বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশ চীন। অথচ দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির পরিসংখ্যানের বড় ধরনের গরমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যে ১৩ বিলিয়ন ডলারের গরমিল রয়েছে। চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৭ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যানে এর পরিমাণ ২ হাজার ২৪ কোটি ডলার। ৭৫২ কোটি ডলারের বিপুল পার্থক্য, যা উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যানের পার্থক্যের কারণ হিসেবে দাম বাড়িয়ে-কমিয়ে দেখানোর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিষয়টি আরো অনেক গবেষণার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং হয়েছে কিনা, তা এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংককে খতিয়ে দেখতে হবে।
ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে-কমিয়ে দেখানোর প্রবণতাকেই দুই দেশের বাণিজ্য পরিসংখ্যানে এ বিপুল পরিমাণ ব্যবধানের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন দেশের বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। আমদানিকারকদের বড় একটি অংশ আন্ডার ইনভয়েসিং করছে আমদানিতে শুল্ক সুবিধা নিতে। আবার চীন হয়ে তৃতীয় কোনো দেশে অর্থ পাচারের সুযোগ নিতে গিয়ে আমদানীকৃত পণ্যের দাম বেশি করে দেখাচ্ছেন কোনো কোনো আমদানিকারক। বিশেষ করে পোশাক খাতের মতো রফতানিমুখী শিল্পের আমদানিকারকদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। চীনের রফতানিকারকদের সঙ্গে দরকষাকষি করা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হচ্ছে। দেশের বড় অনেক ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এ পন্থায় অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে এলসি মূল্য কম দেখিয়ে ডলার হুন্ডি করে আমদানি মূল্য পরিশোধ করারও ঘটনা ঘটছে।
চীনে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি হয় সামান্য। আবার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা নেয়ার জন্য অনেকেই পণ্য আনার সময় দাম কম দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাণিজ্য পরিসংখ্যানের এ পার্থক্য এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিপাকে ফেলছে সবচেয়ে বেশি। তথ্যবিভ্রাটের কারণে তাদের এখন পণ্যের ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে বিপদে পড়তে হচ্ছে। আবার চীন থেকে লুজ কনটেইনারে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হচ্ছে। সেসব পণ্যের মান নিয়েও নানা সময় প্রশ্ন উঠেছে। চীনা রফতানিকারকরা বাংলাদেশে পণ্য পাঠানোর জন্য জাহাজীকরণের সময় রফতানি মূল্যের ওপর রিবেট বা ছাড় নিচ্ছেন। ওই রিবেট ভ্যালুর ওপর বাংলাদেশে শুল্কহার নির্ধারণ করা উচিত। ঋণপত্রে উল্লেখিত মূল্যের ওপর শুল্কায়ন থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। ঋণপত্রে উল্লেখিত মূল্যে শুল্কায়ন করতে গিয়ে দামভেদে ভিন্ন ভিন্ন ট্যারিফ রেটের কারণে আন্ডার বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে এনবিআর থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সবাই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নজরদারি করে। তাই দুই দেশের বাণিজ্য পরিসংখ্যানে এত বিপুল অংকের পার্থক্য থেকে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ফলে বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখতে হবে।
চীন থেকে বিপুল পরিমাণে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আসে বাংলাদেশে। এসব পণ্যে দাম বাড়িয়ে-কমিয়ে দেখানোর বিষয় জড়িত বলে জানিয়েছেন সরকারের প্রতিনিধিরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কায়ন হয় ন্যূনতম আমদানি মূল্যের ওপর। এ সুযোগে দাম কম দেখিয়ে শুল্কও কম দেয়া যায়। এক্ষেত্রে চীনা রফতানিকারক ও বাংলাদেশের আমদানিকারক দুই পক্ষেরই যোগসাজশের বিষয় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। চীনসংশ্লিষ্টরা চাচ্ছেন রফতানি যত বেশি করে দেখানো যায়। কারণ সেখানে রফতানি যত বেশি, তত বেশি ছাড়ও পাচ্ছেন তারা। বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের। এক্ষেত্রে হিসাব করা মূল্য ও এলসি মূল্যের ব্যবধান পরিসংখ্যানগত পার্থক্যের একটি কারণ। আবার অসত্য ঘোষণাও এ পার্থক্যের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। সেটিও করা হচ্ছে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার লক্ষ্যে। মূলত শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা থেকেই দাম কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আর দাম বাড়িয়ে দেখানো হয় সাধারণত অর্থ পাচারের জন্য। বাংলাদেশ ও চীনের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুই ধরনের চর্চাই আছে।
আমদানি ও রফতানির আড়ালে অর্থ পাচারের প্রমাণ খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর পেয়েছে। এটি বন্ধে তারা কিছু উদ্যোগও নিয়েছে বটে। কিন্তু তাতে আশানুরূপ সুফল মিলছে না বলেই প্রতীয়মান হয়। এক্ষেত্রে আমদানি-রফতানি আয়ের পরিসংখ্যানে সামঞ্জস্য বিধানে সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক হতে হবে। চীনসহ বড় বড় আমদানি ও রফতানিকারক দেশের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ বাড়িয়ে পরিসংখ্যানের সমন্বয় এবং অন্যায় লেনদেন বন্ধ করা যায়। এক্ষেত্রে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
সাধারণত আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার হয় বেশি। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রফতানির ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) অর্থ পাচারের অন্যতম কৌশল। এছাড়া ভুয়া রফতানি এলসি এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করা প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজটি যেহেতু অপেক্ষাকৃত জটিল, সেহেতু পাচার রোধের বিষয়টিতে জোর দেয়া উচিত বেশি। অন্যদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রফতানি আয়ের পরিপূর্ণ ও যথাযথ তথ্য নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে রফতানি আয়ের সমন্বয়ের বিষয় থাকলে দ্রুতই সেটি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রফতানি আয় দেশে ফেরত না আসার সঙ্গে অনেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্রের অভিযোগ করছেন। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবি তদন্ত করে দেখবে বলে প্রত্যাশা।
দেশের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে। অনেক সময় একই বিষয়ে একেক সংস্থার পরিসংখ্যানে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো দেশে পণ্য আমদানির বিপরীতে কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের বিপরীতে কী পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে, এ দুয়ের প্রকৃত হিসাব যথাযথ প্রক্রিয়ায় ও স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখন ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্যে বড় ধরনের তথ্যগত ব্যবধান অন্যান্য দেশের সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এ থেকে নেতিবাচক বার্তা পাবেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যদি এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের না পারার কোনো কারণ নেই। পরিসংখ্যানের এত বেশি ব্যবধান থাকা কাম্য নয়। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ অনেকেই কিন্তু আমাদের তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ফলে অবিলম্বে এ ধরনের বিভ্রান্তি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের সংস্থাগুলোকে চীনের সঙ্গে বসে দ্রুত এটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে। শুধু বৈদেশিক বাণিজ্য নয়, সব ধরনের তথ্যের ক্ষেত্রেই এটি করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও সঠিক ও নির্ভুল তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। এর ব্যত্যয় হলে সরকারের নীতি প্রণয়নেও সমস্যায় পড়তে হবে।










