দেশের অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক এখন নিম্নমুখী, বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ। সম্প্রতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। আশা ছিল, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের অন্যতম খাত বেসরকারি খাতকে আগের চেয়ে আরো বেশি বিনিয়োগবান্ধব করা হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে কর অবকাশ সুবিধা প্রত্যাহার বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যদিও সরকারের নতুন বাজেটে আগের মতোই কর অবকাশ ও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো। প্রস্তাবিত বাজেট যদি কার্যকর হয় তা বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়াবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি চলমান বিনিয়োগ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা চাপে পড়বেন। এতে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন নয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসবে এবং শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এটি পক্ষান্তরে অর্থনীতির সংকট, বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরো তীব্র করে তুলবে। 

আয়কর আইন ২০২০ অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি সব অর্থনৈতিক অঞ্চলেই স্থাপিত শিল্প ইউনিট ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা পায়। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত শিল্পের ক্ষেত্রে সে সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে-বাইরে আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠান একাধিক শিল্প ইউনিট পরিচালনার যে অনুমোদন ছিল, তাও প্রস্তাবিত বাজেটে প্রত্যাহার করা হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশী-বিদেশী বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আইন মেনে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে-বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু নতুন আইন তাদের বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসবে না।

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো মূলত তৈরি হয় বিনিয়োগ আকর্ষণে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের যুগে বাণিজ্য প্রক্রিয়া যত বেশি সহজ ও সুবিধা সংবলিত হয়, ততই বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হয়।

একসময় বাংলাদেশে বেসরকারি, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ভালো অবস্থানে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নানা সংকটে পড়ে, বিশেষ করে ডলার সংকট ও রিজার্ভ ক্ষয়, টাকার মানের অবমূল্যায়ন, সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা প্রভৃতি বেসরকারি বিনিয়োগ ও এফডিআই প্রবাহ কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ পয়েন্ট কমে ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শতাংশ হিসেবে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের দিক থেকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। বাংলাদেশের এফডিআই জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। 

একদিকে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিবেশেরও অবনতি হয়েছে। ব্যবসা পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স) ২০২৩-২৪ জরিপের তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে ২০২৩ সালে দেশের ব্যবসার পরিবেশের সূচকের ১০০ স্কোরের মধ্যে অর্জন ৫৮ দশমিক ৭৫, যা ২০২২ সালে ছিল ৬১ দশমিক ৯৫। অর্থাৎ গত এক বছরে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের কোনো উন্নতি হয়নি, উল্টো অবনতি হয়েছে। এছাড়া ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়, গত এক বছরে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ পাওয়া আরো কঠিন হয়েছে। কর ও ভ্যাট পরিশোধে হয়রানি রয়ে গেছে। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া আরো বেশি জটিল হয়েছে। এছাড়া আইনকানুনের তথ্যপ্রাপ্তি, অবকাঠামো সুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

ব্যবসার পরিবেশের এমন সংকটময় সময়ে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধাদি কমানো এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলা যায়। এ সময় উচিত কীভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় সে পন্থা অবলম্বন করা। শিল্প সম্প্রসারণের সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশকে বার্ষিক জিডিপির ১ দশমিক ৬৬ শতাংশের সমপরিমাণ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ লাভ করতে হবে। স্থবির বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। 

সহজেই অনুমেয়, বাজেটে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর অবকাশ সুবিধা প্রত্যাহার ও প্রণোদনা কমানোর প্রস্তাবে দাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আরোপিত শর্তের প্রভাব আছে। আইএমএফের ঋণ জরুরি হলেও দেশের শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করছাড় সুবিধা রহিত করা হলে একদিকে করের চাপ বাড়বে, অন্যদিকে ঋণ গ্রহণেও সমস্যায় পড়তে হবে তাদের। কেননা এ বছরও ঘাটতি বাজেটের প্রস্তাব করা হয়েছে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হবে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতায় বাড়ছে সুদ ব্যয়ের পরিমাণ, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বছর দুই আগেও ৯১ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল আড়াই শতাংশের কম। স্বল্পমেয়াদি এ ঋণের সুদহার এখন ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মেয়াদ বেশি হলে ঋণ নিতে সরকারকে আরো বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো এখন ব্যক্তি খাতের চেয়ে সরকারকে ঋণ দেয়াকেই বেশি লাভজনক মনে করছে। ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ ঘাটতির আশঙ্কা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কর অবকাশ প্রত্যাহার নয়, বরং সরকারের ব্যয় সংকোচনে নজর দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে আরো বেশি সক্ষমতাসম্পন্ন করা দরকার যেন বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে।

দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন প্রবৃদ্ধি এরই মধ্যে বেশ শ্লথ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে, যা দুই বছর আগেও ছিল ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না—শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এ সময় নতুন বিনিয়োগ না এলেও বিদ্যমান সুবিধাদি অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি।