দেশে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ভোলায় নতুন আরেকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং তাতে ২৭ হাজার কোটি টাকার গ্যাসের মজুদ থাকার খবরটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক ও উৎসাহব্যঞ্জক। এতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৯০ কোটি টাকা। স্বল্প অর্থ ব্যয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ পাওয়ার মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানের গুরুত্বকে আরো একবার সম্মুখে নিয়ে এল। গ্যাস আমদানি ক্রমে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের পক্ষে বিপুল ব্যয়ের এ চাপ মোকাবেলা করা কঠিন। ফলে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। সম্ভাবনাও রয়েছে বিপুল। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে প্রত্যাশা। 

গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে গিয়ে ২০১৭ সালে ডেনমার্কের প্রকৌশল ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র‍্যাম্বল এক প্রক্ষেপণে বলেছিল, ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বাংলাদেশে চাহিদা পূরণে গ্যাস আমদানিতে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে। আমদানিনির্ভর না থেকে এ অর্থ যদি স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান-উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়, তাহলে এখান থেকে সুফল পাওয়া যাবে আরো অনেক বেশি। বাস্তবেও স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সফলতার দেখা পেয়েছে জ্বালানি বিভাগ। ২০২২ সালজুড়ে নয়টি কূপে অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ওয়ার্কওভার চালিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। এতে বাপেক্সের ব্যয় হয়েছে ৮১২ কোটি টাকা। আর এ বিনিয়োগের মাধ্যমে এলএনজি আমদানিতে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার ব্যয় সাশ্রয় করেছে বাপেক্স। 

বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনি মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

হতাশার বিষয় হলো স্থানীয় পর্যায়ে গত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ব্যয়বহুল আমদানিতেই খোঁজা হয়েছে জ্বালানি সংকটের সহজ সমাধান। উত্তোলন ও অনুসন্ধান যেটুকু হয়েছে, তাতেও প্রাধান্য পেয়েছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত খনিজ জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডও (বাপেক্স) হয়ে পড়েছে অনেকটাই গুরুত্বহীন। যদিও বিদেশী নামি কোম্পানিগুলোর চেয়েও অনেক স্বল্প ব্যয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে বাপেক্স। কোম্পানি হিসেবে গঠনের পর শুরুতেই বেশকিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে সক্ষমতার জানান দিয়েছিল বাপেক্স। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশের জ্বালানি খাতে বিদেশী কোম্পানির কর্মতৎপরতা বাড়ায় সংস্থাটি অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বাপেক্সের দেশের গ্যাস খাতের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। উল্টো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বাপেক্সের কাজ তুলে দেয়ারও নজির রয়েছে। যদিও দেশের স্থলভাগে বিদেশী কোম্পানিগুলোর তুলনায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বাপেক্সের সাফল্যের হার অনেক বেশি। এর পরও দীর্ঘদিন স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে সংস্থাটি। বলা হয়, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে। এমন প্রবণতা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে প্রতিবন্ধক।

প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে ‘দেশজ প্রাকৃতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নীতিমালা, ২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানীকৃত এলএনজি অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে সরবরাহকৃত জ্বালানির মূল্য বাড়ছে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অনশোর (ভূ-ভাগে) ও অফশোরে (সমুদ্রসীমায়) গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। এজন্য নানা উদ্যোগের কথাও নীতিমালায় রয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা থেকে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়টিও এতে রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য নীতিমালা প্রণয়নের তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানিনির্ভরতাই বেড়েছে। গ্যাস সংকট মেটাতে হলে ভূভাগে ও সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে শুধু প্রতিশ্রুতি বা নীতিমালাই নয়, সত্যিকার অর্থে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে দেনদরবার বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ২০৪১-এর যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ নিরাপত্তার জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। আশা করি, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ধরনের সংকট দূর করা সম্ভব হবে। গ্যাসের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ চালিয়ে গেলে উৎপাদন ধরে রাখা যায়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতা কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি সবকিছুই নির্ভর করছে টেকসই জ্বালানি খাতের ওপর। স্থানীয় সম্পদ আহরণ জোরদারের মাধ্যমেই সেটি অর্জন সম্ভব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এতদিনের ভুল বুঝতে পারবে এবং জ্বালানি খাত উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ উৎসকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজাবে এবং যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে। কারণ জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার খুবই দোদুল্যমান এবং মাঝেমধ্যেই সেটি অনেক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যার চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই। ফলে জ্বালানি খাত উন্নয়নে সরকার আরো মনোযোগী হবে বলে প্রত্যাশা।