বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়েছে। এজন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) নিজস্ব ও যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস (আইপিপি) ও ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র (রেন্টাল-কুইক রেন্টাল)। দেশের চাহিদা মেটাতে পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টের (পিপিএ) ভিত্তিতে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎই কিনতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। আইপিপি থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে তা কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি বছরই বিপিডিবির দেনা বাড়ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ৮৫ হাজার ৬০৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে নেয়া হয় ৪০ হাজার ১৭৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। বেশি মূল্যের এ বিদ্যুৎ নিতে গিয়ে বিপিডিবিকে এ খাতে মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ গুনতে হয়েছে। যেখানে পাঁচ-ছয় বছর আগেও এ ব্যয় মোট খরচের অর্ধেক ছিল। এদিকে আইপিপি থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে তা কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি বছরই বিপিডিবির দেনা বাড়ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপিডিবির নিজস্ব ও যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের লাভবান করতে বিপিডিবি এ সুযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক তিনটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলতি বছর চালু হওয়ার কথা রয়েছে। বেসরকারি খাতের নতুন এ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ২০১৯ সালে ক্রয় চুক্তি করে বিপিডিবি। আর এসব চুক্তিতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ডলারে হিসাব করা হয়। সে সময়ে প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে চুক্তি করা হলেও তখন ডলারের বাজারদর ছিল ৮৫ টাকার মতো। বর্তমানে ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৯ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এ তিনটি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ মূল্য কিংবা ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারের চলতি বিনিময় হার অনুযায়ী দিতে হবে। এক্ষেত্রে আইপিপি থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় বিদ্যুৎ কেনাকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আত্মঘাতী পথ হিসেবে গণ্য করছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আইপিপিগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার দরকার ছিল।
বেসরকারি এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবি ডলারের মাধ্যমে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে। কিন্তু অধিকাংশ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ও ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারের চলতি বিনিময় হার ধরে টাকায় পরিশোধ করা হয়। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটের কারণেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিল বকেয়া পড়েছে।
সর্বোপরি বিদ্যুৎ ক্রয়ে খরচ বৃদ্ধির পেছনে এ খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের অনুপস্থিতির দিকটি বিশেষজ্ঞরা আলোকপাত করছেন। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার দিকটিকে প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ করা হচ্ছে। কেননা এসব পিপিএ চুক্তির পুরো মডেলই অপ্রতিযোগিতামূলক। এসব চুক্তিতে ভোক্তা স্বার্থের চেয়ে উদ্যোক্তাদের আর্থিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যে কারণে বিগত বছরগুলোতে কয়েক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়লেও তাতে আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের উদ্যোক্তারাই শুধু লাভবান হয়েছেন। এতে একদিকে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে ক্রমাগত লোকসান দেয়ায় বিপিডিবি অনেকটা দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি ও ঋণ ব্যতীত রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থার কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এমনকি সংস্থাটি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। এর পাশাপাশি ঋণের দায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের লোকসান বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা না চাপাতে এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মাধ্যমে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দেশটির সরকার। এর মধ্যে ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। এমনকি বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের বিকাশ ঘটেছে। তার পরও যথাযথ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারায় দেশটির বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবাই লাভবান হয়েছেন। ফলে ভারত সরকারের জন্য বিদ্যুৎ খাত কখনই বড় ধরনের আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দেখা দেয়নি।
মূলত প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দেশটির বিদ্যুৎ কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর বিপরীত অবস্থা দৃশ্যমান। যে কারণে বর্তমানে অনুসৃত পিপিএ মডেল অনুযায়ী, বিপিডিবি উৎপাদন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। এ লোকসানকে ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করতে হচ্ছে, যা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। আমরা বিদ্যুৎ খাতে এ বিশৃঙ্খলার অবসান চাই। এজন্য বেসরকারি খাত থেকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিদ্যুৎ কেনা হোক। এর পাশাপাশি সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাও বৃদ্ধি করা দরকার। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মুক্তবাজারে প্রবেশের বিকল্প নেই বলে আমরা মনে করি। এজন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপের ভিত্তিতে স্মার্ট গ্রিড লাইন তৈরি করতে হবে এবং মাল্টিপল বায়ার তৈরি করতে হবে, যাতে বিপিডিবির পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিগুলো এককভাবে উৎপাদন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ে সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলতে পারে। ফলে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে এবং বিদ্যুতের দাম কমে আসবে বলে আশা করা যায়।










