তরুণ সমাজ একটি দেশের সম্পদ। যে দেশের তরুণরা স্বপ্ন দেখতে পারে, শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস বোনে, সে দেশ উন্নতির সোপানে দ্রুত অগ্রসর হতে সক্ষম। কিন্তু তরুণদের স্বপ্ন ও উদ্যমকে অবহেলা করে যদি সামনে এগোনোর চিন্তা করা হয়, তাহলে সে অগ্রযাত্রা একসময় ভেস্তে যায়। তাই তরুণ জনসম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য তরুণরা যেন দেশের উন্নতিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে পারে, সে রকম পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের মোট শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণদের ৪২ শতাংশ বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। অনিশ্চিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়া, গুণগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের স্বল্পতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগের অভাব এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শঙ্কার কারণেই তাদের এ আগ্রহ। তবে বিদেশে যাওয়ার পর সংকটের সমাধান হলে ৮৫ শতাংশই আবার দেশে ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড জাস্টিস সেন্টারের ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৩’ শীর্ষক যৌথ সমীক্ষায় বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশের যুবসমাজের অবস্থান, সমসাময়িক ভাবনা ও প্রত্যাশা জানতে বিওয়াইএলসি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচনের আগে এ সমীক্ষা পরিচালনা করে।
জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও সুশাসন, তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিপ্রায়বিষয়ক এ জরিপের ফলাফলে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগ দুটিই উঠে এসেছে। দেশের আট বিভাগের ৫ হাজার ৬০৯ তরুণ-তরুণীর মাঝে পরিচালিত জরিপটিতে দেখা যায়, ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশই দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন। এর মধ্যে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, তাদের যে দক্ষতা রয়েছে দেশে সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান নেই। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই মনে করেন ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ এবং ৪০ দশমিক ৮ শতাংশের ধারণা, দেশে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কম। এছাড়া ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে দেশ ছাড়তে ইচ্ছুক ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী।
বস্তুত রাষ্ট্র তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করছে না বলে ক্ষোভ রয়েছে তরুণদের। যার ফলে তারা উচ্চ শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন আর দেশে না ফিরে সেখানেই উন্নত জীবনের জন্য থেকে যাচ্ছেন। আর এ রকম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ তরুণদের মেধা প্রকৃত অর্থে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে না এটিই অনুমেয়। তাই তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সহায়ক পরিবেশ এবং দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনা নিতে হবে।
জরিপে অংশ নেয়া ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন, বর্তমানে দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা অনুপস্থিত। অন্যদিকে ৬৩ শতাংশ তরুণের ধারণা, গত পাঁচ বছরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছেন ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ। এছাড়া ২৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার হ্রাস পাচ্ছে, যা সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিওয়াইএলসির জরিপে আরো দেখা যায়, জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশী তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হতে চেয়েছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নেও তরুণরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। জরিপে অংশ নেয়া ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ মনে করে, এক্ষেত্রে শিক্ষকদের মান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণদের বিশ্বাস, পাঠ্যক্রমে নেতৃত্বচর্চা ও সফট স্কিল উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ যুক্ত করে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব।
উন্নত দেশ গড়ার জন্য তরুণদের নিয়ে এ জরিপকে অবহেলার সুযোগ নেই। তরুণদের মেধা ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এ দুইয়ের সমন্বয়ে যাবতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পনার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নেও যথাযথ মনোযোগ প্রয়োজন। তরুণদের সুপথে পরিচালনা না করতে পারলে তাদের বিপথে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে তরুণদের বিকাশে দেশের সামগ্রিক উন্নতির রূপরেখা ঢেলে সাজাতে হবে। তরুণরা কেন বিদেশে যেতে চাচ্ছেন এ বিষয়ে প্রয়োজনে আরো গবেষণা হওয়া উচিত। যেহেতু তরুণদের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে, সে হিসেবে তরুণরা যেন দেশ গড়ায় আগ্রহী হন, সে স্বপ্নের বীজ তরুণদের মধ্যে বুনে দেয়া দরকার। আর সে স্বপ্ন যেন ডালপালা গজায়, সম্ভাবনার অসীম আকাশে বিরামহীন বিস্তৃত ডানায় ভর করে তরুণদের নেতৃত্বের জয়গান গায়, সেটিই এখন নিশ্চিত করা উচিত।
আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের তরুণরা অনেক সম্ভাবনাময়। দেশের তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ ধাপে ধাপে আরো উন্নতির পথে অগ্রসর হবে। এজন্য তরুণদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। আগামীতে জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ গড়তে তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে সামনে এগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে কর্মসংস্থানের সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করুক, তরুণরা অর্জিত জ্ঞান সমাজে প্রয়োগের অনুপ্রেরণা পাক, সমৃদ্ধি ও উন্নতির পথে তরুণরা আরো ভূমিকা রাখুক, সেটিই আমাদের কাম্য।










