কোটি টাকা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এ খাতে প্রবেশ করে। সময়ের আবর্তনে টেলিটকের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিনিয়োগ বহুগুণে বাড়লেও টেলিটকে বিনিয়োগ সেভাবে বাড়েনি। তাই এটিকে প্রতিযোগিতা সক্ষম করতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সময়মতো অর্থছাড় হতে হবে।

এদিকে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে টেলিটককে অনেক নেটওয়ার্ক টাওয়ার, বিটিএস ও হার্ডওয়্যার ক্রয় করতে হবে না। সুতরাং সম্পদ বা বিনিয়োগস্বল্পতা বিবেচনায় নিয়ে টেলিটকের অন্য অপারেটরদের সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজার দখলের উপযোগী হওয়ার চেষ্টা জারি রাখতে হবে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নতুন সেবা ও প্যাকেজ সাশ্রয়ী মূল্যে আনতে হবে। এরজন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টেলিজেন্স সেবা, ডাটা অ্যানালাইটিকসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতায় থাকতে হলে কাঠামোগত বৈষম্য দূর করাও আবশ্যক, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বেতন কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। নয়তো যোগ্য ব্যক্তিরা এখানে যোগদান করতে আগ্রহী হবে না। এতে দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিত কঠিন হয়ে পড়বে। সারকথা, টেলিটকের সংস্কার ও পুনর্গঠন আবশ্যক।

মুনাফামুখী না হয়ে মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে সরকারি কোম্পানি গঠন করা হয়। কিন্তু যদি পণ্য ও সেবার মান ভালো ও সাশ্রয়ী না হয় তবে সেটি বেসরকারি খাতে একচেটিয়া ব্যবসার পথকে সুগম করে। তাই টেলিটককে লাভজনক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তোলার বিকল্প নেই।