প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বিচারে পাহাড় নিধন চলে। এতে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় পাহাড়ে বসবাসরত মানুষ। এজন্য পাহাড় রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। কিন্তু প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য ও মানুষের অসচেতনতায় নির্বিচারভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিবেশের ওপর যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ থানা (বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি ও পাহাড়তলী) এলাকায় তিন দশকে কেটে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে ১৮ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড়। অথচ ১৯৭৬ সালের দিকে চট্টগ্রামে পাহাড়ের মোট আয়তন ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় ২০০ পাহাড়ের মধ্যে এরই মধ্যে ১২০টি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। যেসব পাহাড় অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলোর বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলার তৎপরতা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালের পর পাহাড় কর্তনের তীব্রতা আরো বেড়েছে। এখনই উদ্যোগ নেয়া না হলে চট্টগ্রামের সব বিদ্যমান পাহাড়গুলো কেটে ফেলা হতে পারে বলে পরিবেশবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট চট্টগ্রামের পাহাড় কর্তন রোধ করে পাহাড় রক্ষার নির্দেশনা দেন। কিন্তু বেসরকারিভাবে পাহাড় কাটার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামেও পাহাড় কাটা হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড় (গরিবউল্লাহ শাহ হাউজিংয়ের মুখ), ষোলশহর, ফয়’স লেক, শেরশাহ, আরেফিন নগর, আকবরশাহ, ফিরোজশাহ, জালালাবাদ, কুলগাঁও এবং উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ড, বাঁশখালীর চাম্বল, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটা চলছে।
দেখা যায়, দিনে অভিযান চালানো হলে রাতে পাহাড় কাটা হয়। চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটা হচ্ছে পাঁচলাইশ থানা এলাকায়। এ এলাকায় কয়েক দশকে প্রায় ৭৪ শতাংশ পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষার পাশাপাশি সরকারি তদারককারী সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় সরকারি প্রকল্পের অধীনেও পাহাড় কাটা হচ্ছে। এ পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মোট ৮৫টি মামলা দায়ের করা হলেও আর্থিক জরিমানা দিয়ে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়। ২০১২ সালে উচ্চ আদালত আদেশ জারি করেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে কোনো পাহাড় কাটা যাবে না।’ সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি করা আদেশ এবং উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে এ অঞ্চলে পাহাড় উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ করা পাহাড়ে পরিবেশবাদীরা আবার গাছ লাগানোর দাবি তুলেছেন।
আদালতের আদেশ কেউ মানছেন না—এটি দুঃখজনক বিষয়। তাছাড়া পাহাড় কাটার জন্য এখন পর্যন্ত কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। অভিযানে তাৎক্ষণিক কেবল শ্রমিকদের গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু প্রকৃত কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
এজন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছাড়াও পাহাড় কাটা প্রতিরোধে মোবাইল হট নাম্বার চালু, বিশেষ সেল গঠনের দাবি করা হয়েছে পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে। নিকট অতীতে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবিগুলো মেনে নিয়ে পাহাড় কাটা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।
তবে পাহাড় কাটা প্রতিরোধে একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত। এজন্য জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পাহাড় কেটে ফেলার পর কখনো বানানো সম্ভব নয়। পাহাড়-নদী-সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রামের যে ঐতিহ্য রয়েছে তা ধরে রাখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশের বিপর্যয় রোধে নানামুখী তৎপরতা প্রয়োজন। পাহাড় কাটা বন্ধে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পাহাড় সংরক্ষিত করতে উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সরকারি সংস্থার অধীনে থাকা পাহাড় ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো রক্ষা করার জন্য
ভূমি মন্ত্রণালয় ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রম শুরু করেছে। কোন পাহাড় কী অবস্থায় আছে তা নির্ধারণ করে এক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর তদারকির বিকল্প নেই। পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় রক্ষায় আন্দোলন করছেন। তাদের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষার ক্ষেত্রে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য থামানো প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে পাহাড়ে বসবাস বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটা দমনে যতটুকু কঠিন ভূমিকা পালন করা দরকার, তা থেকে প্রশাসনের পিছিয়ে আসা যাবে না। প্রশাসনের আন্তরিক ভূমিকার ফলেই চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষা পেতে পারে। পাহাড় অক্ষত থাকলে তা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। এতে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে এবং অত্যধিক বৃষ্টির ফলে পাহাড়ধসে মানুষের হতাহতের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও বন্ধ হবে এ আশা করা যায়।










